অনেকের থেকেই ব্যতিক্রম

পূর্ণেন্দু বসু

(রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব)

বাঙালির দুটো উৎসব। এক, শারদোৎসব, দুই, ফুটবল। একজন বাঙালি হিসাবে আমিও তার ব্যতিক্রম নই। ছোটবেলা থেকেই ফুটবল আমাকে আকৃষ্ট করেছে। তাই রাজনীতি জগতের ব্যস্ততা, বিধায়ক এবং মন্ত্রী হিসাবে ব্যস্ত থাকলেও ফুটবল এখনও আমাকে টানে। শত ব্যস্ততা থাকলেও কোনও ফুটবল মাঠের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হলে আমি হাজির থাকতে চেষ্টা করি।

এই টানটা অবশ্য একেবারে ছোটবেলা থেকেই। যখন একটু বড় হলাম তখন থেকেই গড়ের মাঠ আমাকে টেনেছে। গোটা ময়দান জুড়ে শুধুই খেলার মাঠ, বিভিন্ন ক্লাবের তাঁবু। এই গড়ের মাঠ হল আমাদের প্রাণের স্পন্দন। সুযোগ পেলেই খেলা দেখতে ছুটে যেতাম। আমি ব্যক্তিগতভাবে মোহনবাগান ক্লাবের সমর্থক। তাই মোহনবাগানের খেলা দেখতে প্রায়ই হাজির হতাম ময়দানে। সেইসময় তিন বড় ক্লাবের পাশাপাশি দুই রেল দল, ইষ্টার্ন রেল এবং বি.এন.আর বিশেষ শক্তিশালী ছিল।

পাশাপাশি এরিয়ান, রাজস্থান, খিদিরপুর এবং জর্জ টেলিগ্রাফ অনেক সময়ই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিত তিন বড় ক্লাবের দিকে। অনেক সময়ই মাঝারি মানের এই দলগুলো বড় দলের পয়েন্ট কেড়ে নিয়েছে। লিগের ভাগ্য নির্ধারণ করেছে। তাই এই দলগুলোকে বলা হত ‘জায়ান্ট কিলার।’

জর্জ টেলিগ্রাফের ফুটবল দলও এরকম বিভিন্ন সময়ে বড় দলের মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়েছে, লিগের রং বদলে দিয়েছে। পাঁচের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে প্রায় এক দশক জর্জ টেলিগ্রাফ স্পোর্টস ক্লাব ছিল বড় তিন দলের কাছে আতঙ্ক। তবে পরবর্তীতে প্রায় দশ বছর জর্জ দল সেভাবে নজর কাড়তে পারেনি। জর্জ টেলিগ্রাফ আবার ঘুরে দাঁড়াল সাতের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে। আর এ ব্যাপারে মুখ্য ভূমিকা ছিল তৎকালীন সচিব প্রদ্যুত কুমার দত্তর। জর্জ টেলিগ্রাফ আবার স্বমহিমায় ফিরে এল প্রদ্যুত দত্ত-র হাত ধরেই। তাঁর দাদা কিংবদন্তি ক্রীড়া সংগঠক বিশ্বনাথ দত্ত-র যোগ্য উত্তরসূরি ছিলেন তিনি।

এমনিতে বাংলায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসাবে স্বাধীনতার অনেক আগে থেকেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে জর্জ টেলিগ্রাফ ট্রেনিং ইনস্টিটিউট। লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধূলাতে বিশেষ আগ্রহী ছিলেন প্রদ্যুত দত্তদের পিতা শ্রদ্ধেয় হরিপদ দত্ত। সেই ধারা আজও বজায় রেখে চলেছেন তাঁর উত্তরসূরিরা।

পরবর্তীতে ১৯৮৫ সালে তিনি বাংলার ফুটবলের নিয়ামক সংস্থা আইএফএ-র সচিব নির্বাচিত হয়েছিলেন। এ ব্যাপারে চেয়ারে বসে তাঁর দায়িত্ব পালন করে থেমে থাকেননি। আইএফএ-র সচিব হিসাবে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছেন।

তাঁদের আদিবাড়ি যেহেতু ওপার বাংলায় তাই অনেকেরই ধারণা ছিল প্রদ্যুত বাবুরাও ইস্টবেঙ্গল সমর্থক। সে তাঁদের হৃদয়ে ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের প্রতি বিশেষ দুর্বলতা ছিল কিনা জানি না, তবে একটা ব্যাপারে বিশ্বনাথ দত্ত এবং প্রদ্যুত দত্ত একাধিকবার প্রমাণ করেছেন যে খেলার মাঠে তাঁদের কাছে জর্জ টেলিগ্রাফই হল মুখ্য। সেখানে বড় দলের বিপক্ষে খেলার সময় তাঁদের কোনও দুর্বলতা থাকত না। আর প্রশাসক হিসাবে তাঁরা সব সময়ই নিরপেক্ষতা বজায় রেখেছেন। যেমন আই এফ এ-র সচিব হিসাবে প্রদ্যুত দত্ত যদি নিরপেক্ষতা বজায় না রাখতেন তাহলে ১৯৮৬ সালে মোহনবাগান লিগ চ্যাম্পিয়ন হতে পারত না। আবার সে বছরই মহামেডান ক্লাবকে সাসপেন্ড করে আই এফ এ সচিব হিসাবে দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছেন। আসলে আই এফ এ সচিবের চেয়ারটাকে তিনি বরাবরই মর্যাদা দিয়ে এসেছেন।

ব্যক্তিগতভাবে তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল না। তবু দূর থেকে প্রদ্যুতবাবুকে যতটা দেখেছি, বিভিন্ন সংবাদপত্রে ক্রীড়া সংগঠক হিসাবে যতটুকু জেনেছি তাতে এই মানুষটির ওপর আলাদা একটা শ্রদ্ধা থেকে গেছে। সেই হিসাবে তাঁকে একজন প্রবল ব্যক্তিত্ববান বলে মনে হয়েছে। এ ব্যাপারে তিনি অনেকের থেকেই ব্যতিক্রম বলতে আমার দ্বিধা নেই।

Copyright Ⓒ Prodyutdutta.com