(প্রাক্তন ফিফা আন্তর্জাতিক রেফারি)
প্রদ্যুত দত্ত সম্পর্কে কিছু বলতে গেলে অনিবার্যভাবে এসে যাবে তাঁর অগ্রজ বিশ্বনাথ দত্ত-র নাম। দু-জনই দক্ষ ক্রীড়া সংগঠক। তবে বিশ্বনাথ দত্ত শুধু ফুটবল আঙিনায় আবদ্ধ ছিলেন না। পাশাপাশি সর্বভারতীয় ক্রিকেটেও তিনি দক্ষ একজন প্রশাসক হিসাবে দাগ কেটে গেছেন।
ব্যক্তিগতভাবে ফুটবল, ক্রিকেট, হকি এরকম অনেক খেলা পরিচালনা করেছি দীর্ঘ দিন। ফুটবলে রেফারি হিসাবে শুরু অবিভক্ত ২৪ পরগণা জেলা থেকে। সালটা ১৯৬৮। আমি তখন জেলা ২৪ পরগণায় নিয়মিত রেফারিং করছি। সেই সময় কলকাতার অফিস লিগ ফুটবল পরিচালনার জন্য জেলার রেফারিদের ডেকে আনা হত। প্রথম যখন ময়দানে পা রাখলাম অর্থাৎ বাঁশি বাজাবার সুযোগ পেলাম তখন কলকাতা রেফারিস সংস্থা অর্থাৎ সিআরএ-র সচিব ছিলেন রাসবিহারী চক্রবর্তী এবং আইএফএ-র সচিব ছিলেন বিশ্বনাথ দত্ত।
সেই সময় সিআরএ তাঁবুতে আইএফএ-র গভর্নিং বডির সভা হত। প্রতিটি সভায় তিনি হাজির থাকতেন। সেই সূত্রে খুব কাছে থেকে তাঁকে দেখার সুযোগ হত। তখন কলকাতা ফুটবল ছিল জমজমাট। মে মাসে ফুটবল লিগ শুরু হত। তার আগে এপ্রিলে ময়দান গমগম করত। তখন নিয়মিত খেলা হত পাওয়ার লিগ। এই পাওয়ার লিগ ছিল কলকাতার বড় তিন দলের কাছে প্র্যাকটিস ম্যাচের মতো। তিন বড় দলের পাঁচজন নিয়মিত ফুটবলার পাওয়ার লিগে খেলার সুযোগ পেতেন। আবার নিচের ডিভিশনের খেলা হত এলেন লিগ, বেঙ্গল সরকার লিগ। সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল অফিস লিগ। অফিস লিগে তখন চারটি ডিভিশনে খেলা হত। সেখানে পিটার থঙ্গরাজ থেকে পি.কে. ব্যানার্জি, চুনী গোস্বামী, সুকুমার সমাজপতি, শান্ত মিত্র, প্রশান্ত সিনহা, পরিমল দে, অশোক চ্যাটার্জি, অসীম মৌলিকের মতো ভারতখ্যাত তারকারা প্রায় নিয়মিত খেলতেন। কলকাতা প্রেস ক্লাবের পাশে পৌরপ্রতিষ্ঠান, রিজার্ভ ব্যাঙ্কের এরকম অফিস লিগে খেলা দলগুলোর তাঁবু ছিল। এতগুলো কথা বলার কারণ হল বিশ্বনাথ দত্ত-র সময়ে ময়দান গমগম করত। সর্বস্তরেই বিরাজ করতেন বিশ্বনাথ দত্ত। তাঁর সঙ্গে সব ক্লাবের প্রতিনিধির সঙ্গে ছিল মধুর সম্পর্ক।
তবে তাঁর খুব কাছাকাছি আসার সুযোগ আমার হয়েছিল ১৯৭৮ সাল থেকে। তিনি তখন সিএবি-র সচিব। আমিও তখন নিয়মিত আম্পায়ারিং করছি। আইএফএ-র মতো সিএবি-র সচিব হিসাবেও তিনি অনেক পরিবর্তন এনেছিলেন। বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
বিশ্বনাথ দত্ত-কে নিয়ে এতগুলো কথা বলার কারণ হল তাঁকে অনুকরণ করেই বাংলার ক্রীড়াজগতে অশোক ঘোষ এবং জগমোহন ডালমিয়া ফুটবল এবং ক্রিকেট প্রশাসনে সুনাম অর্জন করেছেন। ফুটবলে যেমন অশোক ঘোষকে হাতে ধরে তৈরি করেছেন সেরকম ক্রিকেটে জগমোহন ডালমিয়াকে।
প্রদ্যুত দত্ত ছিলেন বিশ্বনাথ দত্ত-র কনিষ্ঠতম ভ্রাতা। সেই হিসাবে যোগ্য উত্তরসূরি।
যতদূর জানি অশোক ঘোষ বা জগমোহন ডালমিয়ার মতো ক্রীড়া প্রশাসনের ক্ষেত্রে তিনি বিশ্বনাথ দত্ত-র সান্নিধ্য খুব একটা পাননি। তিনি বাংলা তথা ভারতীয় ফুটবল প্রশাসনে দক্ষতা প্রমাণ করেছেন নিজ গুণে। ব্যক্তিগত চিন্তাধারা, স্বচ্ছ ভাবমূর্তিকে সম্বল করে। প্রশাসক হিসাবে তিনি ছিলেন অসীম সাহসী। এককথায় ডাকাবুকো। কোনওরকম চাপের কাছে মাথা নত করতেন না। রাজ্যের নিয়ামক সংস্থা আইএফএ মাথা উঁচু করে চলেছে প্রদ্যুত দত্ত সচিব থাকাকালীন সময়ে।
এমনিতে তিনি ছিলেন প্রাণখোলা, আমুদে মানুষ। কালীঘাটে ৪বি অপূর্ব মিত্র রোডের বাড়িতে ফুটবলের জমাট আড্ডা বসত। সেখানে সাংবাদিকদের পাশাপাশি, রেফারি, ফুটবল জগতের অনেকেই মাঝেমধ্যে হাজির থাকতেন। নানারকম মুখরোচক খাবার আসত ফুটবল আড্ডায়। নিজে যেমন খেতে ভালবাসতেন সেরকম ভালবাসতেন অন্যদেরও খাওয়াতে। তখন মনে হত না প্রাণখোলা এই মানুষটিই কখনো কঠোর হতে পারেন। যেমন, মহমেডান স্পোর্টিং ক্লাবকে সাসপেন্ড করার মতো সাহস তিনি দেখিয়েছেন। যে জন্য ১৯৮৭ সালে মহমেডান ক্লাবকে দ্বিতীয় ডিভিশনে খেলতে হয়েছিল। ১৯৩৩ সালে যে ক্লাব দ্বিতীয় ডিভিশনে চ্যাম্পিয়ন হয়ে প্রথম ডিভিশনে উঠেছিল, তারপর একনাগাড়ে পাঁচ বছর কলকাতা লিগ জিতে ভারতীয় ফুটবলে ঝড় তুলেছিল। সেই ক্লাবকে মাঠে রেফারির সিদ্ধান্ত না মেনে দল তুলে নেওয়ার জন্য শাস্তি দিতে এতটুকু দ্বিধা করেননি প্রদ্যুৎ দত্ত। কারণ তাঁর কাছে আইএফএ এবং সিআরএ-র সম্মান ছিল এতটাই গুরুত্বপূর্ণ। এরকম একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর মহামেডান ক্লাবের শীর্ষকর্তা মীর মহম্মদ ওমর প্রদ্যুত দত্ত-র কাছে ছুটে গিয়েছিলেন সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য। এমনিতে ওমরের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক তাঁর ভালই ছিল। কিন্তু এই ব্যাপারে ব্যক্তিগত সম্পর্কের ঊর্ধ্বে তাঁর কাছে ছিল আইএফএ-র অস্তিত্ব। মহমেডান শীর্ষকর্তাকে পরিস্কারই বলেছিলেন, ‘দুঃখিত। আমার হাত পা বাঁধা।’
তিনি সাসপেনশনের সিদ্ধান্তে অটল থাকতে পারবেন? এ ব্যাপারে আমাদের মধ্যেও সংশয় ছিল। যখন বললাম আপনাকে সিদ্ধান্ত বদলাতেই হবে। মহমেডানকে সাসপেন্ড করতে পারবেন না। তখন দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছিলেন, ‘পারবই। সিদ্ধান্ত বদলের কোনও সম্ভাবনাই নেই।’ এতটাই কঠোর ছিলেন সেই সময়ে।
আসলে বেনিয়ম তিনি বরদাস্ত করতেন না। স্বভাবতই তিনি সচিব থাকাকালীন রেফারিরা খেলা পরিচালনার ক্ষেত্রে ভরসা পেতেন। সাহসী হতে পারতেন।
সচিব হিসাবে তাঁর বিশাল অবদান হল শিলিগুড়িতে নেহরু কাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজন। আন্তর্জাতিক ফুটবলের এই আসর শিলিগুড়িতে অনুষ্ঠিত হবে বলে যখন তিনি ঘোষণা করলেন তখন সেই মাঠে আন্তর্জাতিক আসর আয়োজনের পরিকাঠামো ছিল না। কিন্তু রাতারাতি শিলিগুড়ির টিনে ঘেরা তিলক ময়দান নতুন রূপ ধারণ করল কাঞ্চনজঙ্ঘা স্টেডিয়াম হিসাবে। আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়ামের পাশাপাশি ড্রেসিংরুম - সবই তৈরি হল যুদ্ধকালীন প্রস্তুতি হিসাবে। পাশাপাশি তৈরি হল সুদৃশ্য রাজপথ, হোটেল এরকম অনেক কিছুই যা নাকি গোটা শহরের চেহারাই বদলে দিয়েছিল। অস্বীকার করার উপায় নেই স্টেডিয়াম, পথঘাট সব কিছুই তৈরি হয়েছিল তৎকালীন রাজ্য সরকারের তত্বাবধানে। তবু মানতেই হবে এইসব উন্নয়নের নেপথ্যে ছিলেন প্রদ্যুত দত্ত।
পরবর্তীতে ফেডারেশন কাপ, সন্তোষ ট্রফি, আই লিগ, এশিয়া কাপের অনেক খেলাই অনুষ্ঠিত হচ্ছে শিলিগুড়িতে। রাতারাতি শিলিগুড়ি হয়ে উঠল ফুটবলের শহর। স্টেডিয়াম না হলে সাইয়ের কমপ্লেক্সও হয়তো এখানে হত না। তাই আমার মতে কাঞ্চনজঙ্ঘা স্টেডিয়ামের নাম হোক - ‘প্রদ্যুত দত্ত কাঞ্চনজঙ্ঘা ক্রীড়াঙ্গন’।