(ক্রীড়া সাংবাদিক)
সারা দেশের ফুটবলে একটা রাজ্য সংস্থার সচিব হয়েও প্রদ্যুত দত্ত ছিলেন একটা তুফান, একটা বিপ্লব, একটা নতুন বাতাস। আই এফ এ-র চেয়ারে তাঁর আগে বসেছেন বাঘা বাঘা ব্যক্তিত্ব। যেমন, বিশ্বনাথ দত্ত, অশোক ঘোষ, অশোক মিত্র বা তাঁদেরও আগে আইএফএ-তে প্রভাব বিস্তার করে গেছেন বেচু দত্ত রায় প্রমুখ। প্রদ্যুত দত্তকে বাদ দিলে অন্য প্রশাসকদের সময় আইএফএ ছিল কার্যত উপগ্রহ (স্যাটেলাইট)। কিন্তু গ্রহ হয়ে বিরাজ করত ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান, মহমেডান প্রভৃতি তারকা ফুটবলার খচিত দলগুলি বা তাদের কর্মকর্তারা। যেমন - জ্যোতিষ গুহ, নৃপেন দাস, মোহনবাগানের শৈলেন মান্না, ধীরেন দে বা মহমেডান স্পোর্টিং-এর এরফান তাহের বা মীর মহম্মদ ওমর প্রমুখ।
এমনকি ক্রিকেট মাঠে তখন জ্বল জ্বল করছেন জগমোহন ডালমিয়া, বিশ্বনাথ দত্তরা। প্রদ্যুত দত্তের সবচেয়ে বড় কীর্তি তিনি আইএফএ-কে স্যাটেলাইটের স্তর থেকে গ্রহ বা তারার স্তরে উন্নীত করতে পেরেছিলেন। ইস্টবেঙ্গল বা মোহনবাগানের আলোয় আইএফএ-কে চেনা যাবে - এই বদনাম থেকে তিনি বের করেন আই এফ এ-কে নিজস্ব পরিচয়ে পরিচিত হতে, পরিচালনা করতে, স্বাধীনতা - সার্বভৌমত্ব নিয়ে চলার যোগ্য করে তুলেছিলেন রাজ্যে এবং রাজ্যের বাইরে।
প্রদ্যুত দত্তের সময়ই আই এফ এ প্রকৃতপক্ষে এ আই এফ এফ-এর সমতুল্য মর্যাদায় স্বীকৃত হতে শুরু করে। যেমন ভোলা যাবে না ১৯৮৭ সালে এআইএফএফ ইলেকশনে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। একদিকে প্রদ্যুত দত্ত এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সন্তোষ মোহন দেব, অন্যদিকে রাজীব গান্ধী মন্ত্রিসভার আর এক সদস্য প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সি এবং অশোক ঘোষ। মুম্বাইয়ের আরব সাগরের তীরে তাজ ইন্টার কন্টিনেন্টাল হোটেলে সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি পদের লড়াই হচ্ছে। নির্বাচন শুরুর আগেই প্রায় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল প্রদ্যুত দত্ত শিবির জয়ী হয়ে সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের নিয়ামক হতে চলেছে। বাজি ফাটানো এবং আবির খেলা শুরুর যখন অপেক্ষা অকস্মাৎ বজ্রপতন ঘটল। জানা গেল, দিল্লি থেকে প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী সন্তোষ মোহন দেবকে অনুরোধ করেছেন, তিনি যাতে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। মহাভারতে কর্ণের রথের চাকা মেদিনীতে বসে যাওয়ার মতোই প্রদ্যুত দত্তের ভাগ্যের সেদিন একই পরিণতি হয়েছিল।
প্রদ্যুত বাবুর কর্মকালে দোর্দণ্ডপ্রতাপ রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী সুভাষ চক্রবর্তীর সঙ্গে অহরহই বিরোধ লেগে থাকত। বামফ্রন্ট সরকারের ক্রীড়ামন্ত্রীর চেষ্টা ছিল কীভাবে আই এফ এ-কে তার নিয়ন্ত্রণে আনা যায়। প্রদ্যুতবাবুর সময়কালে সুভাষবাবুর সে ইচ্ছা সফল হয়নি। শেষ পর্যন্ত প্রদ্যুতবাবু ও সুভাষবাবুর মধ্যে দীর্ঘ মেয়াদি বন্ধুত্ব হয়ে যায় এবং এ ব্যাপারে দৌত্যকার্য করেছিলেন কোনও এক বড় ক্লাবের শীর্ষস্থানীয় এক কর্মকর্তা। ময়দানে তখন ইস্টবেঙ্গল ক্লাবে পল্টু দাস, মোহনবাগানের টুটু - অঞ্জন, আই এফ এ-তে প্রদ্যুত দত্ত, মহমেডান স্পোর্টিং-এ ওমর এবং মহাকরণে রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী সুভাষ চক্রবর্তী - এই ছয় রথীর সমন্বয়ে বাংলা এবং দেশের ফুটবল মঞ্চ সরগরম। কিন্তু কোনও অবস্থাতেই কোনও বড় ক্লাবের দাদাগিরির কাছে তিনি মাথা নোয়াননি। রাজত্বের শেষপর্বে অকৃত্রিম বন্ধু ইস্টবেঙ্গলের পন্টু দাসের সঙ্গেও তার প্রবল মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল। ওমর তখন সবুজ ময়দানের ত্রাস। সেই ওমরের মহমেডান স্পোর্টিং ক্লাবকে শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণে আই এফ এ বেশ কিছুদিন সাসপেন্ড করে দিয়েছিল। মহমেডানকে সাসপেন্ড করলে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে, এই আশঙ্কায় রাজ্য প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্তাদের অনুরোধেও প্রদ্যুতদা মাথা নোয়াননি।
চিমা ওকোরি থেকে সুব্রত ভট্টাচার্য, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য - ফুটবলারদের তিনি প্রাণ দিয়ে ভালবাসতেন এবং আড়াল করতেন। কিন্তু ফুটবল খেলার নব্বই মিনিটে এরা যদি কোনও ফুটবল বিরোধী কাজ করতেন তাদের তিনি শাস্তি দিতে পিছপা হতেন না। আবার অজস্র ঘটনা আছে, সামান্য কারণে দোষ করেছেন ফুটবলার, তাকে তিনি বড় শাস্তির হাত থেকে রক্ষা করেছেন।
সবশেষে বলব, অসম্ভব ভালবাসতেন সাংবাদিকদের। তিনি হিসাব রাখতেন কোনও একটি দৈনিক খবরের কাগজ যার স্থান একনম্বরে তাকে হয়ত একটা স্কুপ দিলেন, হয়ত আরো পর পর তিনদিন তিনটে স্কুপ তৈরি হল। তিনি কখনই সেগুলি বড় কাগজের সাংবাদিকদের দিতেন না। মাঝারি পর্যায়ের কাগজ বা কোনও উঠতি সাংবাদিক - তাদের মধ্যে সেগুলো ভাগ করে দিতেন যাতে তাঁদের ক্যারিয়ারের উন্নতি হয়। আই এফ এ-র গভর্নিং বডিতে তাঁর সময় যত বজ্রগম্ভীর আলোচনা হয়েছে। সঙ্গে রসনাতৃপ্তি (খেতে এবং খাওয়াতে খুব ভালবাসতেন) - সেখানেও তিনি এক নম্বর।
সময়টা ১৯৮৪, বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তখন সবে যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্র থেকে সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে হারিয়ে সারা দেশের বিস্ময় এবং চোখের মণি। প্রদ্যুত দত্ত তখনই টের পেয়ে ছিলেন - এ মেয়ে বাঘিনি। প্রায় প্রতি সন্ধ্যায় সাংসদ মমতা চলে আসতেন প্রদ্যুতবাবুর ৪বি, অপূর্ব মিত্র রোডের বাড়ি এবং অফিসে। চলত ঘন্টার পর ঘন্টা আলোচনা। আজ যদি প্রদ্যুত দত্ত বেঁচে থাকতেন কর্ণের মত তাঁর রথের চাকা মাটিতে বসে যেত না। মমতা তাঁকে তুলে এনে বসাতেন সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতির চেয়ারে। বাংলা তথা ভারতের ফুটবলের এই হতোদ্যম দশা আমাদের দেখতে হত না।