(আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রাক্তন ফুটবলার)
১৯৮৮ সাল। শিলিগুড়িতে অষ্টম নেহরু গোল্ড কাপ। কলকাতার বাইরে এরকম একটা আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্ট তার আগে কখনো হয়নি। প্রসঙ্গত অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশন সেবারের প্রতিযোগিতা আয়োজনের দায়িত্ব দিয়েছিল আইএফএ-কে। আইএফএ-র সচিব তখন প্রদ্যুত দত্ত। দায়িত্ব পেয়ে তিনি একটা বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তা হল, কলকাতার যুবভারতীতে নয়, প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে উত্তরবঙ্গের ব্যস্ততম শহর শিলিগুড়িতে। কিন্তু বিশাল সমস্যা ছিল আইএফএ-র সামনে তা হল, শিলিগুড়িতে তখন বড় মাপের কোনও স্টেডিয়াম ছিল না। বাধা আসবেই। কিন্তু প্রদ্যুতদা তাঁর সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। কারণ, তিনি একটা ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন তা হল নেহরু গোল্ড কাপের মতো একটা আন্তর্জাতিক ফুটবলকে কেন্দ্র করেই স্টেডিয়াম তৈরি হবে। হয়েছিলও তাই। রাতারাতি যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি সামলানোর মতো তৈরি হয়েছিল শিলিগুড়ির কাঞ্চনজঙ্ঘা স্টেডিয়াম ৩০/৩৫ হাজার আসন বিশিষ্ট সেই স্টেডিয়াম তৈরির পিছনে প্রদ্যুত দত্ত-র নামটাও নিশ্চয়ই স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
আসলে তাঁর চরিত্রের বৈশিষ্ট্য এরকমই ছিল যে, অনেকেই যে কাজটা সম্ভব নয় বলে মনে করতেন প্রদ্যুতদা সেই কাজটাকেই সম্ভব বলে প্রমাণ করতে ঝাঁপিয়ে পড়তেন।
তিনি ছিলেন প্রবল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। হার না মানা চরিত্র। এবং অবশ্যই শৃঙ্খলাপরায়ণ। কোনওরকম বেনিয়ম বরদাস্ত করতেন না। প্রবল চাপের কাছে মাথা নিচু করতেন না। অর্থাৎ পিছু হটতেন না। শিলিগুড়িতে ওই খেলা আয়োজন করতে গিয়ে অনেকরকম বাধা বিপত্তি সামনে এসেছিল। কিন্তু তাঁকে টলানো যায়নি।
শুধু প্রতিযোগিতা আয়োজনই নয়, অবিভক্ত সোভিয়েত রাশিয়া, পোল্যান্ডের মতো শক্তিশালী দুটি দেশ সেবার নেহরু কাপে খেলেছিল। পোল্যান্ড, সোভিয়েত রাশিয়া ছাড়াও এসেছিল বুলগারিয়া এবং চীন। এই চার দলের মধ্যে পোল্যান্ড এবং বুলগারিয়া দুটি দলই বিশ্বকাপে খেলেছিল। সোভিয়েত রাশিয়া বিশ্বকাপে খেলার পাশাপাশি বিশ্ব অলিম্পিকে ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ১৯৮৮ সালে। এটা ঘটনা যে দলটা শিলিগুড়িতে খেলেছিল সেই দলটাই সেবার অলিম্পিক ফাইনালে হারিয়েছিল ব্রাজিলকে। এই দলগুলোকে এখানে আনার ব্যাপারেও মুখ্য ভূমিকা ছিল প্রদ্যুতদার।
সেবার ভারতীয় দলে আমিও খেলার সুযোগ পেয়েছিলাম। আমরা গ্রুপের কোনও ম্যাচ জিততে না পারলেও বিশ্বকাপার সমৃদ্ধ পোল্যান্ডকে রুখে দিয়েছিলাম। আমাদের কোচ ছিলেন অমলদা (দত্ত)। তিনিই প্রথম ৪-৪-২ ছকে ভারতীয় দলকে খেলিয়ে ছিলেন। যে জন্য বুলগারিয়া ম্যাচের পর অমলদা-র প্রথা প্রকরণকে সমালোচনায় বিদ্ধ করেছিলেন বাংলার ফুটবল জগতের বেশ কয়েকজন বিদগ্ধ ব্যক্তিত্ব। প্রাক্তন ফুটবলার থেকে কোচ, সাংবাদিক অনেকেই অমল দা-র সমালোচনায় মুখর ছিলেন। অমলদা তখন রীতিমতো বিধ্বস্ত। ফুটবল সমাজের ব্যক্তিদের সমালোচনায় বীতশ্রদ্ধ হয়ে একটা দৈনিক সংবাদপত্রে লিখেছিলেন ‘হে সমালোচক, তুমি একটা কবিতা লেখ।’
প্রদ্যুতদা তখনও অবিচল। পোল্যান্ড ম্যাচের আগে অমলদাকে বলেছিলেন, ‘আজ এআইএফএ কর্তারা আসছেন। আপনার সিস্টেম নিয়ে প্রশ্ন তুলবে। আজ একটা জবাব দিতেই হবে। এতটাই আস্থা ছিল তাঁর কোচের উপরে। পোল্যান্ড ম্যাচে আমাকে দেখিয়ে অমলদাকে বলেছিলেন, ‘কেমন লাগছে আমার প্লেয়ারটাকে।’
হ্যাঁ, আমি তো তাঁরই প্লেয়ার। ১৯৮৫ সালে জর্জ টেলিগ্রাফে খেলেছিলাম। নিঃসন্দেহে আমার ফুটবলজীবনে টার্নিং পয়েন্ট।