(প্রাক্তন ফুটবলার, জর্জ টেলিগ্রাফ স্পোর্টস ক্লাব)
১৯৭৫ সালে কলকাতা লিগে টালিগঞ্জ অগ্রগামীর হয়ে জর্জ টেলিগ্রাফের বিপক্ষে খেলেছিলাম। ম্যাচে আমরা ২-০ গোলে জিতেছিলাম। মনে হয় ভালই খেলেছিলাম, গোলও করেছিলাম। সেদিন মাঠে প্রদ্যুতদা হাজির ছিলেন। নিশ্চয়ই তাঁর নজর কেড়েছিলাম। কারণ পরবর্তীতে ১৯৭৬ সালের গোড়ার দিকে জর্জ টেলিগ্রাফের হেরম্ব চক্রবর্তী জর্জে খেলার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। আমি তখন কলেজ ষ্ট্রিটে থাকতাম। প্রথম দিন হেরম্বদাকে কথা দিতে পারিনি। সময় চেয়েছিলাম। তারপর কিছুদিন বাদে জলপাইগুড়িতে নিজের বাড়িতে যাওয়ার পর একদিন সেখানেও গিয়ে হাজির হলেন হেরম্বদা। বললেন, আর সময় নিতে পারব না। এবার আমার সঙ্গে কলকাতায় যেতেই হবে। আমাদের বাড়িতে কদিন থাকলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর সঙ্গেই কলকাতায় ফিরে এলাম। তখন বুঝলাম সত্যিই জর্জ টেলিগ্রাফ আমাকে দলে নেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী।
প্রথমে কথা দিতে পারিনি যার একটিই কারণ হল অমল দত্ত। অমলদা তখন টালিগঞ্জের কোচ ছিলেন। তাঁর কোচিংয়ে খেলার সুযোগ ছাড়তে চাইনি। এদিকে কলকাতায় আগে থেকেই খবর ছিল অমলদা হয়তো ১৯৭৬ সালে ইস্টবেঙ্গলের দায়িত্ব নিচ্ছেন। কলকাতায় এসে খবরটা নিশ্চিত জানার পর জর্জ টেলিগ্রাফে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে মানসিকভাবে তৈরি হয়ে গেলাম। শিয়ালদার জর্জ টেলিগ্রাফ ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের অফিসে গিয়ে প্রদ্যুতদার সঙ্গে দেখা করার সময়ই অমলদা যে ইস্টবেঙ্গলে যোগ দিচ্ছেন খবরটায় নিশ্চিত হয়েছিলাম। প্রথমদিনই তাঁর সঙ্গে কথাবার্তা বলে বুঝেছিলাম সত্যিই তাঁরা আমার ব্যাপারে প্রবলভাবে আগ্রহী। প্রথমদিনই প্রদ্যুতদার সঙ্গে কথা বলে বুঝেছিলাম তিনি এককথার মানুষ। প্রবল ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন একজন কর্মকর্তা। কোনওরকম ভনিতা তাঁর মধ্যে ছিল না।
সেই সময় অল ইন্ডিয়া ইলেকট্রিক্যাল ফুটবল প্রতিযোগিতায় দল গঠনের জন্য কলকাতার প্র্যাকটিস চলছিল। আমাদের অফিসের অনেকেই দেখলাম জর্জ টেলিগ্রাফের দিকে পা বাড়িয়ে রেখেছেন। খবরটা জানার পর আমারও আর জর্জে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে কোনও দ্বিধা রইল না। প্রদ্যুতদাও সেই সময় আমাদের প্র্যাকটিস দেখতে মাঠে এসেছিলেন। তখনই একদিন তাঁর সঙ্গে কথাবার্তা চূড়ান্ত হয়ে গেল। আমি তখন পেটের রোগে ভুগছিলাম। খবরটা জানার পর প্রদ্যুতদা আমাকে তুলে এনেছিলেন তাঁর ভবানীপুরের বাড়িতে (৩১ এ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি রোড) সেখানে থেকেই আমার চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলেন। তাঁর পারিবারিক চিকিৎসকই আমাকে সুস্থ করে তুলেছিলেন। এদিকে আমাদের অফিস দলের ম্যানেজার ছিলেন জর্জ টেলিগ্রাফ ক্লাবের কর্তা। তিনি কোচ অমলদার সঙ্গে কথা বলেছিলেন, অমলদাও আমাকে জর্জ টেলিগ্রাফে খেলার পক্ষে সায় দিয়েছিলেন।
সুস্থ হয়ে ওঠার পরও আমি প্রদ্যুতদার ভবানীপুরের বাড়িতেই থাকতাম। এদিকে আমি জর্জ টেলিগ্রাফে যাচ্ছি খবরটা শুনে টালিগঞ্জ অগ্রগামী ক্লাবের দু-একজন কর্মকর্তা আমাকে ধরে রাখার জন্য ভবানীপুর থানায় ডায়েরি করেছিলেন। তাঁদের অভিযোগ ছিল, ‘আমাকে নাকি ‘কিডন্যাপ’ করে প্রদ্যুতদার বাড়িতে রাখা হয়েছে।’ সেই ডায়েরির ভিত্তিতে একদিন ভবানীপুর থানার পুলিশ হানা দিয়েছিল প্রদ্যুতদার বাড়িতে। আমি যে ঘরে থেকেছি সেই ঘরে জর্জের আরও কয়েকজন ফুটবলারকে রাখা হয়েছিল। দু-তিনজন পুলিশ অফিসার জানতে চাইলেন ‘বিপ্লব মজুমদার কে?’ আমিও তখন উঠে দাঁড়ালাম। ওরা তখন বললেন, ‘আপনাকে থানায় যেতে হবে।’ সেই সময় রাতে আমরা (বিভু চক্রবর্তী, শিবব্রত নাথ এরকম কয়েকজন) তখন খোশমেজাজে আড্ডা মারছি। পুলিশ আমাকে তুলে আনে ভবানীপুর থানাতে।
ঘটনা হল, প্রদ্যুতদার বাড়ির উল্টোদিকেই হল ভবানীপুর থানা। পুলিশ আমাকে ওখানে জেরা করছিল। এদিকে খবরটা প্রদ্যুতদার কানে পৌঁছতেই তিনিও আর ঘরে বসে থাকতে পারলেন না। কারণ তাঁরা হলেন কলকাতা তথা গোটা দেশের এক সম্রান্তশালী পরিবারের সদস্য। খেলাধুলা এবং সর্বোপরি শিক্ষাজগতে জর্জ টেলিগ্রাফ একটা সুপরিচিত প্রতিষ্ঠান। তাই প্রদ্যুতদা পোশাক পরিবর্তন না করে লুঙ্গি পরা অবস্থায় ছুটে এলেন থানাতে। পুলিশের কাছে জানতে চাইলেন অভিযোগটা কী? ওরা বললেন, ‘আমাকে নাকি রাতে রাস্তায় ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায়। আমি এখানকার বাসিন্দা নই।’ প্রবল প্রতিবাদ জানিয়ে প্রদ্যুতদা বললেন, ‘এখানকার বাসিন্দা নয় ঠিকই, তবে ও আমার বাড়িতেই থাকে।’
আমিও তখন মনে জোর পেয়ে গেলাম। আমার অপরাধটা কী জানতে চাইলাম। ওরা বললেন, ‘আপনি রাতে রাস্তায় ঘোরাঘুরি করেন।’ প্রবল প্রতিবাদ করলেন প্রদ্যুতদা। তাঁর সঙ্গে তর্কাতর্কি হল বেশ কিছুক্ষণ। তাঁর যুক্তিকে খন্ডন করতে না পেরে তখন একটু নরমও হলেন থানার অফিসাররা। পরে যখন শুনলেন তিনি বিশ্বনাথ দত্তর ছোট ভাই তখন ওরা জানালেন, ‘আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ বিপ্লব মজুমদারকে ‘কিডন্যাপ’ করে আপনার বাড়িতে আটকে রেখেছেন। তখন আমিও ঠিক না থাকতে পেরে বলেছিলাম, আমি কি মহম্মদ হাবিব যে ‘কিডন্যাপ’ করতে হবে? তখন আমার কথার সায় দিয়ে থানার ইনচার্জ অফিসারও বললেন, উনি তো ঠিকই বলেছেন। পাশাপাশি টালিগঞ্জ অগ্রগামীর কর্মকর্তাদের ধমকের সুরে বলেছিলেন ‘এভাবে আমাদের অযথা বিরক্ত করবেন না। আমাদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ থাকে।’
সেদিনই বুঝেছিলাম কত বড় মাপের ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ছিলেন আমাদের প্রদ্যুতদা। অথচ তখনও তাঁর তেমন নামডাক হয়নি। মাত্র দু-বছর আগে দলের দায়িত্ব নিয়েছেন। তবু তাঁর প্রবল আত্মবিশ্বাস ও সততা থানার অফিসারদেরও মুগ্ধ করেছিল।
থানা থেকে বেরিয়ে আসার পর প্রদ্যুতদার মুখে দেখেছিলাম স্বস্তি। বলেছিলেন, ‘তুমি আজ আমার এবং আমাদের পরিবারের সম্মান রাখলে। যদি বলতে ‘কিডন্যাপ’ করেছি তাহলে মুখ দেখাতে পারতাম না।’
প্রবল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন প্রদ্যুতদাকে বাইরে থেকে খুব কঠিন মনে হত, কিন্তু আসলে তিনি ছিলেন অত্যন্ত অমায়িক। উচ্চশিক্ষিত, ভদ্রলোক এই মানুষটির অকৃত্রিম ভালবাসা কোনও দিন ভুলতে পারব না। প্রদ্যুতদার ভবানীপুরের বাড়িতেই বিভু, শিবু (শিবব্রত) এবং আমি একসঙ্গে থাকতাম। সেই সময় খুব কাছে থেকে তাঁকে দেখেছি। আমাদের কাছে তিনি ছিলেন বড় দাদার মতো। গোটা দলকে একসূত্রে বেঁধেছিলেন। তার রেজাল্টও আমরা পেয়েছিলাম। কলকাতা লিগ, আই.এফ.এ শিল্ড, দার্জিলিং গোল্ডকাপ -- প্রতিটি আসরেই জর্জ টেলিগ্রাফ ছিল সাড়াজাগানো একটা দল। তিন বড় দলও সমীহ করত জর্জ টেলিগ্রাফকে। যার নেপথ্যে কারিগর ছিলেন স্বয়ং সচিব প্রদ্যুত দত্ত।
কিন্তু আমার আক্ষেপ প্রদ্যুতদার স্নেহ-মমতার প্রতিদান সেভাবে দিতে পারিনি। পায়ে চোট পেয়েছিলাম বলে ১৯৭৭ সালে সেভাবে খেলতে পারিনি। অস্ত্রোপচারের পরেও স্বাভাবিক ছন্দে আর ফিরে পাইনি। তবু প্রদ্যুতদা আমাকে ভুলে যাননি। তিনি আইএফএ-র সচিব হওয়ায় পরই আমাদের জলপাইগুড়ির বাড়িতে এসেছিলেন। তখনই শেষবারের মতো দেখা হয়েছিল। সত্যি, এরকম একজন বড়মাপের মানুষের সান্নিধ্য পাওয়া তো ভাগ্যের ব্যাপার। স্বভাবতই আমিও নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি।
পুনঃ - আমি যেবার প্রথম জর্জে এসেছিলাম সেবার ফরোয়ার্ডে মনীশ মান্না, শিবব্রত নাথও ছিল। প্রদ্যুতদা বলেছিলেন, ‘তুমি জান না, কত বড় ফুটবলার হতে পারবে।’