যথার্থই একজন টিমম্যান

শতদল গুপ্ত

(প্রাক্তন কর্মকর্তা, জর্জ টেলিগ্রাফ)

১৯৭৫ সালে ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের নির্বাচনে হেরে গিয়েছিলেন অজয় শ্রীমানী, নিশীথ ঘোষের দল। আমরা সেই নির্বাচনে শ্রীমানীদার সঙ্গে ছিলাম। নির্বাচনের আগেই বিশুদা আমাদের আগাম সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘তোমরা জিততে পারবে না।’ পরবর্তীতে বিশুদার কথাই মিলে গিয়েছিল। ময়দানে আমার পরিচিতি বিশুদা-র (বিশ্বনাথ দত্ত) অনুগামী হিসাবে। জীবনদা (চক্রবর্তী), পল্টুদা (দাস) বিশুদার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। জর্জ টেলিগ্রাফের তখন (১৯৭৫) সচিব প্রদ্যুৎদা। ক্লাব পরিচালনার ক্ষেত্রে তাঁর পাশে থাকার জন্য কিছু কর্মী দরকার ছিল, বিশেষ করে তখন যাঁরা ময়দানে আসতেন। বিশুদা বিচক্ষণ প্রশাসক। এ ব্যাপারে তাঁর নজর পড়ল আমাদের দিকে। আমরা অর্থে আমি, পুঁটে, বাবলু। পরবর্তীতে আদিত্য। ১৯৭৫ সাল থেকেই জর্র্জ টেলিগ্রাফ স্পোর্টস ক্লাবের পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রদ্যুতদার সঙ্গে পথ চলা শুরু হল আমাদের। প্রথম দেখার দিনটা আজও চোখের সামনে ভাসে।

সেদিন তিনি আসবেন বলে আমরাও বিকালে জর্জ তাঁবুতে হাজির ছিলাম। দেখলাম গাড়ি থেকে নেমে দীর্ঘকায় একজন ভদ্রলোক এগিয়ে আসছেন জর্জ তাঁবুর দিকে। তাঁবুতে প্রবেশ পথের গেটটা একটু নীচু বলে মাথা নীচু করেই তিনি ঢুকলেন। লক্ষ করলাম একটু টেনে হাঁটছেন। পুঁটেকে বললাম হাঁটাটা কেমন একটু অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে না! পুঁটেও আমার কথায় সায় দিয়েছিল। পরে জেনেছিলাম শিয়ালদার কাছে ট্রাম লাইনে পড়ে গিয়ে তাঁর একটা পা জখম হওয়ার জন্য বাদ দিতে হয়েছিল। পরে পুনেতে গিয়ে কাঠের পা লাগানো হলেও কৃত্রিম পায়ে হাঁটতে একটু জড়তা থাকতই।

এতবড় একটা দুর্ঘটনার পরেও প্রাণশক্তিকে ভরপুর ছিলেন প্রদ্যুতদা। একটানা ২০ বছর জর্জ টেলিগ্রাফ ক্লাব সামলেছেন। ৯ বছর আইএফএ-তে গুরু দায়িত্ব পালন করেছেন। এতটাই মনের জোর, দৃঢ়তা ছিল তাঁর মধ্যে।

বিকেলে প্রায় প্রতিদিনই ক্লাবে আসতেন। সব সময়ই হাসিঠাট্টা করে সবাইকে মাতিয়ে রাখতেন। আমাদের সঙ্গে মাঝে মধ্যে ক্যারম খেলতেন। সকালে ভবানীপুর মাঠে প্রায়ই ক্লাবের প্র্যাকটিসেও হাজির থাকতেন। জর্জ তাঁবু সকালে-বিকালে গমগম করত। সেই সময়ে পয়লা বৈশাখ জর্জের বারপূজোতে বিশিষ্টরা হাজির থাকতেন।

প্রদ্যুতদার বৈশিষ্ট্য ছিল তিনি আড়ালে থেকে ক্লাব চালাতেন না। আমাদের সঙ্গে তিনি সামনে থেকেই পরিচালনা করতেন। দলগঠনের সময় সব সময়ই সঙ্গে থাকতেন। ফুটবলারদের বাড়িতে হাজির হতেন। নিজেই কথা বলতেন।

কোনও ফুটবলার ভাল খেলছে খবর পেলে সেই ফুটবলারের খেলা দেখতে হাজির হতেন। তারপর পছন্দ হলে তাকে টার্গেট করতেন। সেই ফুটবলারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার জন্য আমাদের নির্দেশ দিতেন। যেমন মহম্মদ মুকিম।

তিনি ছিলেন যথার্থই একজন টিমম্যান। বাইরে যখন ক্লাব খেলতে যেত সঙ্গে যেতেন। দলগড়ার কাজে সক্রিয়ভাবে থাকলেও মাঠে প্রথম একাদশ বাছার ক্ষেত্রে কোচের উপর নিজের পছন্দ বা অপছন্দ চাপিয়ে দিতেন না। তাঁর সময়ে ল্যাংচা মিত্র থেকে শান্ত মিত্র, সুভাষ ভৌমিক বিভিন্ন সময়ে দলের দায়িত্ব সামলেছেন। কখনো-সখনো হয়তো দু-একটা ক্ষেত্রে পরিবর্তনের জন্য প্রস্তাব দিতেন। কিন্তু সেক্ষেত্রেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারে স্বাধীনতা ছিল কোচের। পাশাপাশি ফুটবলারদের অত্যন্ত স্নেহ করতেন। টাকা পয়সা দেওয়ার ব্যাপারে যোগ্যতা অনুযায়ী দাবি মেটাতেন। কখনও বঞ্চিত করতেন না। কয়েকজন ফুটবলার যেমন মহম্মদ মুকিম, বিপ্লব মজুমদারের সঙ্গে কখনও আর্থিক চুক্তি হত না। কারণ, ওরা জানতেন প্রদ্যুতদা ঠকাবেন না।

১৯৭৬ সালে কলকাতা লিগে এবং আইএফএ শিল্ডে মোহনবাগানের বিপক্ষে উজ্জীবিত ফুটবল খেলেছিল জর্জ টেলিগ্রাফ। দুটি ক্ষেত্রেই প্রেরণাদাতা ছিলেন প্রদ্যুতদা। গোটা দলটাই দু-দিন ছিল টগবগে মেজাজে। ১৯৭৮ সালে সব ম্যাচে জিতে কলকাতা লিগ চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি মোহনবাগান। শেষ ম্যাচে রুখে দাঁড়িয়েছিল জর্জ টেলিগ্রাফ।

১৯৭৯ সালে ৩-৩ গোলে ম্যাচ অমীমাংসিত ছিল ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে। বেশ কয়েকটি ট্রফিও জিতেছিলাম ১৯৭৭ থেকে। দার্জিলিং গোল্ড কাপ, পদ্মজং ট্রফি, সিকিম গভর্নর্স কাপ। ১৯৮৪ সালে সঞ্জয় গান্ধী গোল্ড কাপে রানার্স হয়েছিল জর্জ টেলিগ্রাফ। চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ইস্টবেঙ্গল।

প্রদ্যুতদা সচিব থাকাকালীন ১৯৮০ সালে কলকাতা ক্রিকেট লিগে প্রথম ডিভিসনে ওঠার যোগ্যতা অর্জন করেছিল জর্জ টেলিগ্রাফ। অর্থাৎ ক্রিকেটেও নজর থাকত তাঁর। তবে প্রথম পছন্দ নিঃসন্দেহে ছিল ফুটবল।

Copyright Ⓒ Prodyutdutta.com