মুশকিল আসান

সুব্রত পাল

(শ্যালিকা পুত্র)

সেদিন বিকেলে ছিল কলকাতা লিগে ইস্টবেঙ্গল-জর্জ টেলিগ্রাফের ম্যাচ। তখন শিয়ালদহর সার্পেন্টাইন লেনের বাড়িতে বাস ছিল দত্ত পরিবারের। একান্নবর্তী পরিবার। সেই দিনের বিকেলে বাড়িতে গাড়ি ছিল না। ম্যাচের সময় এগিয়ে আসছে। গাড়ির জন্য অপেক্ষা না করে রাস্তায় বেরিয়ে পড়লেন দত্ত পরিবারের সব থেকে ডাকাবুকো, সাহসী কলেজ পড়ুয়া যুবক। তাড়াহুড়ো করে ধর্মতলাগামী ভিড় ট্রামে উঠে পড়লেন। প্রাচী সিনেমা হাউসের কাছে ট্রাম থেকে পড়ে গেলেন দত্ত পরিবারের ছোট ছেলে দুলু। এমন ভাবে পড়েছিলেন যে ট্রামের চাকা তাঁর পায়ের উপর দিয়ে চলে গিয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নিয়ে গেলে প্রাণে বেঁচে গেলেও তাঁর বাঁ পাটা বাঁচানো যায়নি। অস্ত্রোপচার করে হাঁটুর নিচের অংশটা বাদ দিতে হয়েছিল। দত্ত পরিবারের সদস্যরা ভেবেছিলেন দুলুর কেরিয়ারটাই শেষ হয়ে গেল। কিন্তু তিনি সবাইকে ভুল প্রমাণ করেছিলেন। মনের জোর, ইচ্ছে, লক্ষ্য এবং ধৈর্য থাকলে কোনও কিছুই যে অসম্ভব নয়, তা তিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন।

একটা কৃত্রিম পা নিয়ে পড়াশোনা শেষ করলেন, পারিবারিক ব্যবসায় ঢুকলেন। তারও পরে ঢুকে পড়লেন পারিবারিক ক্লাব ফুটবলের প্রশাসনে। তারও পরে বাংলার ফুটবলে আনলেন নবজাগরণ। বাংলার ফুটবল যতদিন থাকবে প্রদ্যুত দত্তর নামটা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

ময়দান, জর্জ টেলিগ্রাফ স্পোর্টস ক্লাব ও আই এফ এ পড়াশোনা শেষ করে প্রদ্যুত দত্ত যোগ দিয়েছিলেন পারিবারিক ব্যবসা জর্জ টেলিগ্রাফ ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে। একই সঙ্গে ময়দান করাও শুরু করে দিয়েছেন। আসলে দত্ত পরিবারের সদস্যদের রক্তে জর্জ টেলিগ্রাফ। এই সংস্থার সঙ্গে গোটা দত্ত পরিবারেরই নাড়ির সম্পর্ক। শিয়ালদহর সার্পেন্টাইন লেন ছেড়ে ততদিনে ভবানীপুরের ইন্দিরা সিনেমা হাউসের পাশে দত্ত পরিবারের বাড়ি। প্রদ্যুত দত্ত সকালে শিয়ালদহর জর্জ অফিসে চলে যেতেন। সারাদিন কাজ করার পর বিকেলে পৌঁছে যেতেন ময়দানে জর্জ টেলিগ্রাফ ক্লাব তাঁবুতে। কিছু ক্লাব কর্তা আসতেন, ফুটবল নিয়েই আলোচনা। চুটিয়ে ক্লাব করছেন। মাঠে তখন সর্বক্ষণের সঙ্গী ছিলেন শতদল গুপ্ত (বাচ্চু), হারাধন চ্যাটার্জি, পুটেদা, বীরজিৎরা। বাড়ি ফিরতেন রাতে। এই ছিল তাঁর রুটিন।

দলবদলের সময় এলে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের হিন্দুস্থান বিল্ডিংয়ের পাশে মোহন বলে এক ভদ্রলোক ছিলেন। তিনি কলকাতার নামকরা সব সংগঠনকে গাড়ি ভাড়া দিতেন। ঠিক দলবদলের আগে প্রদ্যুত দত্ত সেই মোহনের কাছে চলে গিয়ে তিন থেকে চারটি গাড়ি ভাড়া করতেন। ফুটবলার তুলে আনার জন্য দায়িত্ব ভাগ করে দিতেন। তিনি নিজে দুই ২৪ পরগনা ও হাওড়ার বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে ফুটবলার খুঁজে নিয়ে এসে জর্জে সই করাতেন। বিশ্বাস করতেন, জেলা থেকে ফুটবলার তুলে না আনলে কলকাতা তথা বাংলার ফুটবল বাঁচবে না।

সাতের দশকের শেষের দিক। অশোক ঘোষ তখন আইএফএ সচিব। কিন্তু যতদিন যাচ্ছে ময়দানের বিভিন্ন ক্লাবে ততই যেন আই এফ এ-র বিরুদ্ধে নানান অভিযোগ উঠতে শুরু করল। ওই সময়ে বাংলার ক্রিকেটকে কেন্দ্র করে যেমন স্পোর্টিং ইউনিয়ন ও কালীঘাট ক্লাবে ময়দানের বিভিন্ন ক্লাব কর্তাদের ‘ঠেক’ বসত, তেমনি বাংলার ফুটবল নিয়ে ক্লাব কর্তাদের আড্ডা বসত জর্জ টেলিগ্রাফ ক্লাবে। প্রসঙ্গত, সেই ধারা অব্যাহত রেখেছেন তাঁরই জ্যেষ্ঠ পুত্র অনির্বাণ দত্ত। যাইহোক, সেই সময়ে একাধিক কর্তা তাঁর কাছে আইএফএ নিয়ে বিস্তর অভিযোগ করতেন। ঠিক করলেন, আর বসে থাকলে চলবে না।

একদিন, পান্নালাল চ্যাটার্জিকে ডেকে বললেন, ‘‘আইএফএ-র অ্যানুয়াল রিপোর্ট বুকটা নিয়ে আমার বাড়িতে আসুন।’’ ওই সময়টা তিনি থাকতেন লেক রোডের কমলা গার্লস কলেজের কাছেই। পান্নালাল চ্যাটার্জি একদিন আইএফএ-র অ্যানুয়াল বুকটা নিয়ে তাঁর বাড়িতে গেলেন। সঙ্গে নিয়ে গেলেন রঞ্জিত গুপ্ত বলে এক ভদ্রলোককে। রঞ্জিতবাবু পোর্ট ট্রাস্টে উঁচু পদে চাকরি করতেন। ফুটবলটা ভালবাসতেন। আর নিয়ম-কানুনটাও অনেকের থেকেই ভাল বুঝতেন। তাঁকে প্রয়োজন হতে পারে বলেই সেদিন তাঁকে নিয়ে গিয়েছিলেন পান্নালালবাবু। সেদিন, পান্নালাল ও রঞ্জিত গুপ্তর কাছে ময়দানের ভোটের অঙ্কটা বুঝতে চাইলেন। সব শুনে এবার তৈরি হতে হবে।

একদিন, পান্নালাল চ্যাটার্জিকে ডেকে বললেন, ‘‘আইএফএ-র অ্যানুয়াল রিপোর্ট বুকটা নিয়ে আমার বাড়িতে আসুন।’’ ওই সময়টা তিনি থাকতেন লেক রোডের কমলা গার্লস কলেজের কাছেই। পান্নালাল চ্যাটার্জি একদিন আইএফএ-র অ্যানুয়াল বুকটা নিয়ে তাঁর বাড়িতে গেলেন। সঙ্গে নিয়ে গেলেন রঞ্জিত গুপ্ত বলে এক ভদ্রলোককে। রঞ্জিতবাবু পোর্ট ট্রাস্টে উঁচু পদে চাকরি করতেন। ফুটবলটা ভালবাসতেন। আর নিয়ম-কানুনটাও অনেকের থেকেই ভাল বুঝতেন। তাঁকে প্রয়োজন হতে পারে বলেই সেদিন তাঁকে নিয়ে গিয়েছিলেন পান্নালালবাবু। সেদিন, পান্নালাল ও রঞ্জিত গুপ্তর কাছে ময়দানের ভোটের অঙ্কটা বুঝতে চাইলেন। সব শুনে এবার তৈরি হতে হবে।

এ যেন সেই স্কটল্যান্ডের রাজা রবার্ট ব্রুস ও মাকড়সার জাল বোনার সাফল্যর ঘটনা। বানুকবার্নের যুদ্ধে একাধিকবাল মুখোমুখি হয়েছিল ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় এডুয়ার্ড ও স্কটল্যান্ডের রাজা রবার্ট ব্রুস। কিন্তু বারবার হেরে যাচ্ছিলেন রবার্ট ব্রুস। একবার সব কিছু হারিয়ে একটি গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন পরাজিত রাজা ব্রুস। গুহায় বসে একদিন দেখলেন, একটি মাকড়সা বাতাসের মুখে জাল বুনতে গিয়ে ব্যর্থ হচ্ছিল। কিন্তু মাকড়সাটি হল ছাড়েনি। জাল বোনার চেষ্টা করেই যাচ্ছিল। একটা সময় জাল বুনতে সক্ষম হাল। এই ঘটনা দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে সংগঠিত হয়ে ফের যুদ্ধে নামলেন। সেই যুদ্ধে নেমে জয় ছিনিয়ে নিয়েছিলেন রবার্ট ব্রুস। তিনিও কি এই ঘটনা থেকেই ময়দানেই ‘যুদ্ধে’ বারবার লড়াই করতে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন? জানা যায়নি। কিন্তু তৃতীয়বার ‘যুদ্ধে’ নামার আগে যেন আরও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন।

সালটা ছিল ১৯৮৫। আই এফ এ-এর নির্বাচন। এবার পুরোপুরি তৈরি। কোনও কিছুই হাল্কা ভাবে নিচ্ছিলেন না। প্রয়োজনে দাদা বিশ্বনাথ দত্তের গোষ্ঠীর একটি নিশ্চিত ভোটারকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে এসেছিলেন। ঘটনাটি হল, গ্রিয়ার ক্লাবের অন্যতম কর্তা হারাধনদা ডেডিকেট টু বিশ্বনাথ দত্ত। ওই ভোটটা কিছুতেই পাবেন না, তাহলে উপায়? ওই ভোটটাকে অফ করে দিতে হবে। কিন্তু কীভাবে?

সালটা ছিল ১৯৮৫। আই এফ এ-এর নির্বাচন। এবার পুরোপুরি তৈরি। কোনও কিছুই হাল্কা ভাবে নিচ্ছিলেন না। প্রয়োজনে দাদা বিশ্বনাথ দত্তের গোষ্ঠীর একটি নিশ্চিত ভোটারকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে এসেছিলেন। ঘটনাটি হল, গ্রিয়ার ক্লাবের অন্যতম কর্তা হারাধনদা ডেডিকেট টু বিশ্বনাথ দত্ত। ওই ভোটটা কিছুতেই পাবেন না, তাহলে উপায়? ওই ভোটটাকে অফ করে দিতে হবে। কিন্তু কীভাবে?

সচিব হয়েই দাদাকে প্রণাম সচিবের চেয়ারে যেদিন বসবেন সেই দিন সকাল থেকেই জর্জ টেলিগ্রাফ ক্লাব তাঁবুতে যেন বিয়েবাড়ির আমেজ। উৎসবের আবহাওয়া। জোর খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা। আলোর রোশনায় আলোকিত করার প্রস্তুতিও শুরু করে দিয়েছিলেন প্রদ্যুত দত্ত গোষ্ঠীর লোকেরা। সেদিন আইএফ এ অফিস যাওয়ার আগে তিনি এসব উৎসব করতে নিষেধ করে গিয়েছিলেন। কিন্তু কে শোনে কার কথা। সেদিন জর্জ ক্লাব তাঁবুতে হঠাৎ বিকট শব্দ। সব কিছু লন্ডভন্ড। তাঁবুতে পড়ে আছে দু-দুটি লাশ। মুহূর্তের মধ্যে গোটা ময়দানে ছড়িয়ে পড়ল খবরটি। খবর পেয়ে ছুটে আসেন। জানা যায়, আতশবাজি তৈরি করতেই এই বিস্ফোরণ। সব কিছু সামলে নিয়ে সেই রাতেই ছুটলেন নিজের দাদা বিশ্বনাথ দত্তর কাছে।

প্রদ্যুত দত্ত - ‘দাদা, ক্লাবের দুর্ঘটনার কথা শুনেছ তো?’
বিশ্বনাথ দত্ত - ‘হ্যাঁ, শুনেছি। তোমার মতো করে বিষয়টা দেখে নাও।’
প্রদ্যুত দত্ত - (প্রণাম করে বললেন) - ‘আজ সচিবের দায়িত্ব নিলাম। আশীর্বাদ করো।’
বিশ্বনাথ দত্ত - গড ব্লেস ইউ।
আই এফএ ও প্রদ্যুত দত্ত (১৯৮৫-১৯৯৪)

আইএফএ সচিবের চেয়ারে বসে ফুটবলে আমূল পরিবর্তন আনলেন। দাদা বিশ্বনাথ দত্ত যদি আইএফ এ-র ভিত শক্ত করে থাকেন, তাহলে সমাজে এই সংস্থাকে একটা উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন প্রদ্যুত দত্ত। বাংলার ফুটবলে ঘটালেন নবজাগরণ। তাঁর কাজের উল্লেখযোগ্য দিক হল এই রকম -

(১)

বাংলার ফুটবলে তিনিই প্রথম স্পনসর (চার্মস, ফিলিপস ও লাইফবয়) এনেছিলেন। মমতা ব্যানার্জির সাহায্যে আইএফ এ-তে প্রথম চামর্স কোম্পানিকে এনেছিলেন। এজন্যও তাঁকে সমালোচিতও হতে হয়েছিল। চামর্স কোম্পানিকে স্পনসর করে আনার পরের দিন বাংলার জনপ্রিয় কাগজে সেই রিপোর্টার লিখেছিলেন, ‘আইএফ এ-কে বিক্রি করে দিলেন প্রদ্যুত দত্ত।’ কিন্তু সময়ের থেকে একটু এগিয়েই ভাবতেন তিনি। আজ প্রমাণিত, স্পনসর ছাড়া কোনও কিছুই করা সম্ভব নয়। যা তিনি গত ৩৫ বছর আগে বুঝেছিলেন।

(২)

সুষ্ঠুভাবে ভাল ফুটবলার তুলে আনতে গেলে একটা ফুটবল অ্যাকাডেমির প্রয়োজন। সেটা বুঝেছিলেন তিনি। বাংলার রাজ্য ফুটবলের নিয়ামক সংস্থার সচিব হিসেবে তিনিই প্রথম ফুটবল অ্যাকাডেমি শুরু করেছিলেন। হাওড়া ইউনিয়নের সাহায্যে ও পিয়ারলেসের পৃষ্ঠপোষকতায় এই ফুটবল অ্যাকাডেমি গড়ে তুলেছিলেন। পরবর্তীকালে ওই অ্যাকাডেমিকে ভাইপো সুব্রত দত্ত হলদিয়ায় নিয়ে গিয়ে নতুন করে শুরু করেছিলেন।

(৩)

ময়দানের কলকাতা লিগ খেলা সব ক্লাবকে সমান অধিকার দিয়েছিলেন।

(৪)

দলবদলে ফুটবলারদের টোকেন চালু করেছিলেন তিনিই।

(৫)

লিগ ম্যাচের সময় মাঠে অ্যাম্বুলেন্স, ওয়াকিটকি ও জলের ব্যবস্থা প্রথম শুরু করেন।

(৬)

আই এফ এ থেকে প্রথম নার্সারি ফুটবল লিগ, মহিলা ফুটবল লিগ ও সাবডিভিশন ফুটবল প্রতিযোগিতা প্রথম শুরু করেন তিনি।

(৭)

ওই সময় ময়দানের অনেক ছোট ক্লাব ছিল, যাদের ড্রেস করার জন্য জায়গা ছিল না। বিভিন্ন ক্লাব তাঁবুতে সেই ছোট ক্লাবগুকে ড্রেস করার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।

(৮)

বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে গিয়ে সবুজ বাঁচাও আন্দোলনে ঝাঁপিয়েছিলেন তিনি। মমতা ব্যানার্জিকে সঙ্গে নিয়ে, সমাজের সকল স্তরের মানুষদের শামিল করিয়ে বিরাট আন্দোলন করে রবীন্দ্র সরোবরকে বাঁচিয়ে ছিলেন।

(৯)

ক্রীড়া প্রশাসক হিসেবে তাঁর অন্যতম সাফল্য শিলিগুড়িতে ফুটবল স্টেডিয়াম গড়া ও নেহরু কাপ আয়োজন।

(১০)

বাংলা দল সন্তোষ ট্রফি খেলতে যাবে। দলের প্রত্যেক ফুটবলারের জন্য ড্রেস কোড থাকতে হবে। ব্লেজার পরে খেলতে যাবে। প্রসঙ্গত, প্রথম বাংলা দলকে ফ্লাইটে নিয়ে গিয়েছিলেন।

নেহরু কাপ, সুভাষ চক্রবর্তী ও আই এফ এ অফিস বন্ধক রাখা

দক্ষিণ কলকাতার এক পাঁচতারা হোটেলের ঠিক পাশেই বিশাল বাড়ি। নাম ফলকে লেখা - জয়ন্ত রায়। তখন সন্ধ্যা ছাড়িয়ে রাত। তো সেই জয়ন্ত রায়ের (মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর আত্মীয়) বাড়ির সামনে বিশাল পুলিশ বাহিনী। আর সেই বাড়ির বিপরীতে (রাস্তার ওপারে) একটি গাড়িতে টেনশন নিয়ে বসে আছেন আইএফএ-র তৎকালীন সচিব প্রদ্যুত দত্ত। তিনি অপেক্ষা করে বসে আছেন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর জন্য। কারণ, কিছুদিন পর শিলিগুড়িতে শুরু হওয়ার কথা নেহরু কাপ। রাজ্যের তৎকালীন ক্রীড়ামন্ত্রী সুভাষ চক্রবর্তীর নানান ‘প্যাঁচের খেলায়’ আইএফ এ তখনও নো অবজেকশন সার্টিফিকেট পায়নি। সময় কমে আসছে। জ্যোতি বসু ছাড়া আর কোনও গতি নেই বুঝেই সেদিন তাঁর ওই রাতে রাস্তায় অপেক্ষা। সেদিন রাতে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা হয়। তাঁর নির্দেশে পরের দিন রাইটার্সে গিয়ে নেহরু কাপ আয়োজনের নো অবজেকশন সার্টিফিকেট নিয়ে এসেছিলেন।

আইএফএ-র আপসহীন, ডাকাবুকো সচিব প্রদ্যুত দত্তর উপর নিয়ে বেশ কিছু নিজের সিদ্ধান্ত আইএফ এ-এর উপর চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলেন ক্রীড়ামন্ত্রী সুভাষ চক্রবর্তী। এক কথায় আইএফএ দফতরটা নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেয়েছিলেন সুভাষ চক্রবর্তী। ফুটবল বিষয় নিয়ে তাঁকে একদিন রাইটার্স বিল্ডিংয়ের রোটান্ডায় মিটিংয়ে ডেকেছিলেন ক্রীড়ামন্ত্রী সুভাষ চক্রবর্তী। ওই মিটিংয়ে মন্ত্রীর মুখের উপর বলেছিলেন, সুভাষের দাবি তিনি মানতে পারবেন না। তিনি আগে আইএফএ-র স্বার্থ দেখবেন। ক্রীড়ামন্ত্রী সুভাষ চক্রবর্তী বিষয়টা ভালভাবে নেননি। তারপর থেকেই মন্ত্রী সুভাষের সঙ্গে আইএফএ-র সম্পর্ক খারাপ হয়ে যায়। যে কারণে নেহরু কাপ আয়োজন করতে গিয়ে হাজারো সমস্যার মুখে পড়তে হয় আইএফএ-কে। আর এর পিছনে নাকি সুভাষ চক্রবর্তীর ‘কালো হাত’ সক্রিয় ছিল। এই সম্পর্ক খারাপ হওয়ার জন্য নেহরু কাপ করতে আইএফএ-র ক্ষতি হয়েছিল ২৭ লক্ষ টাকা।

নেহরু কাপ আয়োজন করার জন্য বিভিন্ন স্পনসরের সঙ্গে কথা বলা শুরু হল। শিলিগুড়িতে পৌঁছে গেল আইএফএ-র একটা বড় টিম। সমাজের সকল স্তরের মানুষের কাছে সহযোগিতার আবেদন করল আইএফএ। একাধিক চা বাগানের মালিক আর্থিকভাবে পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু শিলিগুড়ির সিপিএম পার্টির কয়েকজন ছাড়া একটা বড় অংশ চূড়ান্তভাবে অসহযোগিতা করল। ফলে একাধিক স্পনসর পিছিয়ে গেল। প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও একটা মোটা টাকার স্পনসরের ব্যবস্থা করে ফেলেছিলেন শিলিগুড়ির ফোসিন থেকে (FEDARATION OF CHAMBERS OF COMMERCE AND INDUSTRY) শিলিগুড়ির ব্যবসায়িক সংগঠন ফোসিন থেকে প্রায় ২১ লক্ষ টাকা নিশ্চিত করা হয়েছিল। কিন্তু এখানেও বাধা। এই স্পনসর, নেহরু কাপ নিয়ে উত্তরবঙ্গের এক জনপ্রিয় দৈনিক সংবাদপত্রে বিশেষ প্রতিবেদন ছাপা হয়। খবরটা প্রকাশ হতেই ক্রীড়ামন্ত্রী সুভাষ চক্রবর্তী তাঁর ঘনিষ্ঠ আশু করকে দিয়ে খবর পাঠালেন, প্রকাশিত খবরের প্রেক্ষিতে তিনি যেন একটা রিজয়েন্ডার দিয়ে বলেন, ‘আমি কিছুই বলিনি।’ রিজয়েন্ডার না দিলে কিন্তু ফোসিনের টাকা দেওয়া যাবে না। আটকে যাবে। এই ঘটনা জেনে গিয়েছিলেন প্রকাশিত প্রতিবেদনের সাংবাদিক। তিনি খবরটি পেয়েই তাঁর কাছে পৌঁছে গিয়ে সাংবাদিকটি বলেন, প্রদ্যুতবাবু যদি রিজয়েন্ডার দেন, তাহলে তাঁর (সাংবাদিকটির) চাকরি চলে যাবে। সেই সাংবাদিকটিকে আস্বস্ত করে বলেছিলেন, ‘তুমি অফিসে যাও। নিজের মতো কাজ কর। চিন্তা কর না।’ শেষ পর্যন্ত রিজয়েন্ডার দেননি। টাকার অভাবে নেহরু কাপ আয়োজন করা প্রায় অসম্ভব। তখন ইউনাইটেড ব্যাঙ্কে আইএফএ অফিসকে বন্ধক রেখে নেহরু কাপ আয়োজন করেছিলেন। পরবর্তীকালে আইএফএ সভাপতি জাস্টিস অজিত সেনগুপ্তর সাহায্য নিয়ে ব্যাঙ্কের সুদ মকুব হলে আইএফএ অফিস বন্ধক মুক্ত হয়।

প্রসঙ্গত, শিলিগুড়িতে নেহরু কাপ করার আগে পূর্ণাঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘা স্টেডিয়াম করেছিলেন এই প্রদ্যুতবাবুই। অতীতে শিলিগুড়িতে কোনও স্টেডিয়াম ছিল না। এখন যেখানে কাঞ্চনজঙ্ঘা স্টেডিয়ামটি আছে সেটা ছিল খোলা মাঠ। নাম ছিল ‘তিলক ময়দান’। সেনাবাহিনীর মাঠ। ১৯৭৬-’৭৭-এ ঠিক হয় এই জায়গায় স্টেডিয়াম গড়া হবে। সেই সময় ডিফেন্স মিনিস্টার বংশীলালের অনুমতিও পাওয়া গেল। অনুমতি দিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ও। একটি কমিটি গড়া হল। ১৯৮০ সালে মাঠের একটা অংশে গ্যালারি করা হয়। তারপর আর কোনও কাজ এগোয়নি। প্রদ্যুত দত্ত শিলিগুড়িতে নেহরু কাপ করবেন সেটা কয়েক মাস আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন। দরকার ছিল একটা স্টেডিয়াম। ১৯৮৫ সালে শিলিগুড়ির মেয়র বিকাশ ঘোষের সাহায্য ও প্রদ্যুত দত্তর উদ্যোগে তৈরি হল আজকের কাঞ্চনজঙ্ঘা স্টেডিয়াম।

পরবর্তীকালে এই সুভাষ চক্রবর্তী প্রায়ই ফোন করতেন। দুজনের মধ্যে একটা ভাল সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল। প্রায়ই নিজের বাড়িতে ডাকতেন সুভাষবাবু। গল্প করতেন। আসলে তিনিও বুঝেছিলেন, প্রদ্যুত দত্ত নিখাদ ফুটবলটাকে ভালবেসেই সব কিছু করেছেন। শেষ দিকটায় সুভাষ নিজের ভুলটা বুঝতে পেরেছিলেন। তারপর থেকেই খুবই ভাল সম্পর্ক হয়। সুভাষবাবুও আর কখনও অন্যায় আব্দার করেননি।

মহমেডান স্পোর্টিং ইস্যুতে জ্যোতি বসুর বার্তা -- ‘গো অ্যাহেড’

বাড়িতে একদিন হঠাৎ পুলিশ। কালীঘাট থানার ওসি জানালেন, ‘‘রাইটার্স থেকে অনেকবার অফিসে ফোন করেছে। কিন্তু আপনাকে পাওয়া যায়নি। সিএম আপনাকে ডেকে পাঠিয়েছেন। আগামীকাল সকাল দশটার মধ্যে সিএম-এর বাড়িতে যেতে বলেছেন।’’

পরের দিন আমাকে সঙ্গে নিয়ে নির্দিষ্ট সময়ে মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর বাসভবনে পৌঁছে গেলেন। তখন জ্যোতিবাবু থাকতেন রাজ্যপাল ভবনে। পৌঁছতেই মিষ্টি মুখ করানো হল। একটু পরেই স্নান সেরে ঘরে এলেন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু। পরনে লুঙ্গি ও ফতুয়া। এসেই তিনি মহমেডান স্পোর্টিং ক্লাবের গন্ডগোল নিয়ে শুনতে চাইলেন। সব ঘটনা খুলে বলেন। কয়েক বছর ধরেই কারণে, অকারণে আইএফএ-র উপর চাপ সৃষ্টি করছে মহমেডান। ক্রীড়াসূচি থেকে শুরু করে বেশি সংখ্যার টিকিট চাওয়া - নানান অন্যায় আব্দার লেগেই আছে। এবার ম্যাচ চলাকালীন টিমই তুলে নিয়ে আইএফএ-র নিয়মকে অপমান করেছে। সব ঘটনা শুনে জ্যোতি বসু বললেন, ‘‘সবই ঠিক আছে। কিন্তু মিস্টার দত্ত, আপনি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা ধরে রাখতে পারবেন তো?’’ উত্তরে মুখ্যমন্ত্রীকে বললেন, ‘‘আপনার আশীর্বাদ চাই।’’ একটু ভেবে নিয়ে জ্যোতিবাবু বললেন, ‘‘গো অ্যাহেড।’’

আর পিছনে তাকাননি, ভাবেননিও। সংস্থার সংবিধান মেনে, প্রস্তুতি নিয়ে, মহমেডানকে সাসপেন্ড করার সিদ্ধান্তে অনড় থাকলেন। ঠিক তখনই রাজ্যের তৎকালীন রাজ্যপাল নুরুল হাসান (আইএফএ-র পেট্রন-ইন-চিফ) আইএফএ-কে একটি চিঠি দিয়ে জানালেন, এবার থেকে আইএফএ-র পেট্রন-ইন-চিফ পদে তাঁর নাম যেন ব্যবহার করা না হয়। অতি শীঘ্রই যেন আইএফএ-র প্যাড থেকে রাজ্যপালের নাম বাদ দেওয়া হয়। রাজ্যপালকে অনুরোধ তো করলেনই না, বরং কাল বিলম্ব না করে সঙ্গে সঙ্গে নুরুল হাসানের নাম বাদ দিয়ে আইএফএ-র নতুন প্যাড তৈরির নির্দেশ দিলেন। আসলে মহমেডান ইস্যুতে রাজ্যপালও বহুবার অনুরোধ করেছিলেন। অনুরোধ না শোনায় আইএফএ-র পেট্রন-ইন-চিফ পদ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার পাল্টা চাপ দিতে চেয়েছিলেন রাজ্যপাল। কিন্তু রাজ্যপাল নূরুল হাসান সেই সুযোগটাই আর পেলেন না। বলা ভাল, আইএফএ-র সচিব হিসাবে সুযোগটাই আর দেননি। অর্থাৎ মহমেডান স্পোর্টিংকে সাসপেন্ডই হতে হল। ওই সময় বাংলার ফুটবলে সেই টিমকে সাসপেন্ড করা মুখের কথা নয়। সব সুপারিশ যখন ব্যর্থ তখন পথে নামলেন মহমেডান ক্লাবের কর্তারা।

আর পিছনে তাকাননি, ভাবেননিও। সংস্থার সংবিধান মেনে, প্রস্তুতি নিয়ে, মহমেডানকে সাসপেন্ড করার সিদ্ধান্তে অনড় থাকলেন। ঠিক তখনই রাজ্যের তৎকালীন রাজ্যপাল নুরুল হাসান (আইএফএ-র পেট্রন-ইন-চিফ) আইএফএ-কে একটি চিঠি দিয়ে জানালেন, এবার থেকে আইএফএ-র পেট্রন-ইন-চিফ পদে তাঁর নাম যেন ব্যবহার করা না হয়। অতি শীঘ্রই যেন আইএফএ-র প্যাড থেকে রাজ্যপালের নাম বাদ দেওয়া হয়। রাজ্যপালকে অনুরোধ তো করলেনই না, বরং কাল বিলম্ব না করে সঙ্গে সঙ্গে নুরুল হাসানের নাম বাদ দিয়ে আইএফএ-র নতুন প্যাড তৈরির নির্দেশ দিলেন। আসলে মহমেডান ইস্যুতে রাজ্যপালও বহুবার অনুরোধ করেছিলেন। অনুরোধ না শোনায় আইএফএ-র পেট্রন-ইন-চিফ পদ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার পাল্টা চাপ দিতে চেয়েছিলেন রাজ্যপাল। কিন্তু রাজ্যপাল নূরুল হাসান সেই সুযোগটাই আর পেলেন না। বলা ভাল, আইএফএ-র সচিব হিসাবে সুযোগটাই আর দেননি। অর্থাৎ মহমেডান স্পোর্টিংকে সাসপেন্ডই হতে হল। ওই সময় বাংলার ফুটবলে সেই টিমকে সাসপেন্ড করা মুখের কথা নয়। সব সুপারিশ যখন ব্যর্থ তখন পথে নামলেন মহমেডান ক্লাবের কর্তারা।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ....

২০১১ সালে বাম জমানার অবসান ঘটিয়ে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে রাইটার্স বিল্ডিংয়ে মমতা ব্যানার্জির প্রথম সাংবাদিক সম্মেলন। সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেছিলেন, আজ সব থেকে কার কথা বেশি মনে পড়ছে? উত্তরে মমতা সেদিন বলেছিলেন, ‘‘আজ প্রদ্যুতদা বেঁচে থাকলে সব থেকে খুশি হতেন। প্রদ্যুতদাকে খুব মিস করছি।’’

মিস করার কারণও আছে। ১৯৮৫ সাল থেকেই খুব ভাল সম্পর্ক ছিল। ভাই-বোনের সম্পর্ক। আটের দশকের ঘটনা। একদিন অফিসে হাজির মমতা। অফিসে ঢুকেই আব্দার, ‘‘প্রদ্যুতদা, উজ্জ্বলার চানাচুর আনুন। সঙ্গে চাও খাব’’। প্রসঙ্গত, ভবানীপুরের উজ্জ্বলা সিনেমা হাউসের কাছে একটা চানাচুরের দোকান ছিল। মমতা ওই দোকানের চানাচুর খেতে খুব ভালবাসতেন। আমাকে বললেন, ‘‘দীপু, মমতাকে ভাল করে চিনে রাখ, যোগাযোগ রাখবি। ওয়েস্ট বেঙ্গলের নেক্সট সিএম। সিএম হলে কী চাইবি? এখনই বলে রাখ।’’ মমতা শুনে বলেছিলেন, ‘‘আবার শুরু করলেন প্রদ্যুতদা? ছাড়ুন তো, যত সব ফালতু কথা।’’ মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর সেই দিনের কথা ভুলতে পারেননি বলেই রাইটার্সের সেই সাংবাদিক সম্মেলনে প্রদ্যুত দত্তর প্রসঙ্গ তুলেছিলেন মমতা।

মিস করার কারণও আছে। ১৯৮৫ সাল থেকেই খুব ভাল সম্পর্ক ছিল। ভাই-বোনের সম্পর্ক। আটের দশকের ঘটনা। একদিন অফিসে হাজির মমতা। অফিসে ঢুকেই আব্দার, ‘‘প্রদ্যুতদা, উজ্জ্বলার চানাচুর আনুন। সঙ্গে চাও খাব’’। প্রসঙ্গত, ভবানীপুরের উজ্জ্বলা সিনেমা হাউসের কাছে একটা চানাচুরের দোকান ছিল। মমতা ওই দোকানের চানাচুর খেতে খুব ভালবাসতেন। আমাকে বললেন, ‘‘দীপু, মমতাকে ভাল করে চিনে রাখ, যোগাযোগ রাখবি। ওয়েস্ট বেঙ্গলের নেক্সট সিএম। সিএম হলে কী চাইবি? এখনই বলে রাখ।’’ মমতা শুনে বলেছিলেন, ‘‘আবার শুরু করলেন প্রদ্যুতদা? ছাড়ুন তো, যত সব ফালতু কথা।’’ মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর সেই দিনের কথা ভুলতে পারেননি বলেই রাইটার্সের সেই সাংবাদিক সম্মেলনে প্রদ্যুত দত্তর প্রসঙ্গ তুলেছিলেন মমতা।

মিস করার কারণও আছে। ১৯৮৫ সাল থেকেই খুব ভাল সম্পর্ক ছিল। ভাই-বোনের সম্পর্ক। আটের দশকের ঘটনা। একদিন অফিসে হাজির মমতা। অফিসে ঢুকেই আব্দার, ‘‘প্রদ্যুতদা, উজ্জ্বলার চানাচুর আনুন। সঙ্গে চাও খাব’’। প্রসঙ্গত, ভবানীপুরের উজ্জ্বলা সিনেমা হাউসের কাছে একটা চানাচুরের দোকান ছিল। মমতা ওই দোকানের চানাচুর খেতে খুব ভালবাসতেন। আমাকে বললেন, ‘‘দীপু, মমতাকে ভাল করে চিনে রাখ, যোগাযোগ রাখবি। ওয়েস্ট বেঙ্গলের নেক্সট সিএম। সিএম হলে কী চাইবি? এখনই বলে রাখ।’’ মমতা শুনে বলেছিলেন, ‘‘আবার শুরু করলেন প্রদ্যুতদা? ছাড়ুন তো, যত সব ফালতু কথা।’’ মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর সেই দিনের কথা ভুলতে পারেননি বলেই রাইটার্সের সেই সাংবাদিক সম্মেলনে প্রদ্যুত দত্তর প্রসঙ্গ তুলেছিলেন মমতা।

ধীরেন দের সঙ্গে দারুণ সম্পর্ক থাকায় অঞ্জন মিত্ররা সব সময় বিরোধিতা করতেন। ধীরেন দে তাঁকে দুলু (ডাক নাম) নামেই ডাকতেন। এতটাই স্নেহ করতেন। বিদেশ থেকে যখনই ফিরতেন, তাঁর জন্য কিছু না কিছু আনতেনই। তবে ব্যক্তিগত সম্পর্ক সচিবের কাজে কখনই প্রভাব পড়তে দেননি।

‘‘হু ইজ রুসি মোদি?’’

জামশেদপুরের টাটা স্পোর্টস চেয়ারম্যান রুসি মোদি কলকাতায় বিদেশি দল এনে একটি আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্ট করতে সব আয়োজন করে বসলেন।

এআইএফএফ-এর অশোক ঘোষের পরামর্শ, সাহায্য সবই নিয়েছিলেন, কিন্তু মোদি আইএফএ-কে গুরুত্বই দিলেন না। প্রথম খবরটি জানতে পারলেন আজকাল পত্রিকার সাংবাদিক ডাঃ পল্লব বসু মল্লিক-এর কাছ থেকে। সব শুনে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন ঘটনা সত্যি। সেই দিনই ‘আজকাল’-এ এক সাক্ষাৎকারে বললেন, ‘‘হু ইজ টাটা? হু ইজ রুসি মোদি? আইএফএ-র অনুমতি ছাড়া এই টুর্নামেন্ট করার অনুমতি দেওয়া হবে না।’’ সাক্ষাৎকারটা প্রকাশ হতেই হৈ চৈ পড়ে গেল। চাপে পড়ে গেলেন খোদ রুসি মোদি। বিপদ বুঝে তিনি আলোচনায় বসতে চান। টাটা সেন্টারে আলোচনা সভায় বসেছিলেন মোদি ও প্রদ্যুত দত্ত। মোদিকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যত বড় কোম্পানি হোক বা ব্যক্তি, নিয়ম মেনে আইএফএ-র কাছে টুর্নামেন্ট করার আবেদন করতে হবে। তবেই টুর্নামেন্ট করার অনুমতি দেওয়া হবে। নিজের ভুল স্বীকার করে রুসি মোদি আইএফএ-র কাছে আবেদন করে টুর্নামেন্ট শুরু করতে পেরেছিলেন।

কখনও কোনও অন্যায়ের কাছে মাথা নিচু করেননি। আপাদমস্তক সৎ মানুষ ছিলেন। আর সেটা বুঝে ছিলেন বলেই পরে অশোক ঘোষদের মতো মানুষদের সঙ্গ ছেড়ে প্রদ্যুতবাবুর হাত ধরে ছিলেন মোদি।

পরবর্তীকালে তাঁদের খুব ভাল সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল। শরীর খারাপ হলেই ডেকে নিতেন নিজের বাসভবনে। এতটাই ভাল সম্পর্ক তৈরি হয়ে গিয়েছিল। আসলে কিছু মানুষ থাকে যারা কোনও সম্পর্কের ভিতরে ঢুকে গিয়ে দূরত্ব তৈরি করে দিত অথবা কোনও সম্পর্ক তৈরি হতেই দিত না। প্রদ্যুত দত্ত ও রুসি মোদি বা সুভাষ চক্রবর্তী তার বড় উদাহরণ।

গড়াপেটা বিরোধী ছিলেন

কলকাতা লিগের এক গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ। মুখোমুখি জর্জ টেলিগ্রাফ ও কাস্টমস। ম্যাচটি ড্র হলে কাস্টমস অবনমন থেকে বেঁচে যাবে। ওই বছর জর্জের বেশ ভাল দল। ম্যাচের আগের দিন থেকেই ময়দানে গুঞ্জন, জর্জ-কাস্টমস গড়াপেটা খেলবে। ম্যাচ ড্র হবে। সেই ম্যাচে কাস্টমসের সঙ্গে ৩-৩ ড্র করল। গোটা ময়দানে সমালোচনার ঝড়। ম্যাচের শেষে জর্জের এক কর্তা, মাটন স্টু ফুটবলারদের সামনে মাটিতে ছুড়ে ফেলে দিয়ে বলতে থাকেন, ‘‘খা, .... বাচ্চারা খা।’’ ফুটবলারদের উপর এতটাই রেগে গিয়েছিলেন ওই কর্তা। জর্জ গড়াপেটা খেলছে কর্তারা মেনে নিতে পারছিলেন না।

আইএফএ সচিব প্রদ্যুত দত্তর টিমও গড়াপেটা খেলছে। ভাবতেই পারছে না কেউ।

পরের দিন সকালে চার ফুটবলারকে (তিন ডিফেন্ডার ও সেই ম্যাচে খেলা গোলকিপার) নিজের লেক রোডের বাড়িতে ডেকে পাঠালেন প্রদ্যুত দত্ত। মাথা নিচু করে চার ফুটবলার বসে আছেন। প্রদ্যুত দত্ত ঘরে এসে ম্যাচ সম্পর্কে একে একে জিজ্ঞাসা করলেন। প্রথম দুই ডিফেন্ডার বললেন, তাঁরা কিছুই জানেন না। জেতার জন্যই মাঠে নেমেছিলেন। তৃতীয় ডিফেন্ডারটি বললেন, ‘‘দাদা, ম্যাচটা কেমন যেন খাপছাড়া ভাব ছিল। তাই আমি সেকেন্ড হাফে বসে যাই।’’ উত্তরে প্রদ্যুত দত্ত বলে ওঠেন, ‘‘তুই বেশি শেয়ানা তো। তাই বসে গেলি। তাই তো?’’ বলেই চতুর্থ ফুটবলারটির দিকে চোখ রাখতেই গোলরক্ষকটি ভয়ে হাউহাউ করে কাঁদতে শুরু করেন। কাঁদতে কাঁদতে গোলকিপারটি বলতে থাকেন, ‘‘আমাদের টিম গড়াপেটা খেলেনি। ওদের কর্তারাও কিছু বলেনি। ম্যাচের আগে পান্নাদা এসে বলল, গোলে বল এলে ছেড়ে দিতে ...’’ কথাগুলো শেষ হতে না হতেই নিজের জুতো খুলে ছুড়ে মারলেন প্রদ্যুতবাবু। গোলকিপারটি মাথা সরিয়ে নেওয়ায় জুতোটি দেওয়ালে লাগে। ‘‘এই জুতো তুলে আমাকে তোরা মার। সব পছন্দকরি, কিন্তু গড়াপেটা পছন্দ করি না। তাও তোরা খেললি। আমার সব সম্মান শেষ করে দিলি।’’ কথাগুলো বলেই, ক্লাবের প্যাডে একটা নোটিশ লিখলেন। তারপরে বললেন, এখনই ক্লাবে গিয়ে নোটিশটা যেন ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। ওই নোটিশে জানিয়ে দেওয়া হয়ে ছিল, ক্লাবের ফুটবল সচিব পি চ্যাটার্জিকে বহিস্কার করা হল। ক্লাব চত্বরে আর কখনও যেন তাঁকে দেখা না যায়।

‘খেলার কথা’

প্রদ্যুত দত্তর বহু দিনের ইচ্ছে ছিল, একটা খেলাধূলার কাগজ প্রকাশ করা। শুধু ভাবনাই নয়, কাজেও করে দেখালেন। তখনও তিনি আইএফএ-তে ঢোকেননি। জর্জ টেলিগ্রাফ নিয়েই আছেন। সময়টা ছিল ১৯৭৮ সাল। ক্যামাক স্ট্রিটের শান্তিনিকেতন বিল্ডিংয়ের ১১ তলা। স্পোর্টস ম্যাগাজিন নিয়ে প্রথম মিটিং। সেই মিটিংয়ে ছিলেন সিনিয়র ফটোগ্রাফার মনোজিৎ চন্দ, আনন্দবাজারের প্রাক্তন ডেপুটি অ্যাডভার্টাইজমেন্ট মার্কেটিংয়ের ম্যানেজার ইন্দুভূষণ রায় ছাড়াও দৈনিক কাগজের তিন রিপোর্টার। মনোজিৎ চন্দের জন্যই এই মিটিংয়ে উপস্থিত ছিলেন অশোক দাশগুপ্ত (বর্তমানে ‘আজকাল’-এর সম্পাদক)। বৈঠকে যে তিন দৈনিক কাগজের রিপোর্টার ছিলেন, তাঁরা শুরুই করেছিলেন, ‘‘ডেইলি পেপারে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি ...।’’ তাঁরা এমন ভাব দেখালেন, যেন তাঁরাই আসল লোক, স্পোর্টস ম্যাগাজিন একটা ফালতু ব্যাপার। স্বাভাবিকভাবেই ওই তিন দৈনিক কাগজের রিপোর্টারদের কথা ভাল লাগেনি অশোক দাশগুপ্তর। ওই মিটিংয়ে অশোক দাশগুপ্ত বললেন, ‘‘প্রথমেই বুঝে নেওয়া দরকার যে, ভাল স্পোর্টস ম্যাগাজিন করার জন্য খবরের কাগজে কাজ করার অভিজ্ঞতাই যথেষ্ট নয়। থাকলে ভাল। কলকাতায় ‘খেলার আসর’-এর মতো একটা প্রতিষ্ঠিত স্পোর্টস ম্যাগাজিন আছে। এখন আমাদের দারুন কিছু ভাবতে বা করতে না পারলে ম্যাগাজিন না করাই ভাল। আরও মনে রাখতে হবে, ম্যাগাজিনে কখনই ‘অনুরোধের আসর’ বসানো যাবে না। কারও অনুরোধ নয়, শুধুমাত্র পত্রিকার প্রয়োজনেই লেখা ছাপবে। সেই সঙ্গে পত্রিকাটিকে কমার্শিয়াল দিক দিয়েও ভাবতে হবে।’’

অশোক দাশগুপ্তর সেদিনের মিটিংয়ে কথাগুলি ভাল লেগেছিল প্রদ্যুতবাবুর। তাঁকেই পুরো দায়িত্ব নিতে বললেন। রাজি হলেন অশোকবাবু। পত্রিকার নাম ঠিক হল ‘খেলার কথা’। নতুন এই স্পোর্টস ম্যাগাজিনের অফিস হল ক্যামাক স্ট্রিটের শান্তিনিকেতন বিল্ডিংয়ের ১১ তলা। অশোক দাশগুপ্ত নিজের টিম বেছে নিলেন। ছিলেন বিপ্লব দাশগুপ্ত, সরোজ চক্রবর্তী, পল্লব বসু মল্লিক, ধীমান দত্তর মতো তরুণ রিপোর্টার।

ফটোগ্রাফার হিসেবে কাজ শুরু করলেন প্রদীপ সোম, জয়ন্ত শেঠ, পি কে চৌধুরী, শান্তি সেনরা। তারও পরে যোগ দেন বিকাশ সাধু।

প্রথমে ছাপা হত উল্টোডাঙ্গার দীপ্তি প্রিন্টিং প্রেসে। পরে সেই প্রেস বদলে ছাপা হত ন্যাশনাল আর্ট প্রেসে। শুরুতেই বাজিমাত ‘খেলার কথা’-র। প্রথম সংখ্যা প্রকাশ করার সময় ১০ হাজার কপি ছাপা হয়েছিল। এক সপ্তাহের মধ্যে সব ম্যাগাজিন বিক্রি হয়ে যায়। পরবর্তীকালে অত্যন্ত জনপ্রিয় ‘খেলার কথা’-র সার্কুলেশন পৌঁছয় ৭০ হাজারে। দু-বছর পর অশোক দাশগুপ্তর সঙ্গে প্রদ্যুত দত্তর একটা মতপার্থক্য হয়। ১৯৮০ সালে অশোক দাশগুপ্ত পুরো টিম নিয়ে ‘খেলার কথা’ ছেড়ে চলে গেলেন। একমাত্র বিপ্লব দাশগুপ্তই প্রদ্যুতবাবুর সঙ্গে থাকলেন। অশোক দাশগুপ্ত তাঁর সেই পুরনো টিম নিয়ে নতুন ম্যাগাজিন শুরু করলেন ‘খেলার কাগজ’। ১৯৮০ সালের ১ এপ্রিল।

তারপরেও প্রদ্যুতবাবু দক্ষতার সঙ্গে ‘খেলার কথা’ চালিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু এক বছর পর দেখা গেল, প্রেসে ম্যাগাজিন ছাপতে গেলেই বই আকারে প্রকাশ হওয়ার আগেই ‘খেলার কথা’-র গুরুত্বপূর্ণ কনটেইন ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। আস্তে আস্তে সার্কুলেশনও কমতে থাকে। ময়দানেই ‘খেলার কথা’-কে রুখতে এক অদ্ভুত ষড়যন্ত্র শুরু হল। এই ঘটনায় খুবই দুঃখ পেয়েছিলেন প্রদ্যুত দত্ত। তারপর আর এগিয়ে না গিয়ে ‘খেলার কথা’ বন্ধ করে দিয়েছিলেন তিনি।

তিনি অনেকের কাছে ছিলেন ‘মুশকিল আসান’

চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের মৃত্যুর পর দাহ করার সময় পুলিশ প্রশাসন ও স্থানীয় এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে কাগজে বিবৃতি দিয়েছিলেন অভিনেতা বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়। তাঁর ওই বিবৃতি প্রকাশ হওয়ার দিনই টালিগঞ্জ স্টুডিওয় গিয়ে বিপ্লবকে মারতে গিয়েছিলেন কালীঘাটের কিছু স্থানীয় যুবক। সেই দিন স্টুডিওর পাঁচিল টপকে পালিয়ে গিয়েছিলেন অভিনেতা। সেই দিনই বিপ্লব শরণাপন্ন হয়েছিলেন ক্রীড়ামন্ত্রী সুভাষ চক্রবর্তীর। তখন সুভাষবাবু তাঁকে প্রদ্যুত দত্তর কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেন। কারণ, প্রদ্যুতবাবু খেলাধূলা সংগঠনের পাশাপাশি নানা সমাজসেবা মূলক কাজ করতেন। সমাজে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ছিল। যোগাযোগ ছিল অনেক বেশি। তাছাড়া, প্রদ্যুতবাবু তখন কালীঘাটে থাকেন। সুভাষ চক্রবর্তীর পরামর্শ মেনে বিপ্লব আসেন প্রদ্যুতবাবুর কাছে। সব সমস্যার কথা শুনে দুই দিনেই সমাধান করে দিয়েছিলেন প্রদ্যুতবাবু। বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়কে আর কেউ বিরক্ত করেনি।

পুজোর একমাসও বাকি নেই। হঠাৎ ময়দানের নিচুতলা ডিভিশনের একটি ক্লাব কর্তা হাজির প্রদ্যুতবাবুর অফিসে। ঘরে ঢুকেই সেই কর্তাটি বললেন, পুজোর মাস। বউ-ছেলে-মেয়েদের কিছুই কিনে দিতে পারিনি। কিছু সাহায্য করা যায়? একটু অপেক্ষা করতে বলে সেই কর্তাটির হাতে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে বলেছিলেন, ‘পরিবার নিয়ে ভাল করে পুজো কাটাও’। এমন অনেক ঘটনা আছে, ময়দানের কত মানুষের যে পাশে দাঁড়িয়েছেন তার কোনওটাই তিনি বলতেন না। প্রদ্যুতবাবু রাগি, দাপুটে, রাশভারি কিন্তু মনটা ছিল নরম। দয়ালু মন ছিল তাঁর। কেউ তাঁর কাছে সাহায্য চাইতে গেলে কাউকে তিনি কখনও খালি হাতে ফেরাননি।

‘‘দীপু আমার দিল্লি যেতে ইচ্ছে করছে না ...’’

১৯৯৪ সালের নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ। ট্রেনে দিল্লি যাবেন। দিল্লিতে কাজও আছে, আবার নিজের শরীর চেকআপও আছে। ট্রেনে উঠে সিটে বসেছেন। সি-অফ করতে স্টেশনে গিয়েছি। ব্যাগ, জলের বোতল ঠিক জায়গায় রেখে দুজনে বসে আছি। ট্রেন তখনও ছাড়েনি। ট্রেন ছাড়লেই কামরা থেকে নেমে আসবে। প্রদ্যুতবাবু চুপ করে বসে আছেন। হঠাৎ বলে উঠলেন, ‘‘দীপু, আমার দিল্লি যেতে ইচ্ছে করছে না। তুই দিল্লি চলে যা।’’

আমি বলি ‘‘তা কী করে হয়! তোমার কাজ আমি কী করে করব? তাছাড়া ডাক্তারের কাছে তোমার শরীর চেকআপও করার আছে।’

প্রদ্যুত দত্ত ফের বলে উঠেছিলেন, ‘‘দীপু, বিশ্বাস কর আমার দিল্লি যেতে একদম ইচ্ছে করছে না। ভাল লাগছে না।’’

সেই দিন তিনি দিল্লি অবশ্য গিয়েছিলেন। ক’দিন পরে ফিরেছিলেন বিমানে। ১৬ নভেম্বর, শীতের রাতে। ওই শীতের রাতে কলকাতা বিমানবন্দরের বাইরে হাজার হাজার মানুষ। কারও মুখে কোনও কথা নেই। সবাই যেন মৌনব্রতে মগ্ন। শুধু তাঁর অপেক্ষায় ওরা। তিনি বিমানবন্দর থেকে বেরুলেন ঠিকই, কিন্তু কফিনবন্দি হয়ে। মাত্র ৫৪ বছরের দীর্ঘকায় মানুষটার নিথর দেহটা যখন বাইরে আনা হল, তখন সেই শীতের রাতে অপেক্ষায় থাকা মানুষগুলো হাউ হাউ করে কাঁদতে কাঁদতে আছড়ে পড়ল নিথর দেহটির উপর। যেন সেই মানুষগুলোর কাছে নিজ আত্মীয় বিয়োগের সমান। উচ্চশিক্ষিত, বিচক্ষণ, আপসহীন, দোর্দন্ডপ্রতাপ, সবার মুশকিল আসান এবং চূড়ান্ত সফল আইএফএ-এ সচিবের অকাল প্রয়াণে দিশাহীন হয়ে পড়েছিলেন বাংলার ক্রীড়াপ্রেমীরা। পরের দিন সকালে প্রদ্যুত দত্তর মরদেহ নিয়ে মহানগরের রাজপথে যে মিছিল বেরিয়ে ছিল তা নজিরবিহীন। শুধু ক্রীড়া জগৎ নয়, সমাজের সকল মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে পথে নেমে শেষ বারের মতো কুর্নিস জানিয়ে ছিলেন প্রদ্যুত দত্তকে। দিল্লি থেকে আর তিনি ফিরবেন না। তিনি কি আগেই বুঝতে পেরেছিলেন? তাই দিল্লি যেতে চাইছিলেন না? হয়তো।

Copyright Ⓒ Prodyutdutta.com