আমাকে স্নেহ করতেন, তবু তাঁকে ভয় পেতাম

মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য

(আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফুটবলার)

কলকাতা ময়দানে আমার প্রথম ক্লাব হল কাশীপুর সরস্বতী। কাশীপুর সরস্বতী ক্লাব তৃতীয় ডিভিশনে খেলত। সেই ক্লাব থেকে ১৯৭৫ সালে যোগ দিয়েছিলাম জর্জ টেলিগ্রাফ ক্লাবে। আমি নিজেই ভাবতে পারিনি জর্জ টেলিগ্রাফের মতো শক্তিশালী দলে খেলার জন্য ডাক পাব। জর্জ টেলিগ্রাফ ক্লাবে তখন দল গঠনের ব্যাপারে বড় ভূমিকা ছিল মন্টু ব্যানার্জির। পুটেদা নিজেও এই ক্লাবে খেলেছেন। দলবদল শুরুর কয়েকদিন আগে প্রদ্যুৎদা নিজেই এসেছিলেন আমার টিটাগড়ের বাড়িতে। তাঁর সঙ্গে ছিলেন তিন বিশ্বস্ত রিক্রুটার, পুটেদা, বাচ্চুদা, আদিত্যদা। সাদা অ্যাম্বাসাডর গাড়ি করে তাঁরা এসেছিলেন। আমাদের মতো একজন সাধারণ পরিবারের বাড়ির সামনে যখন গাড়িটা থামল তখন একটু অবাকই হয়েছিলাম। একটু পরে আরও অবাক হলাম যখন গাড়ি থেকে নেমে ওঁরা তিনজন আমার নাম ধরে ডাকতে লাগলেন। আমি তখন জানালার ফাঁক দিয়ে ওদের দেখছিলাম। প্রদ্যুতদা গাড়িতে বসেছিলেন। ঘর থেকে বেরিয়ে আসার পর প্রদ্যুতদা বললেন, ‘গাড়িতে ওঠো’। সবকিছু দেখে আমি তখন একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম। তাই কেন ডাকছেন, কোথায় যাব বলার সুযোগই পেলাম না। সেদিন থেকেই আমার পথ চলা শুরু হল জর্জ টেলিগ্রাফ ক্লাবে।

সইয়ের পর প্র্যাকটিস শুরু হল। আমাদের প্র্যাকটিস হত জর্জ টেলিগ্রাফ তাঁবুর পাশেই সিটি এসি মাঠে। প্রদ্যুতদা প্রায়ই প্র্যাকটিসের সময় হাজির থাকতেন। জর্জ টেলিগ্রাফের আক্রমণভাগ সেবার যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল। মণীশ মান্না, চিন্ময় পাল, নিমাই দালালরা তখন বড় দলের ঘুম কেড়ে নিত। স্বভাবতই প্রথম দিকে আমি সুযোগ পেতাম না। প্রথম সুযোগ পেলাম মহমেডান ক্লাবের বিপক্ষে দ্বিতীয়ার্ধের শেষ দিকে। সেই ম্যাচের পর আর অমাকে সাইড বেঞ্চে বসে থাকতে হয়নি। আমাকে প্রথম দিন থেকেই উৎসাহিত করতেন। স্নেহ করতেন। কোনওরকম আর্থিক চুক্তি ছাড়াই আমি জর্জে সই করেছিলাম। কিন্তু সেজন্য আমার কোনও অসুবিধা হয়নি। কারণ প্রতিদিনই ম্যাচের শেষে আমার হাতে ১০০/২০০ টাকা ধরিয়ে দিতেন। আবার কখনো আবদার করলে বিমুখ করতেন না। কারণ, আমাদের আর্থিক অবস্থা যে ভাল নয় সেটা একদিন এসেই বুঝতে পেরেছিলেন।

আমার শরীর যাতে চাঙ্গা থাকে সেজন্য ভিটামিন ট্যাবলেট দিতেন। জর্জ টেলিগ্রাফের পরিবেশ ছিল চমৎকার। প্র্যাকটিস শেষে চমৎকার টিফিনের ব্যবস্থা থাকত। একটা গোটা মুরগির স্টু থাকত খাবার টেবিলে। এসবই হত প্রদ্যুৎদার নির্দেশে।

১৯৭৬ এবং ১৯৭৭ সাল জর্জ টেলিগ্রাফের সোনার বছর। সেই সময় ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান মহমেডানের রাতের ঘুম কেড়ে নিতাম আমরা। ১৯৭৭ সালে দার্জিলিং গোল্ড কাপ এবং পদ্মজং গোল্ড কাপে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম আমরা। ১৯৭৭ সালে কলকাতা লিগে ১-০ গোলে হারিয়েছিলাম মহমেডান ক্লাবকে। ম্যাচে আমি গোল করেছিলাম। ১৯৭৮ সালেও রুখে দিয়েছিলাম মোহনবাগানকে।

১৬ নম্বর জার্সি গায়ে জর্জ টেলিগ্রাফে ৯ বছর খেলেছি। এক বছর মহমেডানে গেলেও আবার ফিরে এসেছি প্রদ্যুতদার আকর্ষণে। ঘটনা হল মহমেডানে সইয়ের আগে প্রদ্যুতদার অনুমতি নিয়েছিলাম। আসলে জর্জ টেলিগ্রাফ থেকে কোনও ফুটবলার বড় দলে ডাক পেলে তিনি খুশি হতেন। কখনও বাধা দিতেন না। ময়দানের অন্যান্য মাঝারি ক্লাবের কর্মকর্তাদের মতো জোর করে ধরে রাখতে চাইতেন না। তিনি ফুটবলারদের প্রাণ দিয়ে ভালবাসতেন। আমার কাছে তিনি ছিলেন ‘পিতৃতুল্য’।

ক্লাবে অনেকেই মজা করে আমাকে বলতেন ‘প্রদ্যুতদা-র বড় ছেলে’।

খেলা ছাড়ার পরও জর্জ টেলিগ্রাফ ক্লাব ছিল আমার হৃদয় জুড়ে। ময়দানে কখনও গেলে জর্জ টেলিগ্রাফ তাঁবুতে একবার যেতে ভুল হয় না।

Copyright Ⓒ Prodyutdutta.com