(ছোটদি)
প্রদ্যুত আমাদের ছোট ভাই। ছোটবেলায় ভীষণ দুষ্টু ছিল। নানারকম দুষ্টুমি সবসময় মাথায় খেলত। যেমন খেলার পুতুল ভেঙে মাথায় চাপিয়ে ‘হরিবোল’ ধ্বনি দিয়ে সারা বাড়ি ঘুরত। ওর লেখাপড়ার জন্য বাবা বাড়িতে একজন মেমসাহেব প্রাইভেট টিউটর রেখেছিলেন।
সেই সময় স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রেক্ষিতে গোটা দেশ উত্তাল। ‘ইংরেজ ভারত ছাড়ো’-‘কুইট ইন্ডিয়া’ স্লোগান স্বদেশিদের মুখে মুখে ঘুরছিল। বাড়িতে মেমসাহেব যখন পড়াতে আসতেন ঠিক সেই সময়েই প্রদ্যুত স্বদেশিদের সেই স্লোগান শুরু করত। আবার আর একটা স্লোগানও শুনতাম - ‘সাইমন্ডস গো ব্যাক’। এইসব দুষ্টুমি দেখে মেমসাহেব বিরক্ত বোধ করতেন। এতটাই বিরক্ত হয়েছিলেন যে শেষ পর্যন্ত প্রদ্যুতকে পড়াবার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিয়েছিলেন।
এরকম নিত্যনতুন দুষ্টুমি ওর মাথায় খেলত। সে জন্য মা-র কাছে সবসময় বকুনি খেত। মা অনেক সময় মারধর করেছেন, কিন্তু তাতে প্রদ্যুতের দুষ্টুমি আটকানো যায়নি।
একদমই ঘরে থাকতে চাইত না। দূর্ঘটনার আগে পর্যন্ত সুযোগ পেলেই ফুটবল নিয়ে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে খেলতে যেত। এভাবে যখন তখন ঘর থেকে বাইরে যাওয়া আটকাবার জন্য বাড়ির দুই গেটের দারোয়ানদের কাছে কড়া নির্দেশ ছিল। কিন্তু প্রদ্যুতের দুষ্টুমির কাছে দারোয়ানরা হার মেনে যেত। যেমন, অনেক সময় গিয়ে বলত, তোমাকে বড় বাবু (আমাদের বাবা) ডাকছেন। এভাবে দারোয়ানদের ধোকা দিয়ে খেলতে যেত। আমাদের বাড়িতে ইনডোর গেমসের ব্যবস্থা ছিল। ব্যাডমিন্টন, টেবল টেনিস দুটো খেলাতেই বিশেষ পারদর্শী ছিল ছোট ভাই। বাড়িতে বড় সাইজের টেবল টেনিস বোর্ড ছিল। সেখানে দাদা, ভাইদের সঙ্গে আমরা বোনেরাও খেলতাম। ঘটনা হল, খেলাতে প্রদ্যুতকে হারানো যেত না। এতটাই পারদর্শী ছিল বলে দাদারা প্রদ্যুতের ওপর ভরসা করতেন। এই প্রসঙ্গে একটা ঘটনা বলি। একদিন ওড়িশার একজন চ্যাম্পিয়ন প্লেয়ার আমাদের বাড়িতে চমৎকার টেবল টেনিস বোর্ড দেখে ‘দাদাদের সঙ্গে খেলবার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। এদিকে তাঁর সঙ্গে খেলার জন্য প্রদ্যুত তখন ভীষণ উদগ্রীব ছিল। ওর আগ্রহ দেখে ওড়িশার সেই চ্যাম্পিয়ন প্লেয়ারকে দাদারা তখন প্রস্তাব দিয়েছিলেন, ‘আগে আমাদের ছোটভাইয়ের সঙ্গে খেলে জিততে পার তাহলেই আমরা তোমার সঙ্গে খেলব।’ দাদাদের প্রস্তাবে সেই চ্যাম্পিয়ন রাজি হননি। রেগেমেগে চলে গিয়েছিলেন।
বাড়িতে ম্যাডামের কাছে পড়তে চাইত না। কিন্তু তাই বলে তো লেখাপড়া বন্ধ করে দেওয়া চলবে না। ৮ বছর বয়সে একটা ফাঁড়া ছিল বলে একটু দেরিতে স্কুলে ভর্তি হয়েছিল। একটু বড় হতেই বাবা বরাহনগর রামকৃষ্ণ মিশনে ভর্তি করিয়েছিলেন। হয়তো ভেবেছিলেন মিশনে থাকলে আর যখন তখন বাইরে আসতে পারবে না। কিন্তু প্রদ্যুত তো ‘বনের পাখি’। পাখিকে কে বেশিদিন খাঁচায় আটকে রাখা যায়? মিশনে ধরাবাঁধা নিয়মে ওর মন টিকবে কেন? ব্যাপারটা বাবাও বুঝতেন। ওকে শান্ত রাখার জন্য মেজদাদা (বিশ্বনাথ দত্ত) সপ্তাহে একদিন রামকৃষ্ণ মিশনে যেতেন। কিন্তু তৎসত্বেও মিশনে ওকে রেখে দেওয়া যায়নি। মিশনে খাওয়ার পরে নিজেদের বাসন পরিষ্কার করতে হত। তার উপর প্রাণের বন্ধুদের কাছে পেত না। ওর মনের যন্ত্রণা মেজদাদা বুঝতে পেরেছিলেন। তাই শেষ পর্যন্ত রামকৃষ্ণ মিশনের পাট চুকিয়ে বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন।
তবে রামকৃষ্ণ মিশন থেকে চলে এলেও শিক্ষাক্ষেত্রে কোনও ব্যাঘাত ঘটেনি। কৃতিত্বের সঙ্গে এম কম পাস করেছিল। বাড়িতে প্রাইভেট টিউটারকে পছন্দ করেনি, রামকৃষ্ণ মিশনে মন টেকেনি, কিন্তু সে জন্য নিজে যথেষ্ট সতর্ক ছিল। শিক্ষাজীবনে সফল হবই, এই জেদটা সবসময়ই ছিল। তাই সাফল্যও পেয়েছিল।