প্রদ্যুতদা নেই ভাবতেই পারি না

বলরাম চৌধুরি

(মোহনবাগান ক্লাবের প্রাক্তন ভাইস প্রেসিডেন্ট)

আমি আপাদমস্তক মোহনবাগানি। একথা ময়দানের সবাই জানেন। কিন্তু একথা শুনলে হয়তো অনেকেই বিশ্বাস করবেন না, তাহল আমার কাছে মোহনবাগান ক্লাবেরও আগে থাকবেন প্রদ্যুত কুমার দত্ত।

আসলে ময়দানে আমার খুব একটা আনাগোনা ছিল না। মোহনবাগানের খেলা দেখতে যেতাম ঠিকই। তবে ক্লাব কর্তাদের সঙ্গে বিশেষ যোগাযোগ ছিল না। ঘটনা চক্রে ১৯৮৬ সালে তৎকালীন মোহনবাগান সচিব ধীরেন দে-র আস্থা অর্জন করেছিলাম। ১৯৮৬ সালে চীনে এশিয়ান ক্লাব কাপে মোহনবাগান খেলতে গিয়েছিল। ওখানে ম্যাচ হেরে যাওয়ার পর সমস্যায় পড়েছিল গোটা দল। কলকাতায় ফেরার কোনও বিমান সেদিন ছিল না। আমি সেই সময় হংকংয়ে ছিলাম। বন্ধু ফুটবলার সুব্রত ভট্টাচার্য আমাকে সমস্যার কথা জানালে আমি গোটা দলকে (২৬) এয়ারপোর্টে রাখার ব্যবস্থা করেছিলাম। বাড়ি ফেরার জন্য বিমানের টিকিটের ব্যবস্থা করেছিলাম। ক্লাব চীন থেকে ফেরার পর শীর্ষকর্তা ধীরেন দে আমাকে ডেকে পাঠালেন। তখন থেকেই জড়িয়ে পড়লাম মোহনবাগান ক্লাবের সঙ্গে।

পাশাপাশি সেই সময়েই পরিচয় হল প্রদ্যুতদার সঙ্গে। আমার বন্ধু তালতলা ক্লাবের দেবু মুখার্জি একদিন নিয়ে গিয়েছিলেন প্রদ্যুতদার কাছে। প্রথম দিন থেকেই অন্তরঙ্গতা হয়ে গেল প্রদ্যুতদা-র সঙ্গে। খুব কাছ থেকে তাঁকে দেখেছি। অনেক ব্যাপারেই তিনি আমাকে গাইড করেছেন। বিশেষ করে মোহনবাগানের মতো ঐতিহ্যশালী ক্লাবে কীভাবে চলতে হবে এ ব্যাপারে বিভিন্ন সময়ে তাঁর পরামর্শ পেয়েছি।

তাঁর বিচক্ষণতা, প্রশাসনিক দক্ষতা নিয়ে নতুন করে কিছু বলার অপেক্ষা রাখে না। পাশাপাশি প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে মোকাবিলা করে কীভাবে এগিয়ে যেতে হয় এই ব্যাপারটা প্রদ্যুতদার পাশে থেকে দেখেছি। বিশেষ করে ১৯৮৮-৮৯ সালে বেশ কয়েকটি ব্যাপারে কঠিন বাধার সামনে তাঁকে পড়তে হয়েছিল। আর্থিক দেনায় জর্জরিত হয়ে পড়েছিল আইএফএ। সেই সময় পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য ভবন ২২ লাখ টাকার বিনিময়ে বন্ধক দিতে বাধ্য হয়েছিলেন প্রদ্যুতদা।

দুঃখজনক ঘটনা হল, এরকম একটা দুঃসময়ে বাংলার দুই বড় ক্লাবের চূড়ান্ত অসহযোগিতা। শিল্ডে ইস্টবেঙ্গল অংশগ্রহণই করল না। মোহনবাগান অবশ্য পরবর্তীতে মূল স্রোতে ফিরে এসেছিল।

সেই সময় প্রদ্যুতদার বলিষ্ঠতা এবং দৃঢ়তা লক্ষ্য করেছি। বিভিন্ন মহলের চাপ এবং হুমকির কাছে তিনি আত্মসমর্পণ করেন নি। এমনকী মাঝারি ধরনের কয়েকটি ক্লাব মামলা মোকদ্দমায় জর্জরিত করেছিল। সংস্থা পরিচালনা করতে গিয়ে বারে বারে বাধার সম্মুখীন হচ্ছিলেন।

এরকম একটা দুর্বিষহ অবস্থা কাটাবার জন্য দেবু মুখার্জি এবং আমি হাইকোর্টের তৎকালীন বিচারপতি অজিত সেনগুপ্তকে প্রেসিডেন্ট পদে বসাবার জন্য প্রদ্যুতদার কাছে আবেদন করেছিলাম। আমাদের আবেদন প্রদ্যুতদা মেনে নিয়েছিলেন। পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট পদের প্রস্তাবে রাজি হয়েছিলেন বিচারপতি অজিত সেনগুপ্ত। বলতে দ্বিধা নেই, অজিত সেনগুপ্ত প্রেসিডেন্টের চেয়ারে বসার পর থেকেই কারণে-অকারণে কয়েকটি ক্লাবের মামলা করার প্রবণতা একদমই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

তবে কয়েকটা ক্লাব বিরক্ত করলেও বেশিরভাগ মাঝারি এবং ছোট ক্লাব সব সময়ই প্রদ্যুতদার পাশে ছিল। প্রথম থেকে পঞ্চম ডিভিসনের বেশিরভাগ ক্লাবেরই আর্থিক অবস্থা সঙ্গীন ছিল। সবসময়ই সেইসব ক্লাবের পাশে দাঁড়াতেন প্রদ্যুতদা। স্বভাবতই প্রদ্যুতদার সঙ্গে ক্লাবগুলো বেইমানি করেনি।

১৯৮৭ সালে কলকাতার সন্তোষ ট্রফি এবং ১৯৮৮ সালে শিলিগুড়িতে সফলভাবে নেহরু গোল্ড কাপ আন্তর্জাতিক ফুটবল আয়োজনের ক্ষেত্রে তিনিই ছিলেন সেনাপতি। সেই সময় অনেকেই তাঁকে ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের শীর্ষ পদে দেখতে চেয়েছিলেন। সেই দলে ছিলেন তৎকালীন কেন্দ্রীয় ইস্পাত মন্ত্রী শিলচরের সন্তোষ মোহন দেবও। ঠিক হয়েছিল প্রেসিডেন্ট পদে দাঁড়াবেন সন্তোষ মোহন দেব এবং সচিব পদে প্রদ্যুত দত্ত। কিন্তু আশ্চর্যজনক ঘটনা হল, শেষ পর্যন্ত তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর নির্দেশে সন্তোষ মোহন দেব লড়াই থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। স্বভাবতই একা প্রদ্যুতদার লড়াই করা সম্ভব ছিল না।

এতক্ষণ যা সব কথা বললাম সব কিছুই ফুটবল প্রশাসক হিসাবে তাঁর ভূমিকা নিয়ে। এবারে একটু মানুষ প্রদ্যুতদা নিয়ে কিছু বলতেই হয়। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন দিলখোলা, ভোজনরসিক এবং মজাদার। ছটা ডিম টোস্ট একবারে খেতে পারতেন। এরকম মুখরোচক খাবারের দিকে তাঁর ঝোঁক বরাবরই। সেক্ষেত্রে শরীর-স্বাস্থ্য সুরক্ষার কথা ভাবতেন না।

মাঝে মধ্যে আবার টেনশনে ফেলে দিতেন। এরকম একটা ঘটনার সাক্ষী আমি নিজেও। সেবার প্রদ্যুতদার সঙ্গে দুর্গাপুরে ব্যবসা সংক্রান্ত ব্যাপারে গিয়েছিলাম। অ্যালয় স্টিল প্ল্যান্টের ম্যানেজিং ডিরেক্টরের সঙ্গে কথা বলতে। ব্যবসার জন্য প্রদ্যুতদার তখন তিন লাখ টাকার প্রয়োজন ছিল। সঙ্গে অত টাকা নেই। কলকাতায় ফোন করলেন ভাইপো বাপিকে (সুব্রত দত্ত)। কথা মতো বাপি টাকা নিয়ে চলে এল। দুর্গাপুর স্টেশনে নেমে আমার হাতে টাকা ভর্তি অ্যাটাচিটা দিয়ে ফিরে গেল। সে জানতেও পারল না ছোট কাকা কেন টাকাটা চেয়ে পাঠিয়েছিলেন। আমিও বাপিকে বলতে পারলাম না। পরে জেনেছিলাম ব্যবসার জন্যই টাকাটার প্রয়োজন হয়েছিল।

যতদিন বেঁচেছিলেন নিয়মিত যোগাযোগ রাখতাম। যখন প্রয়াত হলেন তখন আমিও দিল্লিতে ছিলাম। শেষ দিকে প্রাণখোলা এই মানুষটির চোখে মুখে দেখেছি অশান্তির ছাপ। মনে হয়, নিজেই হয়তো বুঝেছিলেন আর বেশিদিন আমাদের মধ্যে থাকতে পারবেন না। সত্যি বিশ্বাস করতেই পারছি না, প্রদ্যুতদা আমাদের মধ্যে নেই।

Copyright Ⓒ Prodyutdutta.com