প্রদ্যুত দত্ত-র মতো দাপুটে প্রশাসক আর আসবে না

রাতুল ঘোষ

(বিশিষ্ট ক্রীড়া সাংবাদিক)

১৯৮৫ সালের মে মাসের ঘটনা মনে পড়ছে। সেবার আমরা বেঙ্গালুরুতে প্রায় এক মাস প্রলম্বিত ফেডারেশন কাপ কভার করতে গিয়েছিলাম। সেখানেই অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশনের ওয়ার্কিং কমিটির মিটিং ছিল। সেই মিটিংয়ের দু’দিন আগে ফেডারেশনের কর্মকর্তারা যে পাঁচতারা হোটেলে ছিলেন তা হয়ে উঠেছিল সাংবাদিকদের কাছে খবর পাঠানোর জন্য আবশ্যিক গন্তব্যস্থল। একদিন রাতে আইএফএ সচিব পদে সদ্য নির্বাচিত প্রদ্যুত-দার সঙ্গে দেখা করার জন্য তাঁর হোটেল রুমের বাইরে কলিং বেলে আঙুল ছোঁয়ালাম। প্রদ্যুতদা নিজেই উঠে এসে দরজা খুলে দিয়ে আমাদের আহ্বান করলেন।

বলা প্রয়োজন যে, এই মিটিংয়ের এক মাস আগে ধুন্ধুমার নির্বাচন করে আইএফএ সচিব পদে প্রথমবার আসীন হয়েছিলেন। তাঁকে লড়তে হয়েছিল ভূতপূর্ব সচিব অশোক (নন্তু) মিত্রের অনুগামীদের বিরুদ্ধে। তবে মেজদা দত্তকুলোদ্ভব বিশ্বনাথ বাবুর আশীর্বাদ তাঁর অনুজের মাথার উপর থাকায় স্বচ্ছন্দে সচিব পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন। প্রদ্যুতদা নিজেও এই ভোটে লড়ার জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। ময়দানে হার্মাদ কর্মকর্তাদের তিনি হাতের মুঠোয় এনে ফেলতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাই সেবার ভোটে জিততে তাঁর কোনও অসুবিধা হয়নি।

সেই ভোটের দিন ময়দানের একটি তাঁবুতে বোমা বিস্ফোরণ হয়েছিল। প্রদ্যুতদার এক ঘনিষ্ঠ অনুগামী সেই বিস্ফোরণে মারা গিয়েছিলেন। সচিব হওয়ার পর বেঙ্গালুরুতে প্রথম সাক্ষাৎকারেই প্রদ্যুতদাকে এই প্রসঙ্গে প্রশ্ন করেছিলাম। যথেষ্ট অপ্রিয় প্রশ্ন ছিল সেটি। কিন্তু দাপুটে কর্মকর্তাটি সোজাসাপটা জবাব দিয়েছিলেন, ‘বাংলার রূপকার ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়কেও বৌবাজার থেকে ভোটে জিততে জগা-ভানুর সাহায্য নিতে হত। আমিও সব রকমের প্রস্তুতি নিয়ে ভোটে নেমেছিলাম। তবে ওটা ছিল দুর্ঘটনা যা আগাম অনুমান করা যায় না। খুবই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। আমি ওই ছেলেটির পরিবারের যাবতীয় দায়িত্ব গ্রহণ করেছি।’

সেই ভোটের দিন ময়দানের একটি তাঁবুতে বোমা বিস্ফোরণ হয়েছিল। প্রদ্যুতদার এক ঘনিষ্ঠ অনুগামী সেই বিস্ফোরণে মারা গিয়েছিলেন। সচিব হওয়ার পর বেঙ্গালুরুতে প্রথম সাক্ষাৎকারেই প্রদ্যুতদাকে এই প্রসঙ্গে প্রশ্ন করেছিলাম। যথেষ্ট অপ্রিয় প্রশ্ন ছিল সেটি। কিন্তু দাপুটে কর্মকর্তাটি সোজাসাপটা জবাব দিয়েছিলেন, ‘বাংলার রূপকার ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়কেও বৌবাজার থেকে ভোটে জিততে জগা-ভানুর সাহায্য নিতে হত। আমিও সব রকমের প্রস্তুতি নিয়ে ভোটে নেমেছিলাম। তবে ওটা ছিল দুর্ঘটনা যা আগাম অনুমান করা যায় না। খুবই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। আমি ওই ছেলেটির পরিবারের যাবতীয় দায়িত্ব গ্রহণ করেছি।’

১৯৮৫ সালে আইএফএ শিল্ডে সচিবের দায়িত্বে আসার পর একসঙ্গে তিনটি বিদেশি ক্লাবকে এনেছিলেন। তার মধ্যে ছিল কোপা লিবের্তোদোরেসের পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ের পেনারল ও চ্যাম্পিয়নস্ লিগে খেলা ইউক্রেনের শাখতার ডোনেসক। ১৯৭৩ সালের পর শিল্ডে এমন কোয়ালিটি বিদেশি দল মাঝে আর খেলেনি।

ভারতীয় ফুটবলে পেশাদার লিগ চালুর কথা প্রথম ভেবেছিলেন প্রদ্যুত দত্ত। যা ভারতীয় দলের প্রাক্তন কোচ চিরিচ মিলোভান মুক্তকণ্ঠে সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু তার দশ বছর বাদে এদেশে চালু হয়েছিল জাতীয় লিগ। পেশাদার ফুটবল সম্পর্কে অত্যন্ত স্বচ্ছ ধারণা ছিল প্রদ্যুতদার। তিনি বলতেন, ‘মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গলের ফ্যান বেস যেরকম বিশাল তা ইউরোপেরও খুব কম ক্লাবের রয়েছে। কিন্তু দুই প্রধানের কর্মকর্তারা সেটা কখনও কাজে লাগাতে পারেননি। এই ক্লাবগুলি যদি পাবলিক লিমিটেডে পরিণত হয়ে স্টক মার্কেটে শেয়ার ছাড়ে তাহলে সমর্থকদের ইনভল্ভমেন্ট অনেক বেড়ে যাবে। কিন্তু এই লাইনে ভারতীয় ফুটবলে কোনও কর্মকর্তা ভাবেননি। যে কোনও পেশাদার ক্লাবের ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট সিস্টেম, নিজস্ব প্র্যাকটিস গ্রাউন্ড এবং মাঠ থাকা আবশ্যিক। এখানেই মার খাবে মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গল। কারণ, এরা গড়ের মাঠে কাঠের পাটাতনে আবৃত একফালি খেলার জায়গা পেয়েছে। যার মালিক ফোর্ট উইলিয়াম। অথচ ইউরোপে যে কোনও মাঝারি মানের ক্লাবেরও নিজস্ব স্টেডিয়াম ও কোম্পানি রয়েছে।

প্রদ্যুতদা আইএফএ সচিব না হলে শিলিগুড়ি কখনও পেত না কাঞ্চণজঙ্ঘা স্টেডিয়াম। তৎকালীন ফেডারেশন সভাপতি প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক আদৌ মধুর ছিল না। কিন্তু সেই সময়ের দাপুটে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সন্তোষমোহন দেবকে রাজি করিয়ে তিনি রেলের কিছুটা জমি পেয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা স্টেডিয়ামের রূপরেখা তৈরি করেন। এরপর সুতারকিন স্ট্রিটের আইএফএ অফিস বন্ধক দিয়ে ১৯৮৮ সালে শিলিগুড়ির কাঞ্চনজঙ্ঘা স্টেডিয়ামে নেহরু কাপের সফল আয়োজন করেছিলেন। পরের বছর প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সি ও অশোক ঘোষকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ফেডারেশনে প্রেসিডেন্ট ও সচিব পদে দাঁড়িয়েছিলেন যথাক্রমে সন্তোষমোহন দেব ও প্রদ্যুত দত্ত। এই নির্বাচনের আয়োজন করতে প্রায় লক্ষ টাকা খরচ হয়েছিল তাঁর। তিনি পরাস্ত হন সেবার। ১৯৯৪ সালের ১৬ নভেম্বরে তাঁর অকাল প্রয়াণ ঘটে। তাঁর অভাব বঙ্গীয় ফুটবলে আজও পূরণ হয়নি।

Copyright Ⓒ Prodyutdutta.com