(ক্রীড়া সংগঠক)
প্রদ্যুতদা-র সঙ্গে আমার পরিচয় সত্তর দশকের শেষ দিকে। তিনি তখন চুটিয়ে জর্জ টেলিগ্রাফের দল গড়ছেন। আর আমি তালতলা ইনস্টিটিউটের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। কলকাতা লিগে খিদিরপুরের সঙ্গে খেলাকে কেন্দ্র করে মামলা চলছিল। সেই সময়ই একদিন প্রদ্যুতদা আমাকে ডেকে পাঠালেন। কীভাবে মামলায় লড়তে হবে আমাকে বোঝালেন। তখন থেকেই আমাদের সম্পর্ক দাদা-ভাইয়ের মতো।
প্রদ্যুতদা আইএফএর সচিব হয়েছিলেন ১৯৮৫ সালে। এমন একটা সময়ে তিনি সচিব হয়েছিলেন যখন আইএফএ--র আর্থিক দুরবস্থা চলছে। সেই দুরবস্থা কাটাতে আইএফএ-তে Donor মেম্বারশিপ চালু করলেন। আর্থিক দুরবস্থা অনেকটাই সামলাতে পেরেছিলেন। বেশ কয়েকটা ব্যাপারে দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছিলেন। কলকাতা ফুটবলে তখন একটা সংক্রামক ব্যাধি ছিল ‘গট আপ’ খেলা। এই অনৈতিক খেলাটা বন্ধের জন্য তিনি বেশ কয়েকটা পদক্ষেপ করেছেন। তার আগে নির্লজ্জ ১৯৪ গোলের কলঙ্ক বাংলার ফুটবলকে আসামির কাঠগড়ায় তুলে ছিল। সেই কারণে সন্দেহজনক ম্যাচে নজরদারির ব্যবস্থা করেছেন। তিনি দায়িত্বে আসার আগে কলকাতা লিগের প্রথম ডিভিশনে দলের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে ১৫ থেকে ২৭-এ পৌঁছেছিল। লিগে রিটার্ন লিগ সিস্টেম তুলে দেওয়া হয়েছিল। প্রদ্যুতদা প্রথমেই দলের সংখ্যা আবার ১৫-তে নিয়ে এলেন। সেই সঙ্গে আবার আগের মতো রিটার্ন লিগ চালু করলেন।
তিনি সচিব হওয়ার পর একটা চক্র সব সময়েই অসহযোগিতা করে গেছে। কিন্তু প্রতিটি পদক্ষেপেই প্রদ্যুতদা সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। সততা বজায় রেখেছেন। শেষপর্যন্ত জয়ীও হয়েছেন।
মাঠে এবং মাঠের বাইরে কোনওরকম বিশৃঙ্খলা, বেআইনি কাজকর্মকে বরদাস্ত করতেন না। তার জ্বলন্ত প্রমাণ ১৯৮৬ সালে মহমেডান ক্লাবের সাসপেনশন। সেই সময় বিভিন্ন মহলের চাপ সত্বেও তিনি ছিলেন অটল। ১৯৩৪ সাল থেকে কলকাতা লিগে মহমেডান ঝড় তুলেছিল। তখন তো বটেই, পরবর্তীতে মহমেডান ক্লাবের প্রভাব প্রতিপত্তি ছিল বিশাল। এরকম একটা শক্তিশালী ক্লাবকে সাসপেন্ড করার মতো সাহস দেখিয়েছিলেন প্রদ্যুতদা। ১৯৩৪ থেকে ১৯৮৬ একটানা ৫৩ বছর কলকাতা লিগের প্রথম ডিভিশনে খেলার পর মহমেডানকে নেমে যেতে হয়েছিল দ্বিতীয় ডিভিশনে। মনের দিক থেকে তিনি এরকম একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে চাননি। কিন্তু মহমেডান ক্লাব শৃঙ্খলাভঙ্গ করেছিল। ম্যাচ খেলতে অস্বীকার করেছিল। তারপরেও যদি কঠোর না হতেন তাহলে পরবর্তীতে অন্য যে কোনও ক্লাবও এভাবে শৃঙ্খলাভঙ্গ করতে সাহস পেত। এ ব্যাপারে প্রদ্যুতদা ছিলেন নিয়মমাফিক। সেখানে ব্যক্তিগত সম্পর্কের কোনও জায়গা ছিল না। অথচ এই মানুষটিই ছিলেন উদারমনের। মহমেডান মাঠের পাশ দিয়ে যখন আসতেন তখন দেখতেন মহমেডান ক্লাবের ফুটবলপ্রেমী অনেক সমর্থক রেড রোডের ধারে প্রাচীরে শুয়ে আছেন। এরকমই একদিন আসার পথে আমাকে বলেছিলেন, ‘ওদের দেখলে কষ্ট হয়, কিন্তু আমি যে নিরুপায়। কঠোর না হলে আইএফএ-কে কোনও ক্লাবই মানবে না।’
তাঁর সবচেয়ে বড় সাফল্য ১৯৮৮ সালে শিলিগুড়িতে নেহরু কাপ ফুটবল। এআইএফএফ সেবার আইএফএ-কে প্রতিযোগিতা আয়োজনের দায়িত্ব দিয়েছিল। প্রদ্যুতদা ঠিক করলেন খেলাটা কলকাতায় করবেন না। বেছে নিলেন রাজ্যের কর্মব্যস্ত শহর শিলিগুড়িকে। খেলাটাকে কলকাতাকেন্দ্রিক না করে শিলিগুড়িকে বেছে নিলেন। যেভাবে কেরালাতে হয়ে থাকে। কিন্তু তিনি শিলিগুড়িকে বেছে নিলেও অনেকরকম বাধা এসেছিল বিভিন্ন মহল থেকে। প্রথম বাধা এল এআইএফএফ থেকে। তৎকালীন সচিব অশোক ঘোষ বলেছিলেন সম্পূর্ণ কংক্রিট স্টেডিয়াম এবং পরিকাঠামো না থাকলে কোনও আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্ট করা যাবে না। ঘটনা হল শিলিগুড়িতে স্টেডিয়ামের কাজ শুরু হলেও অনেক কাজই অসম্পূর্ণ ছিল। তখনও পর্যন্ত ড্রেসিংরুম তৈরি হয়নি। গ্যালারিও অর্ধেক বাকি ছিল। কিন্তু প্রদ্যুৎদাও নাছোড়। রাজ্য সরকার তখন অনেকটা বাধ্য হয়েই ঝড়ের গতিতে স্টেডিয়ামের কাজ সম্পূর্ণ করতে বাধ্য হয়েছিল। এ ব্যাপারে আইএফএ থেকেও বিশাল অঙ্কের অর্থ ঋণদানের ব্যবস্থাও করেছিল। বলতে দ্বিধা নেই, শিলিগুড়িতে স্টেডিয়াম নিশ্চয়ই হত। কিন্তু এত দ্রুত সম্পূর্ণ হওয়ার পিছনে অবশ্যই বড় অবদান ছিল প্রদ্যুতদার। প্রসঙ্গত নেহরু কাপকে কেন্দ্র করে সেই সময় সেজে উঠেছিল উত্তরবঙ্গের ব্যস্ততম এই শহর। চেহারাই বদলে গিয়েছিল শিলিগুড়ির। এ ব্যাপারে নেপথ্য নায়ক হিসাবে তাঁর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
এরপর শুরু হল প্রতিযোগিতাকে সুষ্ঠুভাবে আয়োজনের পরিকল্পনা। কলকাতা থেকে বিশাল একটা বাহিনী নিয়ে আয়োজন করেছিলেন অষ্টম নেহরু গোল্ড কাপ। শহরের বিভিন্ন হোটেলে কর্মীদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা, বিদেশি দলগুলোকে আপ্যায়ন, কোনও দিকেই ত্রুটি রাখেননি। সমস্যা হয়েছিল বিদেশি দল আনা নিয়েও। কিন্তু তিনি মাথা ঠান্ডা রেখে এই ব্যাপারেও সফল হয়েছিলেন। সোভিয়েত রাশিয়া এবং পোল্যান্ডের মতো দুটি শক্তিশালী দলকে এনেছিলেন। শিলিগুড়ির ফুটবলপ্রেমী মানুষরা নিশ্চয়ই ১৯৮৮, জানুয়ারি ফেব্রুয়ারি মাসের দিনগুলো আজও মনে রেখেছেন।
আর একটা ঘটনা বলছি। সালটা ১৯৮৯। সেবার সন্তোষ ট্রফির আসর বসেছিল কুইলনে। গড়াপেটা খেলে বাংলাকে ছিটকে দেওয়া হয়েছিল। প্রতিবাদে গোটা বাংলা দল কালো ব্যাজ পরে সেই ম্যাচ দেখতে গিয়েছিল। প্রতিবাদের জন্য এআইএফএফ বাংলা দলকে সাসপেন্ড করতে উদ্যোগী হয়েছিল। এআইএফএফ-এর প্রাক্তন সচিব বাংলার অশোক ঘোষের তখন বিশাল প্রভাব ছিল ভারতীয় ফুটবল প্রশাসনে। অশোকদাকে পরিষ্কারই বলেছিলেন, ‘ফেডারেশন পরিচালকদের বলবেন বাংলার পিছনে যেন লাগার চেষ্টা না করে। আমি কিন্তু হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকব না।’ এই একটা টনিকেই কাজ হয়েছিল।
বাংলার ফুটবলকে বাঁচাতে, বিভিন্নরকম চক্রান্ত রুখতে তিনি একটা দল গড়েছিলেন। সেই দলে আমাকেও রেখেছিলেন। প্রেসিডেন্ট হিসাবে এনেছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের তৎকালীন বিচারপতি অজিত সেনগুপ্তকে। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমরা বেশিদিন তাঁকে কাছে পেলাম না। সত্যি বলতে, আমরা একজন দক্ষ অভিভাবককে অকালেই হারালাম। তাঁর অকাল প্রয়াণে বাংলার ফুটবলে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছিল, সেটা আজও পূরণ হয়নি।