(প্রাক্তন সহ-সচিব, আইএফএ)
অনেক বছর আগেকার কথা। সবটা সেভাবে মনে নেই। যাই হোক তিনি আই এফ এ-তে আগমনের আগের ঘটনা তুলে ধরছি। বিশুদাকে দেখেছি কীভাবে সচিব হয়েছেন। সেই সময় বিশুদার হয়ে ঘুরেছি ভোট আদায়ের জন্য। বিশুদা সচিব পদে আসার পর প্রত্যেক ক্লাবের সাথে যোগাযোগ রাখতেন। এরপর বিশুদা অশোক ঘোষকে আই এফ এ-তে সচিব পদে নিয়োগ করেন। পরবর্তীকালে অশোকদা আই এফ এ-র সভাপতি হয়েছিলেন এবং অশোক মিত্র যিনি নন্তু মিত্র নামে আমাদের কাছে পরিচিত ছিলেন, তিনি এবং বরুন পাল যুগ্ম -সচিব হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
এর পরবর্তী অধ্যায় প্রদ্যুত দত্তর আবির্ভাব। হঠাৎ একদিন আমার ক্লাবের (উত্তরপাড়া স্পোর্টিং) খেলার পর জর্জ টেলিগ্রাফ টেন্টের কাছ দিয়ে যখন যাচ্ছি পান্নালাল চ্যাটার্জি (পানুদা) বললেন, তোমাকে প্রদ্যুতবাবু ডাকছেন, একবার দেখা কর। আমি সেই সময় দেখা করলাম। উনি বললেন, আমি আই এফ এ-র ভোটে লড়ব, তোমার সাহায্য চাই। আমি বললাম বিশুদা ও অশোকদা বিরাট ক্ষমতাশালী, হারানো দূর অস্ত। যাইহোক উনি বললেন, আমাকে লড়তেই হবে। তখন আমি রঞ্জিতদা (গুপ্ত) ও পানুদাকে সঙ্গে নিয়ে ক্লাবে ক্লাবে ঘুরে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করি। প্রত্যেকেই আশ্বাস দিয়েছিল লড়াই করার জন্য।
এরপর আই এফ এ-র ভোট হল। প্রত্যেক ডিভিশনে আমাদের প্যানেল হারল। ভোটের পর প্রদ্যুতদা গাড়িতে আইএফএ-র কাছাকাছি ছিলেন। আমাকে বললেন কী হল। আমি বললাম, সব ডিভিশনে পরাজিত হয়েছি। শুনে বললেন, তাহলে আর পরের বছর লড়ছি না। তখন বলেছিলাম যে রবার্ট ব্রুশ ৯ বার পরাজিত হয়েছিলেন, দশম বার তিনিই সফল হয়েছিলেন। আমাদের হাল ছাড়লে হবে না। এই কথা শোনার পর তিনি মনে জোর পেয়ে বললেন, ঠিক আছে লড়ব। সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার পরের বছরই আমাদের যারা বিরোধী ছিল, সবাই তখন আমাদের দিকে চলে এল। ভোটে আমাদের প্যানেল জিতল এবং প্রদ্যুতদাকে গভর্নিং সদস্যরা ভোটের মাধ্যমে সচিব হিসাবে নিযুক্ত করলেন।
প্রদ্যুত দত্ত যেদিন আইএফএ-র সচিব পদে বসলেন সেদিন উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের সুস্পষ্ট আলোয় আমাদের পথ ছিল ভাস্বর। তারই মাঝে আপন বৈশিষ্ট্যে নিজেকে ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর ক্ষমতা সম্পর্কে আমাদের সুস্পষ্ট ধারণা ছিল না সেদিন। কিন্তু সময় যত এগিয়েছে তিনি নিজেকে কাজের মধ্যে দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি ছিলেন অবিসংবাদী নেতা, দক্ষ প্রশাসক, বিরাট ব্যক্তিত্ব, অ্যাসোসিয়েশনের বিচক্ষণ চিন্তাশীল দূরদর্শী পরামর্শদাতা।
তিনি ছিলেন গট আপের বিরোধী। তাঁর সময়ে গট আপ খেলা ভয়ঙ্কর ব্যাপার ছিল। প্রত্যেকেই জানেন রঞ্জিতদার দল ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং বনাম ইন্টার ন্যাশনাল গট আপ খেলার জন্য দু’বছর করে নির্বাসিত হয়েছিল। যদিও রঞ্জিতদা ছিলেন তাঁর পরম বন্ধু ও পরামর্শদাতা।
তিনি নার্সারি ডিভিশনের প্রবর্তন করেন। সেই সময়ে নার্সারি দলের থেকে দশ হাজার করে টাকা নেওয়া হয়েছিল খেলার জন্য। আমি এত টাকার ব্যাপারে প্রতিবাদ করেছিলাম। কিন্তু উনি তখন কর্ণপাত করেননি। পরে সেই টাকা দিয়ে প্রত্যেক দল আই.এফ. এ-র অন্তর্ভূক্ত হয়েছিল। তারপরে বলেছিলেন, তুমি বলেছিলে, কী হল সবাই তো টাকা দিল। সেই নার্সারি ডিভিশন এখনও চালু আছে।
শিলিগুড়িতে কাঞ্চনজঙ্ঘা স্টেডিয়ামের প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন তিনি, তাঁর আমলে স্টেডিয়ামের উদ্বোধন হয়। এছাড়া ইন্টার সাব-ডিভিশনাল (১৫ বছর) টুর্নামেন্ট প্রবর্তন করেন। এই টুর্নামেন্ট থেকে বাছাই করে সাবজুনিয়র দল (১৫ বছরের নিচে) দল তৈরি হয় এবং ধানবাদে বাংলা দল বিজয়ী হয়েছিল। যে দলে খেলেছিল অর্পণ দে, সঞ্জয় মাঝি, সুবীর ঘোষ, গৌতম দে এবং আরও অনেকে যারা পরবর্তীকালে বাংলা ও ভারতের মুখ উজ্জ্বল করেছে।
বিশুদার আমলে ১৪টি এ-ক্লাস ক্লাব বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় গর্ভনিং বডিতে স্থান পেত, সেটি উনি বিলুপ্ত করেছেন। আগে জেলার ক্ষেত্রে WB. Dist. Federation থেকে ১২ জন প্রতিনিধিত্ব করতেন এখন সব জেলা থেকে গভর্নিং বডিতে আসতে পারে রোটেশন অনুযায়ী। উনিই জেলার দলগুলিতে মর্যাদায় বসিয়েছেন।
তিনি ভাল কবিতা লিখতে পারতেন, তাঁর হাস্যরস কোনও দিনই ভোলার নয়। সুবক্তা হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। AIFF- এর সভায় উপস্থিত থাকলে তাঁর সুবক্তব্যে প্রত্যেককে মোহিত করে দিতেন। তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত যুক্তিজাল বার বার পরাস্ত করেছে AIFF- এর কর্তৃপক্ষকে।
তাঁর নীতি আদর্শ ও আই.এফ.এ-র প্রতি একনিষ্ঠ আন্তরিকতা আমার কাছে উদাহরণ স্বরূপ হয়ে থাকবে। আমোদপ্রিয়, উদার ও নম্র এক দৃষ্টিভঙ্গি যা সহজেই মানুষকে তাঁর দিকে আকর্ষণ করতে পারত।
১০ বছর ধরে IFA সংক্রান্ত কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখার জন্য প্রদ্যুতদার কাছ থেকে প্রত্যক্ষভাবে বা পরোক্ষভাবে অনেক কিছু শিখেছি। সেজন্য তাঁর কাছে আমি কৃতজ্ঞ।