(জর্জ টেলিগ্রাফের প্রাক্তন কর্মী)
কেমন দিলাম। কথাটা মাঝেমধ্যেই শুনতাম তাঁর মুখে। তিনি একদা জর্জ টেলিগ্রাফ ট্রেনিং ইনস্টিটিউট এবং জর্জ টেলিগ্রাফ স্পোর্টস ক্লাবের কর্ণধার প্রদ্যুত কুমার দত্ত। আজ থেকে ২৯ বছর আগে ১৯৯৪ সালের ১৬ নভেম্বরে তিনি প্রয়াত হয়েছেন, যখন তাঁর বয়স ছিল ৫৩। এককথায় অকালমৃত্যু। কিন্তু ২৯ বছর বাদেও একবারও মনে হয় না তিনি নেই।
তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৭৪ সালে জুন মাসের একদিন। আমি তখন জর্জ টেলিগ্রাফ ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে টাইপ এবং শর্টহ্যান্ড শিখছি। আমার শেখার সময় ছিল বিকাল তিনটে থেকে পাঁচটা। কিন্তু একটা সমস্যা ছিল যে তখন মাঝেমধ্যেই আমাকে কলকাতা লিগের খেলা দেখতে ময়দানে যেতে হত। আমি তার একবছর আগে থেকেই আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্র থেকে ফুটবলের ধারাবিবরণী দিচ্ছি। আকাশবাণী থেকে নির্দেশ ছিল ধারাবিবরণী দিতে হলে খেলা দেখতে হবে। খেলা দেখার ব্যবস্থা অবশ্য আকাশবাণী কর্তৃপক্ষই করে দিয়েছিলেন।
কিন্তু সমস্যা হল তখন কলকাতা লিগের খেলা শুরু হত বিকাল ৪-৩০ মিনিট থেকে। তাই টাইপ-শর্টহ্যান্ড শিখে মাঠে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। মাঝেমধ্যেই ক্লাস করতে পারিনি। ব্যাপারটা নজর এড়ায়নি টাইপ ইনচার্জের। মাঝেমধ্যে অনুপস্থিতির কারণটা জানতে চাইলেন। সব শুনে রেজিস্ট্রারকে একটা চিঠি লিখতে বললেন।
সেইমতো একদিন বাদে তিনি আমাকে নিয়ে রেজিস্ট্রার প্রদ্যুত দত্তর কাছে নিয়ে গেলেন। আমার সমস্যার কথা শুনে তাঁর প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল। ‘তোমার বয়স কত?’ ২৫ এর কাছাকাছি শুনে যেন কিছুটা খুশি হলেন। ‘অজয় বসু, কমল ভট্টাচার্য, পুষ্পেন সরকারের পাশে বসে ধারাবিবরণী দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছ। তুমি তো ভাগ্যবান। এগিয়ে যাও কোনও সমস্যা হবে না।’ পরদিন টাইপিষ্ট ইনচার্জ আমাকে জানালেন, শর্টহ্যান্ড ক্লাসটা ২টা থেকে ৩টার মধ্যে করতে হবে। টাইপের ক্লাস ৩টা থেকে ৪টে। তবে যেদিন খেলা দেখতে যাবে একটু আগেই যেতে পারবে।
সেই ১৯৭৪ থেকে ১৯৯৪, দেখতে দেখতে ২০টা বছর কেটে গেছে। ঠিক একজন দাদার মতো আগলে রেখেছেন। খুব কাছে থেকে মানুষটিকে দেখেছি। দীর্ঘাকার, স্বাস্থ্যবান এক পুরুষ। বাইরে থেকে খুবই কঠিন মনে হত। এমনিতে তিনি ছিলেন গম্ভীর প্রকৃতির। কিন্তু আসলে তাঁর মনটা ছিল শিশুর মতো সরল। পরিবারের বাইরেও তিনি ছিলেন ত্রাণ-কর্তা। অফিসের একজন সাধারণ কর্মীর জন্যও তিনি ছিলেন দায়িত্বপরায়ণ, স্নেহশীল।
আমি বিস্তারিত বিবরণে যাব না। তবে কয়েকটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা তুলে ধরছি।
তিনি ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের পাশাপাশি ছিলেন জর্জ টেলিগ্রাফ স্পোর্টস ক্লাবের সচিব। বলতে গেলে ক্লাবের খোলনলচে পাল্টে দিয়েছিলেন। জর্জের ফুটবল দল সেই সময় ভাল অবস্থায় ছিল না। সেই দল প্রদ্যুত দত্ত-র তত্ত্বাবধানে ঘুরে দাঁড়াল ১৯৭৫ সাল থেকে। স্বপন দত্ত, শম্ভু মৈত্র, নিমাই দালাল - এরপর বড় দল থেকে বেশ কয়েকজন ফুটবলারকে নিয়ে দল গড়লেন। সঙ্গে মণীশ মান্না, জগদীশ ঘোষ, মহম্মদ মুকিম -- এরকম কয়েকজন তরুণ প্রতিভাবানদের। ফলস্বরূপ ১৯৭৫ থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল জর্জ টেলিগ্রাফ স্পোর্টস ক্লাব। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৯ জর্জ টেলিগ্রাফ বড় তিন দলের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল। একটা সময় ‘জায়ান্ট কিলার’ খ্যাত জর্জ টেলিগ্রাফ স্পোর্টস ক্লাব আবার
স্বমহিমায় ফিরে এসেছিল প্রদ্যুত দত্ত-র সময়ে। মেজদাদা বিশ্বনাথ দত্ত সচিব থাকাকালীন যেমন জলপাইগুড়ি থেকে গোলরক্ষক মণিলাল ঘটক এবং ইনসাইড ফরোযার্ড রুনু গুহঠাকুরতাকে তুলে এনেছিলেন, তাঁরা পরবর্তীতে দুই বড় দল তথা বাংলা এবং ভারতীয় দলে সদর্পে বিচরণ করেছেন। পরবর্তীতে গোলরক্ষক সনৎ শেঠ, কমল সরকার, চয়ন ব্যানার্জি, প্রসূন ব্যানার্জি। বিশ্বনাথ দত্তর আমলেই জর্জ টেলিগ্রাফ থেকে বড় দলে সুযোগ পেয়েছেন। সেই ধারা আবার ফিরে এল প্রদ্যুত দত্তর হাত ধরে। জর্জ টেলিগ্রাফ থেকে বড় দলে এবং রাজ্য তথা জাতীয় দলে সদর্পে বিচরণ করেছেন মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, অলোক মুখার্জি, জগদীশ ঘোষ, সঞ্জীব চৌধুরি, সত্যজিৎ চ্যাটার্জি প্রমুখ। প্রদ্যুত দত্তর আকর্ষণেই মোহনবাগানের অধিনায়ক নিমাই গোস্বামী, ইস্টবেঙ্গল থেকে রমেন ভট্টাচার্য, মৃদুল মুৎসুদ্দি, প্রদীপ দত্ত প্রমুখ খ্যাতনামা তারকা যোগ দিয়েছিলেন জর্জ টেলিগ্রাফ ক্লাবে।
১৯৭৬ থেকে ১৯৮৪ এই সময়ে জর্জ টেলিগ্রাফ ট্রফিও জিতেছে যথাক্রমে ১৯৭৭ সালে দার্জিলিং গোল্ড কাপ এবং ১৯৭৮ সালে আগরতলায় পদ্মজং ট্রফি। ১৯৮৪ সালে পাটনায় সঞ্জয় গান্ধী ফুটবলে রানার্স হয়েছিল জর্জ টেলিগ্রাফ। টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল শক্তিশালী ইস্টবেঙ্গল ক্লাব। সুযোগ পেয়েছিল ডিসিএম ট্রফিতে।
কতগুলো নীতি তিনি পালন করতেন। অন্যায়ের সঙ্গে আপস করতেন না। অনৈতিক গড়াপেটা খেলা ঘৃণা করতেন। এ ব্যাপারে তিনি নিজেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। আইএফএ-র সচিব হিসাবে তিনি বড় তিন দলের অন্যায় আবদার যেমন মেনে নেননি। প্রয়োজনে কঠোর শাস্তি দিতেও দ্বিধা করেননি, পাশাপাশি সরকারি অসহযোগিতাতেও থেমে থাকেননি। এইসব ব্যাপারে অন্যদের লেখাতে বিস্তারিতভাবে জানতে পারবেন। গড়াপেটা ম্যাচ তিনি কতটা ঘৃণা করতেন এবং এব্যাপারে এমন একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সেটা ফুটবল জগতে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
ঘটনা ১৯৭৬ সাল। ছ-বছর বাদে কলকাতা লিগ জয়ের দোরগোরায় মোহনবাগান। কিন্তু ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে ব্যবধান মাত্র ১ পয়েন্টের। লিগ তখন প্রায় শেষ পর্যায়ে। তিন-চারটি ম্যাচ বাকি ছিল দুই বড় দলের। তাই প্রতিটি ম্যাচই চ্যালেঞ্জ ছিল সবুজ মেরুন জার্সিধারীদের কাছে। এরকম একটা টেনশনের সময়ে মোহনবাগানের মুখোমুখি জর্জ টেলিগ্রাফ। শেষ মুহূর্তে এসে তরী যাতে না ডোবে এ ব্যাপারে সক্রিয় ছিলেন মোহন-কর্তারা। ময়দানের বাতাসে তখন খবর, জর্জ টেলিগ্রাফকে ম্যানেজ করেছে মোহনবাগান। হ্যাঁ। এরকম একটা গুজব ছড়ানোর একটা কারণ তো ছিলই।
প্রদ্যুত দত্তর আশঙ্কা ছিল তিন চারজন ফুটবলারকে হয়তো মোহনবাগান ম্যানেজ করে নিতে পারে। তাই একটা কৌশল অবলম্বন করলেন তাহল, মোহন-কর্তাকে আশ্বস্ত করলেন। শোনা যায়, ৩০ হাজার টাকার বিনিময়ে। সেইমতো অর্থও নিয়েছিলেন। অর্থাৎ মোহনবাগান আর কোনও বিশেষ ফুটবলারের পিছনে ছুটবে না। তবে তাঁর অপারেশন এখানেই শেষ ছিল না। পাশাপাশি দলের বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলারকে ম্যাচের দু-দিন আগেই তুলে আনলেন নিজের বাড়িতে জর্জ টেলিগ্রাফের ডেরায়।
এদিকে ময়দানে রটে গেছে মোহনবাগানকে ছেড়ে দিচ্ছে জর্জ টেলিগ্রাফ। মোহনবাগান মাঠে খেলা দেখতে এসেছেন প্রচুর দর্শক। লিগ জয়ের পথে মোহনবাগানের সামনে ‘জায়ান্ট কিলার’ খ্যাত দুই দল জর্জ টেলিগ্রাফ এবং এরিয়ান। স্বভাবতই জর্জ টেলিগ্রাফ ম্যাচ ঘিরে টেনশন ছিল সবুজ-মেরুন শিবিরে। সেই টেনশন আরও বাড়িয়ে দিলেন জর্জ-সচিব প্রদ্যুত দত্ত। দল নিয়ে মাঠে পৌঁছেই মোহন-কর্তাকে বললেন, ‘সরি দাদা, স্ট্রেট ফাইট।’ সেই সঙ্গে টাকাটাও ফেরত দিলেন। ম্যাচে মোহনবাগানের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিল জর্জ টেলিগ্রাফ। শেষদিকে গোল করে জিতেছিল মোহনবাগান। আর একটি ঘটনা ১৯৭৭ সালে। কুমারটুলি ক্লাব তখন অবনমনের কবলে। ঘটনা হল, ঐতিহ্যশালী এই ক্লাবের প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের ভাল সম্পর্ক ছিল জর্জ-সচিবের। তাঁর দলের বেশ কয়েকজন সক্রিয় কর্মীর যোগাযোগ ছিল কুমারটুলি কর্মকর্তাদের সঙ্গে। পাশাপাশি ময়দানে কুমারটুলি ক্লাবের ডেরা ছিল জর্জ টেলিগ্রাফ তাঁবুর সংলগ্ন কবাডি তাঁবুতে। সেই হিসাবে কুমারটুলি ক্লাব প্রায় নিশ্চিত ছিল জর্জের কাছ থেকে দু-পয়েন্ট পাওয়া যাবে। এবারেও নীতিতে অবিচল ছিলেন প্রদ্যুত দত্ত। ম্যাচটা জর্জ টেলিগ্রাফ জিতেছিল। আসলে মাঠের বাইরে হৃদ্যতা যতই থাকুক, খেলার ক্ষেত্রে তিনি ‘ছেলে খেলা’ বরদাস্ত করতেন না। তাই গড়াপেটা খেলাকে তিনি মনে প্রাণে ঘৃণা করতেন।
বরাবরই চ্যালেঞ্জ নিতে ভালবাসতেন। অনেকেই যে কাজ অসম্ভব, অবাস্তব বলে মনে করতেন। তিনি মনে করতেন সদিচ্ছা থাকলে কোনও কাজই অসম্ভব নয়। যেমন ১৯৮৮ সালে জওহরলাল নেহরু আন্তর্জাতিক গোল্ড কাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট। সেবার দায়িত্ব পেয়েছিল আইএফএ। সংস্থার সচিব প্রদ্যুত কুমার দত্ত। জওহরলাল নেহরু আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্ট উদ্বোধনী বছর ১৯৮২ এবং ১৯৮৪ দুবারই তাক লাগিয়ে আয়োজন করেছিল বাংলার নিয়ামক সংস্থা আই. এফ. এ। যার নেপথ্যে মুখ্য অবদান ছিল আইএফএ-র তৎকালীন সচিব এবং পরবর্তীতে এআইএফএফ-এর সচিব অশোক ঘোষ। অর্থাৎ নেহরু কাপ আয়োজনের ক্ষেত্রে দুবারই দারুণভাবে সফল ছিল বাংলার ফুটবলে নিয়ামক সংস্থা। তাই এবারে নতুনত্ব কিছু দরকার। প্রদ্যুত দত্ত সিদ্ধান্ত নিলেন এবারের প্রতিযোগিতা আয়োজন করবেন উত্তরবঙ্গের প্রাণকেন্দ্র, জেলা শহর শিলিগুড়িতে। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল কেরালা রাজ্যের মতো ফুটবলকে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দেওয়ার। এই ব্যাপারে তাঁর পূর্বসূরী মেজদাদা প্রথম পথ দেখিয়েছিলেন ১৯৭৩ এবং ১৯৭৪ সালে আই. এফ. এ শিল্ড এবং জাতীয় জুনিয়র ফুটবল আয়োজন করেছিলেন কলকাতার বাইরে শিলিগুড়ি, পুরুলিয়া, বার্নপুর, কৃষ্ণনগর এরকম কয়েকটি জেলা শহরে। কোনও আন্তর্জাতিক আসর আগে কখনো অনুষ্ঠিত হয়নি। এই ব্যাপারে তৎকালীন ক্রীড়ামন্ত্রী সুভাষ চক্রবর্তী ১৯৮৭ সালে আইএফএ-র পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে এসে বলেছিলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম তিনি স্বপ্নবিলাসী। এখন দেখছি তিনি স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করার ক্ষমতাও রাখেন।’
প্রসঙ্গত শিলিগুড়িতে নেহরু কাপ আয়োজনের সময় তাঁর সঙ্গে ক্রীড়ামন্ত্রীর অনেক ব্যাপারেই মতান্তর হয়েছিল। রাজ্য সরকার শিলিগুড়িতে স্টেডিয়াম গড়া থেকে শুরু করে শহরটাকে সাজিয়ে তোলার ক্ষেত্রে সর্বতোভাবে সাহায্য করলেও প্রতিযোগিতার আয়োজনের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করেনি। তবু তিনি আত্মসমর্পণ করেননি। হ্যাঁ, নেহরু কাপ আয়োজনের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার থেকেও অনেকরকম প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কোনওটাই সেভাবে লক্ষ করা যায়নি। বাংলার তৎকালীন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অজিত কুমার পাঁজা আর সাংসদ মমতা ব্যানার্জি ছাড়া বাংলার আর কোনও সাংসদকে সেভাবে কাছে পাননি। নেহরু কাপের অতিথি তালিকায় এক ঝাঁক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর নাম ছাপা হলেও শেষ পর্যন্ত একমাত্র মন্ত্রী শীলা দীক্ষিত (পরবর্তীতে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী) ছাড়া আর কোনও সাংসদের চরণধুলি শিলিগুড়িতে পড়েনি।
সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা হল, এআইএফএফ-এর তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সি পাহাড় থেকে সাগর যাওয়ার পথে শিলিগুড়ি শহরে দেশবন্ধু নগরে এসেও কাঞ্চনজঙ্ঘা স্টেডিয়াম মুখো হননি। ঘটনা হল হরেকরকম বাধা এবং অসহযোগিতা সত্ত্বেও প্রদ্যুত দত্তকে থামানো যায়নি। তখন তাঁর জেদ বেড়ে যেত। দৃঢ়তার সঙ্গে পরিস্থিতি সামলেছেন। লক্ষে তিনি ছিলেন অবিচল এবং সাফল্য অর্জনও করেছিলেন। একটা কথা সবসময়ই বলতেন, সততার সঙ্গে লক্ষে অবিচল থাকলে যে কোনও কঠিন কাজেও সাফল্য পাওয়া যায়।
আর একটা ব্যাপারে তিনি অনেকের থেকে ব্যতিক্রম। এই ব্যাপারে শিলিগুড়িতে খেলা আয়োজনের সময়ের একটা ঘটনা জানাচ্ছি। তিনি কখনোই পালিয়ে যাওয়ার পাত্র ছিলেন না। তবে তাঁর একটা অভ্যাস ছিল খোলামেলা আড্ডায় এমন অনেক কথা বলেছেন, যে কথাগুলো সংবাদপত্রে ছেপে দু-একজন সাংবাদিক বাজার গরম করতে চেয়েছেন। তাতে সেই সাংবাদিকরা হয়তো বাহবা কুড়িয়েছেন, ক্ষতি হয়েছে প্রদ্যুত দত্ত-র। কারণ খোলামেলা আড্ডায় তিনি যে কথাগুলো বলতেন সেগুলো সংবাদপত্রে ছাপার জন্য বলেননি। কারণ, সেইসব আড্ডায় বেশিরভাগই থাকতেন অন্য পেশার লোকজন।
এরকমই একদিন নেহরু কাপ শুরুর প্রাক্কালে যখন অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে বিরক্ত হয়ে কয়েকটি কথা অভিমানে বলে ফেলেছিলেন। সেই কথাগুলো কোনও একটি সংবাদপত্রে ছেপেছিলেন সেই কাগজের দায়িত্বশীল একজন সাংবাদিক। কথাগুলো তিনি ছাপার জন্য বলেননি। একেবারে ঘরোয়া কথাবার্তা। সংবাদপত্রে প্রকাশিত হওয়ার পরই তৎকালীন শাসকদল নেহরু কাপ বয়কট করে। সেই সময়ে নেহরু কাপের খেলা জোরকদমে চলছে। প্রদ্যুত দত্তর চেয়ারে অন্য যে কেউ যদি থাকতেন তিনি হয়তো সেই সময় সেই খবরকে অস্বীকার করতেন। তাতে বিপদে পড়তেন সেই সাংবাদিক। প্রদ্যুত দত্ত সেই পথে হাঁটেননি। ছাপার জন্য না বললেও সেই সংবাদ/প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে মুখ খোলেননি। কারণ সেই সাংবাদিককে তিনি স্নেহ করতেন।
তিনি ছিলেন আপাদমস্তক একজন ফুটবলপ্রেমী। ১৯৮৬ সালে মহমেডান ক্লাবকে সাসপেন্ড করতে বাধ্য হয়েছিলেন। দল দ্বিতীয় ডিভিসনে নেমে গিয়েছিল। সেই সময় অনেকরকম চাপের সামনেও তিনি ছিলেন অবিচল। মহমেডান ক্লাবের অখেলোয়াড়ি মনোভাবনে প্রশ্রয় দেননি। পাশাপাশি একথাও বলতেন, ‘মহমেডান সমর্থকরাও যথার্থই ফুটবলপ্রেমী। ওদের জন্য কষ্ট হয়, আমরা নিরুপায়।’ কথাটা বলেছিলেন ১৯৮৬ সালে মহমেডানকে সাসপেন্ড করার পর একদিন রেড রোড ধরে আইএফএ অফিসে যাওয়ার পথে ক্লাবের তাঁবুর বাইরে প্রাচীরে শুয়ে থাকা হতাশ মহমেডান সমর্থকদের দেখে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেছিলেন। ‘ওদের দেখলে কষ্ট হয়। কিন্তু .....।’
তিনি ছিলেন একজন দক্ষ প্রশাসক। কলকাতায় অল এয়ারলাইন্স গোল্ড কাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট প্রসঙ্গে আসছি। অল এয়ারলাইন্স গোল্ড কাপ ছিল একটা সর্বভারতীয় ফুটবল প্রতিযোগিতা। এরকম একটা সর্বভারতীয় প্রতিযোগিতা আয়োজন করার জন্য নিয়ামক সংস্থা আইএফএ-র অনুমোদন নেয়নি এয়ারলাইন্স গোল্ড কাপ কমিটি। আইএফএ-র সম্মান বাঁচাতে কঠোর হয়েছিলেন প্রদ্যুত দত্ত। শেষমেশ এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ আইএফএ-র অনুমোদন নিতে বাধ্য হয়েছিলেন।
১৯৮৯ সালে আইএফএ শিল্ডে ইস্টবেঙ্গল অংশগ্রহণ করল না। আইএফএ-কে একটু টাইট দেবে ভেবেছিল। ইস্টবেঙ্গলকে বাইরে রেখে শিল্ড পরিচালনা করতে পারবে না আইএফএ-র বদ্ধমূল ধারণা ছিল লাল-হলুদ কর্তৃপক্ষর। এই মানুষটি তো অন্য ধাতের। ইস্টবেঙ্গলকে বাইরে রেখে শিল্ড আয়োজন করলেন।
১৯৯১ সালে উল্টো ছবি। আই এফ এ শিল্ডের শতবর্ষ। এবারে নানান বাহানা তুলে চাপ সৃষ্টি করেছিল মোহনবাগান। ভেবেছিল ১৯১১ সালে ঐতিহাসিক জয়ী দলকে বাদ দিয়ে কিছুতেই শতবর্ষের শিল্ড আয়োজনের পথে আইএফএ হাঁটবে না। সচিব প্রদ্যুত দত্ত অনেক চেষ্টা করেও মোহনবাগান কর্মকর্তাদের রাজি করাতে পারেননি। এবারে ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল আইএফএ সচিবের। সিদ্ধান্ত নিলেন মোহনবাগানকে বাদ দিয়েই শিল্ডের খেলা হবে। শিল্ডে ইস্টবেঙ্গল খেলেছিল। জোর লড়াই হয়েছিল ঢাকা মহমেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সঙ্গে। ফাইনালে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর টাইব্রেকারে জিতেছিল ইস্টবেঙ্গল। প্রসঙ্গত সে বছর ফাইনাল ম্যাচের আগে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন তারকা ফুটবলারদের সমন্বয়ে একটা প্রদর্শনী ফুটবল ম্যাচের আয়োজন করেছিলেন। এই ঘটনাগুলোই তাঁর চারিত্রিক দৃঢ়তার সাক্ষ্য বহন করে। আইএফএ সচিব হিসাবে এরকম অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত যখন নিয়েছেন অনেক সময় বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। কিন্তু তাঁকে থামানো যায়নি। আইএফএ-র সম্মান রক্ষা বা মর্যাদা রাখার জন্য তিনি কখনও আপস করেননি। এই ব্যাপারে তিনি ছিলেন একরোখা।
অনেক গঠনমূলক কাজ করে গেছেন। নেহরু কাপের কথা আগেই বলেছি। নেহরু কাপকে কেন্দ্র করে শিলিগুড়িতে যে আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম তৈরি হয়েছে তার পিছনে তৎকালীন রাজ্য সরকার এবং ক্রীড়ামন্ত্রীর সদিচ্ছা নিশ্চয়ই প্রশংসনীয়। পাশাপাশি নেহরু কাপকে কেন্দ্র করে সেজে উঠেছিল শিলিগুড়ি। নেহরু কাপের আগের শিলিগুলির পরিবেশ যাঁরা দেখেছেন তাঁরা নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন পরবর্তীতে গড়ে ওঠা এই শহরের পরিবর্তনের কথা। হ্যাঁ। পরবর্তীতে নিশ্চয়ই এই জেলা শহরে স্টেডিয়াম তৈরি হত। এই গঠনমূলক কাজটা আগেই হওয়ার জন্য সবার আগে প্রদ্যুত কুমার দত্তর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
স্বাধীনতার ৪০ বৎসর উদযাপনের অঙ্গ হিসাবে নেহরু কাপকে বর্ণময় করে তুলেছেন। স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরেছেন ট্যাবলোতে।
অমলা শঙ্করের তত্ত্বাবধানে মনমাতানো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান উপস্থিত দর্শকরা প্রাণভরে উপভোগ করেছেন। প্রতিযোগিতা চলাকালীন স্টেডিয়ামে তো বটেই শহর জুড়ে শোনা যেত বাংলা এবং হিন্দিতে দেশাত্ববোধক গান। গানগুলো একসূত্রে বাঁধা হয়েছিল। এখন স্বাধীনতা দিবস, প্রজাতন্ত্র দিবস এবং নেতাজির জন্মদিনে যে গানগুলো আমরা শুনি এক সুতোয় (ক্যাসেটে) বাঁধা হয়েছিল নেহরু কাপের সময়। এই ব্যাপারটা তাঁরই মস্তিষ্কপ্রসুত।
নিজে যেমন চ্যালেঞ্জ নিতে ভালবাসতেন সেরকম লড়াকু মানুষদের পছন্দ করতেন। যেমন সুভাষ ভৌমিককে ভীষণ পছন্দ করতেন। তিনি সচিব থাকাকালীন জর্জ টেলিগ্রাফের কোচিংয়ের দায়িত্ব দিয়েছিলেন সুভাষকে। ১৯৮৭ থেকে ১৯৯০ চার বছর দলের দায়িত্বে ছিলেন সুভাষ।
তিনি সচিব থাকাকালীন বাংলা প্রথম সন্তোষ ট্রফি জিতেছিল ১৯৮৬-৮৭ সালে। সে বছর বাংলা দলের কোচ ছিলেন নিমাই গোস্বামী সঙ্গে টেকনিক্যাল ডিরেক্টর অরুণ সিনহা। তবে প্রদ্যুত দত্তর পছন্দ ছিলেন সুভাষ ভৌমিক। এই ব্যাপারে দল সামলাবার জন্য সুভাষকে তিনি ম্যানেজারের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। ঘটনা হল ম্যানেজারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দল পরিচালনার ক্ষেত্রে সুভাষই সিদ্ধান্ত নিতেন। কোচিংয়েও মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন এবং সফলও হয়েছিলেন।
কারণ পি কে যখন কোচ তখন ম্যানেজারের কাজটা তিনিই সামলে নেবেন। প্রসঙ্গত পি কে এবং অমল দত্ত দু-জনকে তিনিই প্রথম বাংলা দলের কোচ হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন।
তিনি সচিব থাকাকালীন বাংলা সন্তোষ ট্রফি জিতেছে ১৯৮৬-৮৭, ১৯৮৯-৯০ সালে। কলকাতায় সন্তোষ ট্রফি আয়োজন করেছেন ১৯৮৬-৮৭ সালে। সে বছর স্বাধীনতার ৪০ বৎসর পূর্তি উপলক্ষে জাতীয় সংহতির কথা মাথায় রেখে প্রধান অতিথি হিসাবে এনেছিলেন দুর্ভেদ্য ডিফেন্ডার জার্নেল সিং-কে।
ফুটবলাররা প্রদ্যুতদাকে দাদার মতো বিশ্বাস করতেন। ফুটবলারদের তিনিও প্রাণ দিয়ে ভালবাসতেন। এ প্রসঙ্গে একটা ঘটনা জানাচ্ছি। ১৯৭৭ সাল, জর্জ টেলিগ্রাফকে থেকে ইস্টবেঙ্গলে যোগ দিয়েছেন মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য। মনোরঞ্জনের দলত্যাগ মেনে নিতে পারেননি তাঁর প্রধান দুই সেনাপতি বাচ্চু গুপ্ত (শতদল) এবং পুটে ঘোষ। মনোরঞ্জনকে ধরে রাখার জন্য ওই দু-জন আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। এমননকী প্রদ্যুতদাকে সঙ্গে নিয়ে তাঁরা মনোরঞ্জনের বাড়ি পর্যন্ত হানা দিয়েছিলেন। তবে দেখা পাননি। সঙ্গে গেলেও তাতে সায় ছিল না জর্জ-সচিবের। একদিন বাদে মনোরঞ্জনের ঘনিষ্ঠ একজনকে ডেকে বলেছিলেন, ‘মনোরঞ্জন যেন সই প্রত্যাহার না করে। ইস্টবেঙ্গলে খেলার সুযোগ যেন হাতছাড়া না করে।’ একবছর বাদে মনোরঞ্জনকে ইস্টবেঙ্গল রাখবে না ভেবেছিল। তাদের টার্গেট ছিল মোহনবাগানের সুব্রত ভট্টাচার্য। খবরটা কানে যেতেই প্রদ্যুতদা আসরে নামলেন। কারণ, তিনি জানতেন ইস্টবেঙ্গল সুব্রতকে পাবে না। শেষ পর্যন্ত মনোরঞ্জনের কাছেই ইস্টবেঙ্গল ছুটে আসবে। তার মধ্যে মনোরঞ্জন যাতে ভুল করে দল ছাড়ে সেই আশঙ্কায় প্রদ্যুতদা নিজেই মনোরঞ্জনকে তাঁর বাড়িতে তুলে এনেছিলেন। সামান্য ২৪ ঘন্টার মধ্যেই দেখা গেল সুব্রতকে না পেয়ে ইস্টবেঙ্গল ছুটে এল মনোরঞ্জনের কাছে।
এই ঘটনা দুটোই তাঁর দূরদর্শিতার প্রমাণ। তাঁর সময়ে জর্জ টেলিগ্রাফ থেকে আরও দু-জন ফুটবলার সদর্পে জাতীয় দলে বিচরণ করেছেন দীর্ঘ দিন। রক্ষণভাগে অলোক মুখার্জি এবং মাঝমাঠে সত্যজিৎ চ্যাটার্জি। ১৯৮১ থেকে ১৯৯৪ অলোক মুখার্জি এবং মাঝমাঠে সত্যজিৎ চ্যাটার্জি ১৯৮৬ থেকে ২০০২ পর্যন্ত একনাগাড়ে খেলেছেন মোহনবাগানে।
খ্যাতনামা প্রাক্তন ফুটবলার শান্ত মিত্র এবং সুভাষ ভৌমিকের কোচিং জীবন শুরু জর্জ টেলিগ্রাফ ক্লাব থেকে। ১৯৭৬ সালে শান্ত মিত্র এবং ১৯৮৬ সালে সুভাষ ভৌমিককে জর্জ টেলিগ্রাফ ক্লাবে কোচ হিসাবে দায়িত্ব দিয়েছিলেন প্রদ্যুত দত্ত।
জর্জ টেলিগ্রাফ ক্লাবে তাঁর হাত ধরে অনেক ফুটবলার এসেছেন। ফুটবলারদের কাছে তিনি ছিলেন যথার্থই একজন দাদা, অভিভাবকের মতো। ফুটবলারদের প্রতি ছিল তাঁর অকৃত্রিম স্নেহ, ভালবাসা। তাঁদের মধ্যে বিশেষ জায়গা ছিল আক্রমণ ভাগের ফুটবলার মহম্মদ মুকিমের। মুকিমও তাঁকে পিতৃবৎ শ্রদ্ধা করতেন।
ফুটবল জগতের বাইরে তিনি বিশেষ স্নেহ করতেন রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। মমতার লড়াকু, হার না মানা মনোভাব তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। মমতা আগামীদিনে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হবেন বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। মমতার ওপর এতটাই আস্থা ছিল তৎকালীন আইএফএ সচিবের। কথাটা তিনি বলেছিলেন আটের দশকের শেষ দিকে। প্রায় ২২/২৩ বছর বাদে তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী মিলে গিয়েছিল। এতটাই দূরদর্শী ছিলেন তিনি।
সরাসরি রাজনীতি না করলেও মনে হয় একটু কংগ্রেস ঘেঁষা ছিলেন। তাঁর কাছ থেকে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু, ইন্দিরা গান্ধী সম্পর্কে অনেক অজানা কাহিনি শুনেছি। পাশাপাশি বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে জ্যোতি বসু এবং কর্ণাটকের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী রামকৃষ্ণ হেগড়েকে দেশপ্রেমিক বলে মনে করতেন। বঙ্গীয় রাজনীতিতে সবচেয়ে শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন বাংলার রূপকার ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়।
‘কেমন দিলাম’
এই কথাটি তিনি প্রায় বলতেন, শুরুতেই সে কথা বলেছি। এ প্রসঙ্গে একটা ঘটনা তুলে ধরছি। তাঁর সঙ্গে নানা বিষয়ের কথা হত। এরকম একদিন সিনেমা নিয়ে কথা হচ্ছিল। সেই আলোচনায় বিশাল জায়গা নিয়েছিলেন মহানায়ক উত্তরকুমার। কথায় কথায় মহানায়ক অভিনীত ‘স্ত্রী’ ছবির প্রসঙ্গ এসেছিল। তিনি সিনেমাটা দেখেছিলেন। বললেন, ‘শুরুতেই উত্তমকুমারের পুজোটা লক্ষ্য করেছিস।’ নায়েব মশাই ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রসঙ্গও এসেছিল। তাঁর হিসাবের খাতা না দেখেই সই করতেন মাধব দত্ত-র চরিত্রে অভিনীত উত্তমকুমার। ঘটনাটা মনোযোগ সহকারে দেখেছিলেন সেটা বুঝলাম কয়েকদিন বাদেই। সেদিন অফিসে পৌঁছে দেখলাম যথারীতি ধবধবে সাদা ধুতি এবং পাঞ্জাবি পরিহিত প্রদ্যুতদা আমাকে বলেছিলেন ‘দেখ তো, আমাকে মাধব দত্ত-র মতো লাগছে কিনা? একটু বাদেই চিফ অ্যাকাউন্টেন্ট মিহির কানুনগো হিসাব পত্র নিয়ে আসতেই বললেন, ‘দিন আজকে না দেখেই সব সই করে দেব।’ একেবারে মাধব দত্ত-র মতো।
তিনি ছিলেন ভোজনরসিক। প্রতিদিন বিকালে ‘আপনজন’ - দোকানের তেলেভাজা ছিল তাঁর খুব প্রিয়। সেই সুস্বাদু খাবার খাওয়ার সময় একদিন বলেছিলাম বারাসাতের করুণাময়ী মিষ্টান্ন ভান্ডারের তেলেভাজা আপনজনের মতো সুস্বাদু। ছোটবেলায় দেখেছি ব্যারাকপুর থেকে ‘অ্যাংলো ইন্ডিয়ান’রা প্রায়ই বিকালে গাড়ি করে এসে করুণাময়ীর সুস্বাদু খাবার খেতেন।
আমার কথা শেষ হতেই ডাক পড়ল তাঁর সারথি শিপুজানের। বললেন, গাড়ি রেডি করো। আমাদের কয়েকজনকে বললেন চল। তাঁর পরনে ছিল সাদা পা-জামা এবং পাঞ্জাবি। গাড়িতে উঠে শিপুজানকে বললেন, ‘বারাসাত কলোনি মোড় চলো।’ সেখানে তৃপ্তি সহকারে আমরা সবাই খেলাম। প্রদ্যুতদা বাড়ির জন্য ঝুড়ি ভর্তি সিঙ্গারা, কচুরি এবং মিষ্টি নিলেন। নামার সময়ে আমার হাতে বাড়ির জন্য একটা প্যাকেট ধরিয়ে দিলেন।
প্রবল বর্ষার দিনে অফিসে গোবিন্দভোগ চাল এবং সোনা মুগ ডালের সমন্বয়ে খিচুরির ব্যবস্থা করতেই হত। সঙ্গে থাকত ইলিশ মাছ ভাজা।
জর্জ টেলিগ্রাফ ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের কর্মীদের প্রাণ দিয়ে ভালবাসতেন। এ প্রসঙ্গে একটা ঘটনা বলছি। সেদিনটা ছিল সোমবার। সকালে খবর পেলেন যে অফিসের কর্মী অমর ম্যালেরিয়া রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত হয়েছেন। প্রতিদিন সকালে অমর ফাইল-কাগজপত্র সই করাতেন। সোমবারে অমরের অবর্তমানে অন্য একজন কর্মী যখন সই করাবার জন্য ফাইল-পত্র নিয়ে হাজির হলেন, কলম হাতে প্রদ্যুতদা কেঁদে ফেললেন, বললেন, ‘না, আজ আমি সই করব না। আজ জর্জ টেলিগ্রাফের সব সেন্টারে ছুটি।’ একজন সাধারণ কর্মীর প্রতিও এতটাই মমতা ছিল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের রেজিস্ট্রারের। আই এফ এ - সচিব হওয়ার ক্ষেত্রে মেজদাদা বিশ্বনাথ দত্ত-র অনুগামীদের রীতিমতো চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ভোটে জিতেছিলেন। আইএফএ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে লড়াই হয়েছিল ঠিকই, তার কোনও প্রভাব পরিবারে পড়েনি। বিশুদা যখন অফিসে আসতেন চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতেন। এরকমই একদিন ৪বি অপূর্ব মিত্র রোডে বিশ্বনাথ দত্ত আসছেন খবর পেয়ে যখন চেয়ার ছেড়ে নেমে আসছেন, বিশুদা একটু মজা করেই বলেছিলেন, ‘বেশি বাড় বেড় না।’ একটু হেসে ছোট ভাই প্রদ্যুত দত্ত জবাব দিয়েছিলেন, ‘বৃদ্ধ শাহজাহান বন্দি করে রাখব।’ প্রথমবার নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর বিশ্বনাথ দত্ত-র পার্ক সার্কাসের বাড়িতে পুত্র জয়কে (অনির্বাণ) কোলে নিয়ে হাজির হয়েছিলেন ছোট ভাই। বিশুদার কোলে জয়কে তুলে দিয়ে বলেছিলেন, ‘ইলেকশন, ইলেকশন। নাথিং অ্যাবাভ রিলেশন।’
বড় শ্যালিকার পুত্র দীপু ছিলেন তাঁর ছায়াসঙ্গী। ছোটবেলা থেকেই দীপু থাকতেন প্রদ্যুতদা-র স্ত্রী-র কাছে। সব সময়ই দীপু তাঁর সঙ্গে থাকতেন।
বিরোধিতার জন্য সব কাজে কারও বিরোধিতা করতেন না। একটা ঘটনা বলছি। ১৯৮৮-৮৯ সালের ঘটনা। রাজ্যের তৎকালীন ক্রীড়ামন্ত্রী শিলিগুড়িতে নেহরু কাপ থেকে শুরু করে কলকাতা লিগ এবং শিল্ডের খেলা পরিচালনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে সমস্যা তৈরি করেছিলেন। কিছু স্তাবক ক্রীড়ামন্ত্রীকে মিসগাইড করেছেন। এদিকে এরকমই কয়েকজন প্রায় প্রতিদিনই সুভাষ চক্রবর্তী সম্পর্কে মুখরোচক কিছু খবর বলতেন। তাঁদের কথা যে সবটাই সত্যি নয় বুঝেছিলেন বিচক্ষণ আইএফএ সচিব। একদিন তো রি-অ্যাক্ট করে দু-জনকে বলেছিলেন, ‘চুপ করো, সুভাষ হতে হিম্মত লাগে।’ পরবর্তীকালে ক্রীড়ামন্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক আগের মতোই মধুর ছিল। সুভাষ চক্রবর্তী একবার অসুস্থ হওয়ার পরে ছুটে গিয়েছিলেন আইএফএ সচিব।
ম্যাগাজিন করার শখ ছিল ১৯৭৭ সাল থেকে। তাঁর স্বপ্ন সফল করেছিলেন আজকাল কাগজের সম্পাদক অশোক দাশগুপ্ত। তাঁদের যৌথ উদ্যোগে খেলার কথা পত্রিকা প্রকাশিত হয় ১৯৭৮ সালে। তিন বছর রমরমিয়ে প্রকাশের পর অবশ্য বিজ্ঞাপনের অভাবে পত্রিকা ১৯৮১ সালে বন্ধ হয়ে যায়। প্রসঙ্গত ১৯৭৮ থেকে ১৯৭৯ একটা সময়ে পত্রিকা ৭০ হাজার সার্কুলেশন ছিল। পরবর্তীতে ‘মেমসাহেব’ নামে একটি পত্রিকাও শুরু হয়েছিল।
আই এফ এ সচিব হিসাবে একটা ফুটবল অ্যাকাডেমি গড়ার স্বপ্ন ছিল। মধ্যমগ্রামের কাদিহাটীতে জমিও দেখেছিলেন। পি কে ব্যানার্জির তত্ত্বাবধানে সেই অ্যাকাডেমি গড়বেন ভেবেছিলেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন সফল করতে পারলেন না। অকালেই ঝরে গেলেন।
সবসময়ই তিনি ছিলেন প্রাণখোলা একজন মানুষ। তাঁর ড্রইংরুমে হাসি ঠাট্টা করেই সময় কাটাতেন। আবার এই মানুষটিই যখন স্নানাহার সেরে আইএফএ বা ট্রেনিং ইনস্টিটিউটদের দিকে রওনা দিতেন তখন তিনি ছিলেন একেবারে অন্য একজন। পূব আকাশের দিকে প্রণাম করে গাড়িতে ওঠার পর আর কোনও হাল্কা কথা শোনা যেত না তাঁর মুখ থেকে।
হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে দিল্লিতে চিকিৎসাধীন ছিলেন। আমার ধারণা, এআইএফএফ-এর নির্বাচনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে সরে দাঁড়ানো ব্যাপারটা তাঁকে ভীষণ আঘাত দিয়েছিল। দু-তিনজন নেতা গাছে তুলে মইটা সরিয়ে নিয়েছিলেন। তবু কারও ওপর ক্ষোভ বা অভিমান প্রকাশ করেননি।
তাঁর অসুস্থতার খবর শোনার পর বিশ্বাস ছিল ঠিক সুস্থ হয়েই ঘরে ফিরবেন।ভাগ্য বলেও একটা কথা থাকে। এই ব্যাপারে ভাগ্য সহায়ক ছিল না।
তাঁর শেষ যাত্রায় আমিও সঙ্গী ছিলাম। প্রায় সহস্রাধিক মানুষ তাঁর শেষ যাত্রায় সঙ্গী ছিলেন। তখন মনে হচ্ছিল মাথা থেকে ছাদটা সরে গেল। আর তিনি যেন আবার বলছেন ‘কেমন দিলাম।’