(প্রাক্তন ফুটবল সচিব, জর্জ টেলিগ্রাফ স্পোর্টস ক্লাব)
প্রদ্যুতদার স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে আমি নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলাম, যে আমি তাঁর সম্পর্কে কতটুকু জানি?
আমার প্রিয় ক্লাব জর্জ টেলিগ্রাফ। এই ক্লাবে আমার যৌবন কেটেছে। এখন জীবন বার্ধক্যে চলেছে। এই দীর্ঘ জীবনের একটা সময় স্বর্গীয় সুখ ও আনন্দময় জীবন ছিল আমার এই জর্জ টেলিগ্রাফ ক্লাবে।
তখন ছিল চাঁদের হাট। একাধারে পূজ্যপাদ বিশ্বনাথ দত্ত ও উজ্জ্বল নক্ষত্র প্রদ্যুত দত্ত।
তখন আমাদের ক্লাবে ময়দানের গুণিজনদের আসা যাওয়া পরিপূর্ণ ছিল। সবসময় আমাদের ক্লাব গমগম করত। যাঁর উদ্দেশ্যে এই লেখা, সেই কর্মবীর প্রদ্যুত দত্ত এই ভিড়ের মধ্যমণি ছিলেন। যিনি ছিলেন একাধারে অসামান্য ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, পাশাপাসি রসিক, অসাধারণ প্রশাসক ও স্নেহশীল।
যখন প্রশাসনিক কর্মের মধ্যে ডুবে যেতেন তখন কারও সাহস হত না তাঁর সঙ্গে কথা বলতে। এমনই ছিল তাঁর ব্যক্তিত্ব। তাঁর পক্ষেই সম্ভব হয়েছিল মহমেডান ক্লাবকে সাসপেন্ড করা। কত তাবড় তাবড় নেতা ও ক্ষমতাবান ব্যক্তি এবং রাজ্যপালের (নুরুল হাসান) অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেননি। কোনও বৃহৎ শক্তির কাছে মাথা নত করেননি। দুই বড় ক্লাবের দুই মহান খেলোয়াড়দেরও শাস্তি দিয়েছেন।
আই এফ এ-র চরম আর্থিক দুরবস্থা। কর্মচারীদের দু মাসের বেতন বাকি, পুজো বোনাস দেওয়া হয়নি। পুজোর বাকি এক সপ্তাহ। প্রদ্যুতদা টাকার ব্যবস্থা করলেন নিজের উদ্যোগে এবং বেতন ও বোনাস দিলেন। আই এফ এ-র কর্মচারীরা আমার সন্তান তুল্য। ওদের পুজোর সময় কিছু না দিয়ে আমাদের পরিবারের পুজোর বাজার করা উচিত নয়।
আমার পুত্র সম্রাট আমার ক্লাব রুমে নিজের থেকে ঢুকে একটা ফুটবল নিয়ে খেলছিল। আমি ও আমার স্ত্রী দৌড়ে গিয়ে ওকে নিষেধ করি এবং ফুটবলটা কেড়ে নিই। আমাদের পিছনে স্নেহময় প্রদ্যুতদা দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমরা দেখিনি। সম্রাটের কাছ থেকে বলটা নিতেই আমার স্ত্রির সামনেই আমাকে বললেন বলটা আমার ছেলেটাকে দিতে এবং আরও বললেন যে ‘‘এই বলটা তোর বাবার নয়।’’ এইরকম স্নেহশীল ছিলেন উনি।
শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড। পরাধীন ভারতবর্ষে ভারতীয় সন্তানদের কারিগরী শিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য জর্জ টেলিগ্রাফের জন্ম। একসময় স্বার্থপর উগ্র আন্দোলনের জন্য এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। তখন পাশে থেকে দেখেছি। ঠান্ডা মাথায় নিপুণতার সাথে ঐ ভয়ঙ্কর উগ্রবাদীদের হটিয়ে জর্জ টেলিগ্রাফ চালু করেছিলেন। তাই তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা সম্পর্কে কোনও সন্দেহ নেই।
সেইসময় প্রদ্যুতদা নিজে জর্জ টেলিগ্রাফের দল গঠন করতেন। খেলোয়াড়ের খোঁজে উত্তম মজুমদারের বাড়িতে রাতে গিয়েছিলাম। তখন প্রদ্যুতদার এত নাম ডাক হয়নি। তাই উত্তম মজুমদারকে আমি শ্রীমানীদার নাম করে ডাকছেন বললাম। প্রদ্যুতদাকে একথা বলতেই উনি অসম্ভব রেগে গেলেন। আমাকে বললেন ‘‘আমি প্রদ্যুত দত্ত হয়ে থাকতে চাই। কারও নাম নিয়ে চলতে চাই না’’। একথা বলে গাড়ি নিয়ে চলে গেলেন। উত্তম মজুমদারের সঙ্গে দেখা করলেন না। এবং রাগে আমাকে গাড়িতে তুললেন না। এমতাবস্থায় গভীর রাতে একদিকে পাড়ার কুকুরের দল অন্যদিকে উত্তম মজুমদারও তাঁর বাড়ি থেকে আসছে, আমি কী করব বুঝতে পারছি না। দূরে প্রদ্যুতদার গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।
একবার জর্জ টেলিগ্রাফ ফুটবল টিম নিয়ে গোয়ায় গোল্ড কাপ ও বোম্বাইতে রোভার্স কাপ খেলে বাড়িতে ফিরে শুনি আগের দিন আমার বাড়ির সামনে একটা খুন হয়েছে। প্রদ্যুতদা আর দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গে লালবাজারের ডিডিদের দিয়ে আমাকে নিয়ে একটা গল্প বানিয়ে ফেললেন। পরের দিন আমি ক্লাবে আসামাত্রই ক্লাবে উপস্থিত পুলিশ ইন্সপেক্টরদের মধ্যে একজন আমাকে পাড়ার খুনের কেসে গ্রেফতার করতে এলেন। আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে কেঁদে ফেলি এবং বলি যে আমি নির্দোষ এবং সেদিন আমি ছিলাম না। তাঁরা আমার কথা শুনতে রাজি হন না। আমার কান্নাকাটির পর প্রদ্যুতদা পুলিশ কর্মীদের চলে যেতে বললেন এবং তাঁরা চলে গেলেন। পরে জানা গেল যে এটা প্রদ্যুতদার এক চরম রসিকতা।
প্রদ্যুতদার আমলে রেফারিদের সাহায্য করা বিষয়টি চালু হয়। দ্বিতীয় রেফারিদের করা এবং কোন ক্লাব রেফারির প্রতি বিরূপ ব্যবহারকারী তাদের চরম শাস্তির বিধান দেওয়া হত। এবং খেলার সময় দৌড়ের ফলে রেফারিদের জলের প্রয়োজন হয়; উনিই প্রথম মাঠে রেফারিদের জল দেওয়া চালু করেন। এবং ময়দানে মহিলা ফুটবলও চালু করেন। এ্যালেন লিগ তুলে দিয়ে ৫ম ডিভিসন চালু করেন। এছাড়া তাঁর একটি সিদ্ধান্ত কলকাতার ফুটবলের গড়াপেটা বন্ধ করার জন্য ৩ পয়েন্ট চালু করলেন। যা পরবর্তীকালে এই নিয়ম ফিফাও গ্রহণ করে।
জর্জ টেলিগ্রাফকে গৌরবান্বিত করেছেন ১৯৭৮ সালে দার্জিলিং গোল্ডকাপ জয় করে। ঐ সময় ময়দানে অনেক বড় বড় ক্লাব জর্জ টেলিগ্রাফকে সমীহ করে চলত।
একদিন ক্লাবে জমজমাট অলোচনা চলছে আইএফএ নিয়ে। সেই সময় ধীলন দাও (সেনগুপ্ত) ছিলেন ঐ আলোচনায়। হঠাৎ আমাকে প্রদ্যুতদা বললেন জিনত আমনকে ডেকে নিয়ে আয়। ধীলনদা বললেন ‘এটা ওর দ্বারা হবে না’। আমি ক্লাবের বাইরে জীনত আমনকে খুঁজি। এমন সময় দেখি খুব সেজে গুঁজে দাঁড়িয়ে আছেন বুলিদা (স্বপন বোস)। আমি বুলিদাকে প্রদ্যুতদার নাম করে ওঁর ঘরে নিয়ে আসি। বুলি ঘরে ঢোকা মাত্র বিরাট হাসির রোল পড়ল।
আমার ভাগ্নে ভারত সরকারের একটা চাকরি পায়। সেখানে যোগ দিতে হলে কলকাতা পুলিশ কমিশনারের সার্টিফিকেট চাই। অথচ হাতে মাত্র একদিন সময়। এই অবস্থায় আমি ভাগ্নেকে নিয়ে প্রদ্যুতদার শরণাপন্ন হই। তিনি সব শুনে আমার ভাগ্নেকে শাবাশ বলে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দেন এবং ওঁর ভিজিটিং কার্ড দিয়ে বললেন লালবাজারে আইপিএস অফিসার স্বরূপ মুখার্জির কাছে গিয়ে এই কার্ডটা দেখাতে এবং উনি নিজে ওঁকে ফোন করবেন বললেন। আমি লালবাজারে যাওয়া মাত্র উনি আমাকে বসতে বললেন এবং কিছুক্ষণ পরে কমিশনারের সার্টিফিকেটটা এনে দিলেন। পরদিন আমার ভাগ্নে চাকরিতে যোগ দিয়ে প্রদ্যুতদাকে প্রণাম করতে এলে প্রদ্যুতদা বললেন ‘মা বাবাকে দেখো’। এমনই মানবিক ছিলেন।
একবার কলকাতা ফুটবল লিগে ইষ্টবেঙ্গল মাঠে জর্জ টেলিগ্রাফের সঙ্গে ইষ্টার্নরেলের খেলা ছিল। সেই খেলায় ইষ্টার্নরেল অফসাইডে থাকা খেলোয়াড়ের গোলে জয় লাভ করে। আমরা মাঠে উপস্থিত জর্জ টেলিগ্রাফের সকলেই উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলাম। খেলা শেষে রেফারির সঙ্গে তুমুল বচসা হয় এবং আমি তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করি। তখন রেফারি অ্যাস্যোসিয়েশনের সচিব সন্তোষ সেন আমার নামে আইএফএ-তে অভিযোগ করেন যে এই ঘটনার ব্যবস্থা না নিলে উনি আর মাঠে রেফারি পাঠাবেন না। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে আমি কিছুদিন গা ঢাকা দিই এবং ক্লাবে আসা বন্ধ করি। এমতাবস্থায় একদিন দেবু মুখার্জি তাঁর গাড়ি করে আমাকে প্রদ্যুতদার বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে দেখি সন্তোষ সেন ও সেই রেফারি রয়েছেন। আমি প্রদ্যুতদাকে সব কথা বলি। তিনি আমাকে ধমক দিয়ে বলেন ‘তুই রেফারিকে হেনস্থা করলি কেন? ওঁর কাছে ক্ষমা চেয়ে নে।’ আমি ওঁর অফসাইডে গোলের কথা বলায় রেফারি উত্তেজিত হয়ে আমাকে বললেন ‘তুমি টেকনিক্যাল ব্যাপার কী বোঝ? প্রদ্যুতদার কথামতো আমি রেফারির কাছে ক্ষমা চাই এবং রেফারিও আমাকে জড়িয়ে ধরলেন এবং মাথা ঠান্ডা করতে বললেন।
আমরা সবাই প্রদ্যুতদার কাছে কৃতজ্ঞ। এবং বর্তমান বাংলার অগ্নিকন্যা ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম শপথ গ্রহণের সময় চারজন ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে ছিলেন। তাঁরা হলেন সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়, বরুণ সেনগুপ্ত, কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় ও আমাদের প্রদ্যুত দত্ত।
দীর্ঘদিন প্রদ্যুতদার সঙ্গে ছিলাম। তাঁকে যেমন দেখেছি সেই কথা বলে আমার শ্রদ্ধা নিবেদন করলাম।