স্নেহ করতেন, আবার শাসনও করতেন

প্রশান্ত ব্যানার্জি

(আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রাক্তন ফুটবলার)

১৯৮০ সালের ঘটনা। ইস্টবেঙ্গল ক্লাব আমাদের বেশ কয়েকজন ফুটবলারের সঙ্গে এতটাই দুর্ব্যবহার করছিল যখন আমরা বাধ্য হয়েই ক্লাব ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। বলতে দ্বিধা নেই আমাদের ফুটবলজীবনে এরকম কঠিন পরিস্থিতি তার আগে কখনো আসেনি। মানসিক দিক দিয়ে তখন আমরা বিধ্বস্ত। সেইসময় একদিন ছুটে গিয়েছিলাম প্রদ্যুতদার কাছে। তিনি তখন বিবেকানন্দ পার্কের কাছে কমলা গার্লস স্কুলের পাশে একটা বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। আমাদের মানসিক অবস্থা তিনি উপলব্ধি করেছিলেন। সব ঘটনা শুনে বলেছিলেন, ‘ক্লাব তোমাদের রাখবে না। সেরকমই যদি হয় তাহলে জর্জ টেলিগ্রাফ ক্লাবে আসতে পার। এখানে খেলে বিভিন্ন টুর্নামেন্ট থেকে যা অর্থ আসবে সবটাই তোমরা পাবে। ক্লাব এক পয়সাও নেবে না।’ বাস্তবে সেটা তখন সম্ভব ছিল না। কারণ, সবাই তখন ইস্টবেঙ্গলে নিয়মিত খেলছি। সম্ভব যে নয় তিনিও জানতেন। তবু আমাদের যন্ত্রণাটা উপলব্ধি তো করেছিলেন।

তিনি ছিলেন ফুটবলারদের দাদা বা অভিভাবক। আবার সেই কারণেই ফুটবলারদের দিক থেকে কোনও অন্যায়, অভব্যতা পছন্দ করতেন না। সেক্ষেত্রে তিনি ছিলেন কঠোর। কঠিন শাস্তি দিতে দ্বিধা করতেন না। ‘আমি তোমাদের এত ভালবাসি, স্নেহ করি, তবু তোমরা কেন নিয়মের বাইরে যাচ্ছ, যেজন্য আমাকে বিব্রত হতে হচ্ছে!’ এরকমই ছিল তাঁর মনস্তত্ত্ব। কথায় বলে না, ‘শাসন করা তাঁরই সাজে, সোহাগ করে যে।’ কোনও বেনিয়ম যেমন বরদাস্ত করতেন না, সেক্ষেত্রে কঠোর হতেন। পাশাপাশি সংশোধন করার সুযোগও দিতেন।

এ প্রসঙ্গে একটা ঘটনার কথা উল্লেখ করছি। ১৯৮৯ সালে কলকাতা লিগে মোহনবাগান বনাম এরিয়ান ম্যাচে খুব গন্ডগোল হয়েছিল, সেই গন্ডগোল সুব্রত ভট্টাচার্য জড়িয়ে পড়েছিলেন। আইএফএ বাবলুদাকে সাসপেন্ড করেছিল। সাসপেনশন বা বড় ধরনের শাস্তি হবেই বুঝতে পেরেছিলাম। যাতে কঠিন শাস্তি না হয় সেজন্য তাঁর কাছে বাবলুদা এবং আমি গিয়েছিলাম। সাসপেনশন না হলেও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হয়েছিল বাবলুদাকে। সেদিন আমাকেও মজা করে বলেছিলেন ‘গন্ডগোলে তোমার নামও আছে। অন্তত ২০০০ টাকা জরিমানা হবেই। অগ্রিম বাবদ চেকটি দিয়ে যাও। তাহলে জরিমানাটা বেশি হবে না। নাম না থাকলে টাকাটা ফেরত পাবে।’

তখন আমি সত্যি একটু ভয় পেয়েছিলাম। যদিও রেফারির রিপোর্টে আমার নাম ছিল না। পরে বুঝলাম স্রেফ আমাকে ভয় দেখাবার জন্য কথাটা বলেছেন বা সতর্ক করে দিয়েছিলেন। এতগুলো কথা বলার কারণ হল, তিনি কোনও ফুটবলারের পা থেকে বল কেড়ে নেওয়ার পক্ষে ছিলেন না। তাই এমন কিছু শাস্তি প্রয়োগ করতেন যাতে ফুটবলাররাও সতর্কিত হতেন।

তাঁর সময়ে ফুটবলারদের বিরুদ্ধে মাঝে মধ্যে কঠোর হতে দেখেছি। এই ব্যাপারটা কিন্তু ফুটবলারদের ভালর জন্যই। ফুটবলের জন্য বিশেষ করে বাংলার ফুটবলের উন্নতির জন্য সবসময়ই চিন্তাভাবনা করতেন। তাঁর সময়ে বাংলার নিয়ামক সংস্থা আইএফএ শক্তিশালী ছিল। যে জন্য সর্ব ভারতীয় ফুটবলের কর্তাব্যক্তিরা আইএফএ-কে সমীহ করতেন। ১৯৮৮ সালে কুইলনে সন্তোষ ট্রফিতে গ্রুপের খেলার দুটো দল গড়পেটা খেলে পরবর্তী রাউন্ডে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছিল। ব্যাপারটায় অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ছিলেন আইএফএ-র তৎকালীন সচিব প্রদ্যুতদা। অনৈতিকভাবে বাংলাকে ছিটকে দেওয়ার জন্য জোরালো প্রতিবাদ করেছিলেন ফুটবল ফেডারেশনে।

এই জায়গাতেই অন্য সচিবদের থেকে তিনি ব্যতিক্রম। সবমিলিয়ে তিনি ছিলেন একজন দক্ষ, নির্ভীক প্রশাসক। আর একটা কথা মনে পড়লে আজও আফসোস হয়। সেটা হল অর্জুন পুরস্কার না পাওয়ার যন্ত্রণা। এই রাষ্ট্রীয় সম্মান অর্জনের ক্ষেত্রে রাজ্য সংস্থার সুপারিশ করতে হয়। তারপর কেন্দ্রীয় ক্রীড়ামন্ত্রক সিদ্ধান্ত নেয়। আমার ক্ষেত্রে তৎকালীন আইএফএ সচিব হিসাবে প্রদ্যুতদা সুপারিশ করেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য সেই সময়ে কেন্দ্রীয় ক্রীড়ামন্ত্রীর পদ থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পদত্যাগ করেছিলেন। তাই তীরে এসেও তরীটা ডুবে গিয়েছিল। ‘রাষ্ট্রীয় সম্মান’ আমার ভাগ্যে জোটেনি। সে যাইহোক, প্রদ্যুতদা আমার নাম সুপারিশ করেছিলেন। এটাই বড় সান্ত্বনা।

Copyright Ⓒ Prodyutdutta.com