বিশিষ্ট ক্রীড়া সাংবাদিক
সাতের দশকের মাঝামাঝি সময়। আমি তখন আকাশবানীতে ফ্রিল্যান্সার। খেলার খবর দিতাম। সেই সময় থেকে আমার ময়দানে ক্রীড়া সাংবাদিকতা শুরু। আকাশবানীর পাশাপাশি বসুমতি, দেশ পত্রিকায় লেখালেখিও করার সুযোগ পেয়ে গেলাম। ১৯৭৬ সালে পাটনায় সন্তোষ ট্রফি। আমি বসুমতির হয়ে কভার করতে পাটনা গেলাম। ওই বছর বাংলা দলের কোচ ছিলেন অরুণ ঘোষ। অধিনায়ক সুরজিৎ সেনগুপ্ত। ১৯৭৮ সালে কোয়েম্বাটোরে ফেডারেশন কাপ। আমি কভার করতে গেলাম ‘দেশ’ পত্রিকার হয়ে। ‘দেশ’ সেইসময় মাসিক পত্রিকা। ফেডারেশন কাপের পুরো কভারেজটা একটা সংখ্যায় ছাপা হবে। কোয়েম্বাটোরে গিয়ে পেলাম দ্য স্টেটসম্যানের শ্যামসুন্দর ঘোষ ও টাইমস অফ ইন্ডিয়ার ভাস্করণকে। ফুটবলের মূল স্রোতে ঢুকে পড়লাম। আমার পরিচিতিও একটু বাড়ল। কোয়েম্বাটোর থেকে ফিরে আসার পর বরেণ্য ক্রীড়া সাংবাদিক মুকুল দত্ত বললেন, ‘তুমি অশোক দাশগুপ্তর সঙ্গে দেখা করো। অশোক একটা খেলার ম্যাগাজিনের দায়িত্ব নিয়েছে। তুমি যোগাযোগ করো’। মুকুলদার নির্দেশ মতো ক্যামাক স্ট্রিটের শান্তিনিকেতন বিল্ডিংয়ের দশ তলায় গিয়ে অশোকদার সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। ম্যাগাজিনটার নাম - ‘খেলার কথা’। আর এই ম্যাগাজিনের মালিক হলেন প্রদ্যুত দত্ত। এই প্রথম জানলাম, কোনও ফুটবল কর্তা কোনও খেলার ম্যাগাজিন করছেন।
‘খেলার কথা’য় যোগ দিলাম। এবং কোয়েম্বাটোরের ফেডারেশন কাপের লেখাটা আর ‘দেশ’ পত্রিকায় ছাপা হয়নি। বড় করে ছাপা হল ‘খেলার কথা’য়। তখনও আমি আকাশবানীতে ফ্রিল্যান্স কাজ করি। একদিন খবর পেলাম, প্রদ্যুত দত্ত আমাকে ময়দানের জর্জ টেলিগ্রাফ ক্লাব তাঁবুতে দেখা করতে বলেছেন। খবর পাওয়া মাত্র পৌঁছে গেলাম।
রাশভারী মানুষ। আমাকে দেখে প্রদ্যুতদা গম্ভীর কন্ঠস্বরে বলে উঠলেন,’ আমি কিন্তু তোমাকে চিনি।’ সেই দিনই জানলাম প্রদ্যুতদা একটা কৃত্রিম পা নিয়ে হাঁটাচলা করেন। তাঁর সঙ্গে আমার সেই শুরু। পরিচয় থেকে দাদা-ভাইয়ের সম্পর্ক। বেশ কয়েকজনকে নিয়ে তাঁর যে একটা বৃত্ত ছিল, আস্তে আস্তে আমি সেই বৃত্তের মধ্যে ঢুকে পড়লাম। তখন শুধু জর্জ ক্লাব নয়, নিয়মিত যাতায়াত শুরু হল প্রদ্যুতদার ৪ বি অপূর্ব মিত্র রোডের বাড়িতে। চমৎকার মানুষ। রসিকতা করতেন। মজা করে কথা বলে বাস্তবটাকে তুলে ধরতেন। কারও সমস্যায় পাশে দাঁড়াতেন কাউকে না জানিয়েই। পরবর্তীকালে আমার মতামতকে গুরুত্বও দিতেন। ‘আজকাল’ পত্রিকা ফুটবলের অনেক এক্সক্লুসিভ খবর করতে পেরেছে প্রদ্যুতদার জন্যই।
প্রদ্যুতদা কখনও তিন প্রধান ক্লাবকে (মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল, মহামেডান) ‘তেল’ দিয়ে আইএফএ সচিব হতে চাননি। এই তিন প্রধানের কর্তাদের ভয় পেতেন না। কর্তাদের সঙ্গে যথেষ্ট ভাল সম্পর্ক ছিল। কিন্তু কোনও ক্লাবের অন্যায় আবদার মেনে নেননি। কখনও মাথা নিচু করেননি। প্রশাসক হিসেবে নিজেকে উর্দ্ধে রাখতেন। আর একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছিলাম, প্রদ্যুতদা সব সময় অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিত্ব করায় গর্ব অনুভব করতেন। এটাও তাঁর কাছে শিক্ষণীয়। এটাই তাঁর চরিত্র। ফলে শত্রুরাও প্রদ্যুতদাকে শ্রদ্ধা করতেন।
দোর্দন্ডপ্রতাপ মহামেডানকে শাস্তি দেওয়া, শিলিগুড়িতে নেহরু কাপ করার আগে স্টেডিয়াম তৈরি করা থেকে তৎকালীন ক্রীড়ামন্ত্রী সুভাষ চক্রবর্তীর সঙ্গে লড়াই করার ঘটনা আজ ইতিহাস হয়ে আছে। জীবনে কোনও চ্যালেঞ্জ নিতে ভয় পেতেন না। ক্রীড়ামন্ত্রীকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে নেহরু কাপ করা, স্টেডিয়াম করা - আমার ৪৬ বছরের ক্রীড়া সাংবাদিকতায় কোনও কর্তাদের মধ্যে দেখিনি এমন ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। প্রশাসক হিসেবে এম দত্ত রায়, পঙ্কজ গুপ্ত, বিশ্বনাথ দত্ত, অশোক ঘোষ, জগমোহন ডালমিয়া, প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি যদি বাংলার ক্রীড়া মহলকে তুলে ধরে থাকেন তাহলে প্রদ্যুতদা লড়াই করে বাংলার ফুটবলকে একটা উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। আমার চোখে ফুটবল প্রশাসক হিসেবে প্রদ্যুতদাই সেরা। তারপরে থাকবেন অশোক ঘোষ।
প্রদ্যুতদা হলেন ফুটবল প্রসারের দিশারি। তিনি যদি আর ৫ বছর বেঁচে থাকতেন তাহলে বাংলার ফুটবলের মানচিত্রটাই বদলে দিতেন এবং সর্বকালের সেরা আইএফএ সচিব হতেন। আজকের দিনে মনে হয়, ব্যক্তি যদি প্রশাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে চায়, তাহলে প্রদ্যুত দত্তই অনুপ্রেরণা।