প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পিছনে প্রদ্যুতদা

অলোক মুখার্জি

(আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রাক্তন ফুটবলার)

আমার বাড়ি উত্তর ২৪ পরগনা জেলার ইছাপুরে। ইছাপুরের মাঠ থেকেই আমার ফুটবল জীবনের যাত্রা শুরু। জেলা লিগে খেলতাম ইছাপুর অনুশীলনী ক্লাবে। ঐ ক্লাব তখন জেলার ফুটবলে দাপটের সঙ্গে বিচরণ করত। সেই দলে আমিও একদিন সুযোগ পেলাম। একথা নিশ্চয়ই নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না তাহল, বাংলা তথা ভারতীয় ফুটবলে জেলা উত্তর ২৪ পরগনার অবদান। চার-এর দশকের গোড়া থেকেই বছরের পর বছর ভারতীয় ফুটবলে ২৪ পরগনা জেলার ফুটবলাররা দাপটের সঙ্গে বিচরণ করেছেন। কিন্তু এটাও ঘটনা অনেক প্রতিভাবান সুযোগের অভাবে নিজেদের মেলে ধরতে পারেননি। অকালেই হারিয়ে গেছেন। সেক্ষেত্রে আমি নিজেকে ‘ভাগ্যবান’ বলে মনে করি। কারণ, আমার ফুটবল জীবনে প্রদ্যুত দত্তর মতো একজন অভিভাবককে মাথার উপরে পেয়েছিলাম। হ্যাঁ, তিনি আমার অভিভাবকই ছিলেন। বাড়িতে যেমন বাবা, মা হলেন অভিভাবক। কিন্তু বাড়ির বাইরে এমন কিছু সহৃদয় ব্যক্তি থাকেন যাঁরা সঠিক পথে পরিচালনা করতে সহযোগিতা করেন। আমারও ফুটবল জীবনে এমনই একজন মানুষ ছিলেন প্রদ্যুতদা। কারণ, তিনিই আমাকে সঠিক পথে পরিচালনা করেছেন।

১৯৮০ সালে ইস্টবেঙ্গল দলটাই ভেঙে গিয়েছিল। প্রদীপদা সেবার ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। ১৯৭৯ সালে তাঁর কোচিংয়েই খেলেছিলাম রেল দলে। কারণ, বড় দলে কোচিংয়ের পাশাপাশি প্রদীপদা রেল দলেরও দায়িত্ব সামলাতেন। তিনি আমাকে ইস্টবেঙ্গল ক্লাবে সইয়ের জন্য প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন।

এদিকে আমি তখন জর্জ টেলিগ্রাফ ক্লাবের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে গেছি। এক কথায় প্রদ্যুতদা-র কব্জায়। প্রদীপদা আমাকে খুঁজছেন শুনে প্রদ্যুতদা বেশ জোরের সঙ্গেই বলেছিলেন, ‘তুমি আগামী দিনে ভারতীয় দলে খেলবে। সবে এক বছর প্রথম ডিভিশনে খেলছে। এখনই তাড়াহুড়ো কোরো না। কোনও প্রলোভনে পা বাড়াবেনা।’ শিবরাত্রির দিনে ওই কথাগুলো তিনি বলেছিলেন।

একটা বছর আমি জর্জ টেলিগ্রাফে খেলেছিলাম। পরের বছরই যোগ গিয়েছিলাম মহমেডান ক্লাবে এবং সত্যি সত্যি ভারতীয় দলেও সুযোগ পেয়েছিলাম।

তিনি আমাকে সবসময় গাইড করতেন। রেল দলে থাকলে চাকরি নিশ্চিত ছিল। প্রদ্যুতদা আমার চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন এফসিআই (ফুড কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া)-তে। এফসিআই-এর স্পোর্টস অফিসার প্রদীপ মিত্র-র কাছে আমার জন্য সুপারিশ করেছিলেন। আমার বাবাকে বলেছিলেন, ‘রেলের মতো বেতন এফসিআই থেকে পাবে না। তবে আমরা সেই ঘাটতি মিটিয়ে দেব।’

১৯৮৯ সালে সন্তোষ ট্রফিতে বাংলা দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। অধিনায়ক হিসাবে নির্বাচকরা আমাকে বেছে নেওয়ার পিছনে প্রভাব ছিল প্রদ্যুতদার। কারণ, আইএফএ-র প্রথা অনুযায়ী আমার আগে একটা ম্যাচ খেলার জন্য সেবার অধিনায়ক হওয়ার কথা ছিল সুদীপ চ্যাটার্জির। প্রদ্যুতদা নির্বাচকদের বলেছিলেন, ‘দলের নেতৃত্বে থাকবে অলোক। কারণ, অলোক আমার ক্লাবের প্লেয়ার।’

তাঁর অকৃত্রিম ভালবাসা, স্নেহ আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে। একদিকে প্রবল ব্যক্তিত্ব, পাশাপাশি স্নেহপ্রবণ। তাঁর মতো ব্যক্তিত্ববান কর্মকর্তা আমি অন্তত দেখিনি। আজকের দিনে, বিশেষ করে বাংলার ফুটবলের দুঃসময়ে প্রদ্যুতদার মতো একজন কর্মকর্তার অভাব প্রতি মুহূর্তে অনুভব করছি।

Copyright Ⓒ Prodyutdutta.com