(‘অর্জুন’ পুরস্কার প্রাপ্ত, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রাক্তন ফুটবলার)
১৬ নভেম্বর ১৯৯৪, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তখন সাংসদ। সাংগঠনিক কাজে মমতার সঙ্গে সেদিন আমি ছিলাম বহরমপুরে। দুঃসংবাদটা প্রথমে শোনার পর বিশ্বাস করতে পারিনি।
তবে অসুস্থ হয়ে যখন দিল্লির হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন একটা আশঙ্কা তখন দানা বেঁধেছিল। পরবর্তীতে যখন শুনলাম সুস্থ হয়ে উঠছেন তখন ভেবেছিলাম বিপদটা তাহলে কেটে যাচ্ছে। কিন্তু তারপরে আচমকা এই দুঃসংবাদ বিশ্বাস করিনি।
আমার ফুটবল জীবনে প্রথম ডিভিসনের প্রথম ক্লাব জর্জ টেলিগ্রাফ। তবে সেই সময়ে ১৯৬৯ সালে জর্জ টেলিগ্রাফ স্পোর্টস ক্লাবের সচিব ছিলেন প্রদ্যুতদা-র মেজদা বিশ্বনাথ দত্ত। সেই কারণে জর্জ টেলিগ্রাফ স্পোর্টস ক্লাবের প্রতি একটা আনুগত্য তখন থেকেই ছিল।
এটা ঘটনা, প্রদ্যুতদা যখন ক্লাবের দায়িত্ব নিলেন তখন ফুটবল দলের পারফরমেন্স আশানুরূপ ছিল না। ‘জায়ান্ট কিলার’ খ্যাত জর্জ টেলিগ্রাফ সেভাবে বড় তিন ক্লাবের কাছে আতঙ্ক ছিল না। সেক্ষেত্রে জর্জ টেলিগ্রাফ আবার স্বমহিমায় ফিরতে শুরু করল প্রদ্যুত দত্তর হাত ধরে।
আমি তখন মোহনবাগানে। অকপটে স্বীকার করছি, জর্জ টেলিগ্রাফকে নিয়ে আমাদের সব সময়েই ভাবতে হত। বিশেষ করে ১৯৭৬ সালে কলকাতা লিগে এবং আই এফ এ শিল্ডে।
পরবর্তীতে ১৯৮৫ সালে আই এফ এ-র সচিব হয়েছেন। সচিব হিসাবে প্রায় ১০ বছর বিভিন্ন সময়ে তাঁকে বলিষ্ঠ ভূমিকায় দেখেছি। অনেকে বলতেন আই এফ এ-তে তাঁর সময়ে একনায়কতন্ত্র দেখা গেছে। এই ব্যাপারে আমি মনে করি তখন আই এফ এ পরিচালনার জন্য প্রবল ক্ষমতা বা হিম্মত প্রয়োজন ছিল। কারণ, যখন তিনি চেয়ারে বসেছেন তখন আই এফ এ-র আর্থিক অবস্থা ছিল সঙ্গীন। সেই সময় দৈন্যদশা থেকে তুলে আনার ক্ষেত্রে প্রদ্যুতদা-র ভূমিকা কি কেউ অস্বীকার করতে পারবেন? তাই প্রতি বছরই তিনি নির্বাচিত হয়ে সচিবের চেয়ারে বসেছেন।
দাদা প্রদীপ ব্যানার্জি এবং অনেক প্রাক্তন ফুটবলারের মুখে আই এফ এ সচিব হিসাবে পঙ্কজ গুপ্ত, এম দত্তরায়-এর বিচক্ষণতার কথা শুনেছি। পরবর্তীতে যোগ্য উত্তরসূরি হিসাবে বিশ্বনাথ দত্ত ও অশোক ঘোষকে দেখেছি। এই তালিকায় প্রবলভাবে থাকবেন প্রদ্যুতদা। তাঁকে খুব কাছে থেকে দেখেছি।
তিনি সব সময়ই বাংলার ফুটবলের উন্নতির জন্য ভেবেছেন। ক্রিকেটের যখন রমরমা শুরু হয়েছে তখন থেকেই তিনি বাংলার ফুটবলকে নিয়ে গভীরভাবে ভেবেছেন। বাংলার ফুটবলের কৌলীন্য কীভাবে আবার ফিরিয়ে আনা যায় এই ব্যাপারে আমাদের সঙ্গে আলোচনা করতেন।
আর একটা কথা বলতেই হবে তাঁর সাংগঠনিক দূরদর্শিতার ব্যাপারে। এই ব্যাপারে প্রয়োজনে কঠোর হয়েছেন, আবার সমঝোতা করেছেন। যেমন তৎকালীন ক্রীড়ামন্ত্রী সুভাষ চক্রবর্তী এবং মোহনবাগান সচিব টুটু বসুর সঙ্গে বেশ কয়েকবার মনোমালিন্য হলেও পরবর্তীতে সহজভাবে বিতর্ক মিটিয়েছেন। কারণ তিনি উপলব্ধি করেছিলেন বাংলার ফুটবলকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে এক সঙ্গে চলতে হবে। আর এই একাত্মতার ক্ষেত্রে দায়িত্ব তিনিই নিয়েছিলেন।
বাংলার মেয়েদের ফুটবল প্রথম চালু করেছিলেন আমার বৌদি, পি কে ব্যানার্জির সহধর্মিনি আরতি ব্যানার্জি ১৯৭৫ সালে। তখন অনেকেই সমালোচনা করেছিলেন, বলেছিলেন - ‘মেয়েদের ফুটবল খেলা ঠিক নয়’। তবু বৌদি পিছিয়ে যাননি। কিন্তু তাঁদের দরকার ছিল ফুটবল সংস্থায় স্বীকৃতি। এই ব্যাপারেও প্রদ্যুতদা বলিষ্ট সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ১৯৯৩ সালে আই এফ এ থেকে স্বীকৃতি পেয়েছিল মেয়েদের ফুটবল। সেই বছরেই নার্সারি ফুটবল লিগও শুরু হয়েছিল প্রদ্যুতদা-র হাত ধরেই। ১৯৭৯ সালে নার্সারি ফুটবল চালু হলেও পরবর্তীতে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারেনি। প্রদ্যুতদা ছোটদের এই ফুটবল প্রতিযোগিতা আইএফএ-তে অন্তর্ভূক্ত করেছিলেন। এখন তো দলের সংখ্যা বিশাল। আর লিগও চলছে রমরমিয়ে। অর্থাৎ আগামী দিনের কথা মাথায় রেখে তিনি নার্সারি ফুটবলে ক্লাবগুলোকে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
প্রদ্যুতদা সচিব থাকাকালীন আমাকে একবার বাংলা দলের কোচিংয়ের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘‘তোমার সাহস এবং এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতার জন্যই দায়িত্ব দিয়েছি। দলে যাদের প্রয়োজন তাদেরই নেবে। এই ব্যাপারে তোমার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।’’
প্রাক্তন ফুটবলারদের সব সময়ই যথাযোগ্য সম্মান দিয়েছেন। আর্থিক ব্যাপারে প্রদ্যুতদার অতি বড় নিন্দুকও তাঁর দিকে আঙুল তুলতে পারবেন না।
পোশাকে-আশাকে সব সময়ই তাঁকে পরিপাটী দেখেছি। পোশাক পরিধানে পরিপাটি থাকার মতো মনের দিক থেকেও তিনি ছিলেন নির্মল। বিপদে-আপদে অনেককে আর্থিক সাহায্য করেছেন বলে শুনেছি।
যেদিন তিনি ইহলোক ত্যাগ করলেন সেদিন থেকেই বাংলার ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমার মনে প্রশ্ন জেগেছিল। প্রদ্যুতদার শূন্যস্থান কি পূরণ হবে? একটা সময়ে ১৯৮৫ সালে আই এফ এ-র দুঃসময়ে তিনি হাল ধরেছিলেন। দেখতে দেখতে প্রায় ২৯ বছর কেটে গেল। কিন্তু এখনও তাঁর শূন্যস্থান পূরণ হয়নি।
বাংলার ফুটবল এখন দিশেহারা, অভিভাবকহীন। কার হাত ধরে আবার বাংলার ফুটবল ঘুরে দাঁড়াবে? প্রশ্নটা সেখানেই।