নেপথ্যের নায়ক

পরিতোষ ভৌমিক

(প্রাক্তন সচিব, শিলিগুড়ি মহকুমা ক্রীড়া পরিষদ)

আমার বাড়ি শিলিগুড়িতে। জন্মলগ্ন থেকেই আমরা এই শহরের বাসিন্দা। এই শহরের অতীত আমাদের চোখের সামনে এখনো ভাসে। সেই শিলিগুড়ির চেহারা এখন আমূল বদলে গেছে। আমি বলছি ৩৫ বছর আগের শিলিগুড়ির কথা। সেদিনের শিলিগুড়ির সঙ্গে আজকের এই শহরের কোনও মিল নেই। শিলিগুড়ি স্টেশনের রেলগেট থেকে হিলকার্ট রোড বিশাল রাস্তা। স্টেডিয়াম, বাস টার্মিনাল সব কিছুই এখন ভারতের যে কোনও শহরের সঙ্গে তুলনীয়।

একথা অস্বীকার করার উপায় নেই তাহল, শহরের আমূল পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তৎকালীন সরকারের একটা বড় ভূমিকা ছিল। শহরের ইতিহাস সে কথাই বলবে। তাই বলে কি নেপথ্যের নায়কটির নাম ভোলা যাবে? এবারে সেই মানুষটির কথা বলছি।

তিনি আইএফএ-র তৎকালীন সচিব প্রদ্যুত কুমার দত্ত। আমাদের সবার পরমশ্রদ্ধেয় দাদা।

আমি তখন জেলা ক্রীড়া সংস্থার সচিব। তাই প্রথম যখন শুনতে পেলাম যে, শিলিগুড়িতে জওহরলাল নেহরু আন্তর্জাতিক ফুটবল প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে তখন একটু অবাকই হয়েছিলাম, তার আগে এই শহরের তিলক ময়দানে আইএফএ শিল্ডের খেলা মাঝেমধ্যে হয়েছে। ঐ পর্যন্তই। সেখানে একলাফে আন্তর্জাতিক আসর! কী করে সম্ভব হবে? সেরকম পরিকাঠামো এখানে ছিল না। প্রতিযোগী দলগুলোর প্র্যাকটিসের জন্যই তো দরকার ৮/১০টি মাঠ। আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম।

বিমানবন্দর। এতসব প্রতিকুলতা সত্বেও তিনি ঝুঁকি নিয়ে প্রতিযোগিতা আয়োজনের জন্য উত্তরবঙ্গের প্রাণকেন্দ্র শিলিগুড়ি শহরকে বেছে নিয়েছিলেন।

হ্যাঁ, স্থান নির্বাচন ঘোষণা করেই তিনি বসে থাকেননি। প্রতিযোগিতা শুরুর অনেক আগে থেকেই সবদিক তৈরি করার ব্যাপারে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। খেলার মাঠ থেকে রেলওয়ে স্টেশন, বিমানবন্দরের সর্বত্র চষে বেরিয়েছেন। পাশাপাশি শহরের দুই বিলাসবহুল হোটেল সিনক্লিয়ার এবং মৈনাক হোটেলে - সুইমিং পুল তৈরি হয়েছিল প্রদ্যুতদার বিশেষ উদ্যোগে। বিদেশি দলগুলো যেখানে খেলতে আসবে সেখানে আন্তর্জাতিক মানের সুইমিং পুল অত্যন্ত জরুরি। এই গুরুত্বপূর্ণ দিকটাও তিনি মাথায় রেখেছেন। প্রতিযোগিতার আয়োজন যাতে সবদিক থেকে সফল হয় এজন্য এক বছরেরও বেশি সময় তিনি উদয়াস্ত পরিশ্রম করেছেন। তার সুফলও পেয়েছেন। শিলিগুড়িতে নেহরু কাপ আয়োজনের জন্য যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, তাকে বাস্তবায়িত করতে পেরেছিলেন। খেলা উপলক্ষে প্রথম যেদিন শিলিগুড়িতে পা রাখলেন, সেদিন তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে বাগডোগরা বিমান বন্দরের শহরের অনেক গণ্যমান্য প্রভাবশালী ব্যক্তি হাজির ছিলেন। কিন্তু দেখলাম তিনি সোজা এগিয়ে আসছেন আমার দিকে। তারপর আমার ফিয়াট গাড়িতে উঠে বসলেন। সেই সময় থেকেই তাঁর সঙ্গে আমার অন্তরঙ্গতা শুরু হল। সেটা বজায় ছিল তাঁর মৃত্যুর আগে পর্যন্ত।

অনেক রকম প্রতিকুলতা, বাধা বিপত্তি কাটিয়ে নেহরু কাপের খেলা শুরু হল। মাঠে ঢোকার সময় প্রতিদিনই আমাকে বলতেন তাঁর দিকে নজর রাখতে। আর হাফ টাইমের পর চোখের ইশারায় আমাকে জানাতেন যে এবারে তিনি উঠবেন। দু-জনই তখন বেরিয়ে আসতাম। গাড়িতে বসার পর যখন কোথায় যাবেন জানতে চাইতাম, প্রতিদিনই একটা কথাই বলতেন, যেদিকে তোমার মন চাইবে সেদিকেই চলো। সেই সময় ৭০/৮০ কিলোমিটার গতিতে গাড়ি চালাতাম। গাড়িতে বসেই নাক ডেকে ঘুম লাগাতেন। আসলে দিবা-রাত্র এই প্রতিযোগিতাকে সফল করার জন্য টেনশনে মানসিক দিক থেকে ভীষণ ক্লান্ত থাকতেন। গাড়িতে ওঠার পর কোনও চাপ থাকত না বলে আর বসে থাকতে পারতেন না। ঘুম ভাঙার পর যখন শুনতেন ৮০/১০০ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে এসেছি তখন গাড়ি ঘোরাতে বলতেন। ঘুম ভাঙতেই বলতেন পাঁচ বছর আয়ু বেড়ে গেল। বলেছিলেন, এই বিশ্রামটুকু সবসময়ই দরকার। তাতে শরীর চনমনে থাকে।

এরকমই একদিন মাঠ থেকে বেরিয়ে পড়েছি। সেদিন আমাদের সঙ্গে ছিলেন তাঁর ভগ্নিপতি বিজিত গুহ। একটা পেট্রল পাম্পে তেল ভরার জন্য গাড়ি থেকে নেমেছি। গাড়ি থেকে নেমে বিজিতদার কাছে ১০টা ‘গোল্ডেন কার্ড’ চাইলেন। যখন বুঝলাম কার্ডগুলো আমার জন্য চেয়েছেন। বলেছিলাম, আমার কোনও কার্ড লাগবে না। তখন ধমকের সুরে তাঁর যুক্তি ছিল, ‘তুমি সারাক্ষণ আমার সঙ্গে থাকছ, অথচ তোমার কাছে কার্ড থাকবে না! বন্ধু-বান্ধবরা শুনলে কী ভাববে?’ এরকমই মাঝেমধ্যে স্নেহমিশ্রিত ধমক দিতেন।

প্রতিদিনই খেলার পরে সহকর্মীদের সঙ্গে থাকতেন ফুরফুরে মেজাজে। তখন একসঙ্গে খাওয়া দাওয়া হত। খাবারের টেবিলে হাসি, ঠাট্টা, মজা সবকিছুই চলত।

কলকাতায় গেলে সদানন্দ রোডের পাশে ৪বি, অপূর্ব মিত্র রোডের বাড়িতে যেতে ভুল হত না। সেখানেও রসালো সব খাবার থাকত। ওঠার সময়ই বলতেন, ‘টিফিন করে যাও।’ এভাবে আরও কিছু সময় আটকে রাখতেন। প্রায় প্রতিদিনই অনেক খ্যাতনামা ফুটবলার আসতেন। সবাইকে পাশে বসিয়ে চলত চুটিয়ে আড্ডা। সেই আড্ডার আসর ছেড়ে ওঠা যেত না।

প্রায় ২৯ বছর হয়ে গেল। সেই জমকালো আড্ডাটা ভুলতে পারিনি।

Copyright Ⓒ Prodyutdutta.com