(ভাইপো)
অতীতে যেমন ভাল দিন কাটিয়েছি তেমনি খারাপ দিনও দেখেছি। ছোট কাকার (প্রদ্যুত দত্ত) থেকে আমি আট বছরের ছোট। রাজনৈতিক কারণে যখন আমাদের জর্জ টেলিগ্রাফের অচলাবস্থা শুরু হয়েছিল তখন ছোট কাকা হাল ধরেছিলেন। হাজার রকম সমস্যা। মামলাও শুরু হয়েছিল। তখন আমাদের দত্ত পরিবারের পারিবারিক ব্যবসা (জর্জ টেলিগ্রাফ ইনস্টিটিউট) বন্ধ প্রায়। সেই জায়গা থেকে ছোট কাকা লড়াই করে সব সমস্যার সমাধান করে ফের জর্জ টেলিগ্রাফ ইনস্টিটিউটকে মাথা উঁচু করে দাঁড় করিয়েছিলেন। আমাদের পিতামহ হরিপদ দত্ত জর্জ টেলিগ্রাফ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেক্ষেত্রে দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে ছোট কাকার নাম নিঃসন্দেহে বলতে পারি। ওই সময় খুব কাছ থেকে ছোট কাকার সাহস, ইতিবাচক মনোভাব এবং নিজের প্রতি সফল হওয়ার আত্মবিশ্বাস দেখেছিলাম।
তিনি সব সময় আমাদের জর্জের স্টাফদের পাশে থাকতেন। কাকা ছিলেন জর্জের রেজিস্ট্রার। একদিন হয়েছে কী, তিনি শুনলেন, স্টাফদের নির্দিষ্ট দিনে মাইনে হয়নি। ডেকে পাঠালেন আমাদের অ্যাকাউন্টেন্ট মিহিরবাবুকে। কাকা উত্তেজিত। টেবিলের কাঁচে নিজের হাতের চাপড় মেড়ে জানতে চাইলেন, ঠিক সময়ে স্টাফদের কেন মাইনে হয়নি? টেবিলের কাঁচ ভেঙে গেল। স্টাফদের জন্য এতটাই যত্নবান ছিলেন তিনি। বাইরে থেকে কাকাকে দেখলে মনে হবে রাগী মানুষ। কিন্তু তাঁর ভিতরটা আলাদা। একেবারে উল্টো। কত জনকে যে সাহায্য করেছেন। কিন্তু সাহায্য করে কাউকে বলতেন না। জীবনের ভ্যাল্যুজ গুলোকে সঠিক ভাবে মানতেন। যখন কঠোর হওয়ার প্রয়োজন তখন কঠিন হয়েছেন। আবার যখন নরম হবার প্রয়োজন তখন তাঁর মানবিক রূপটা সামনে এসেছে। এমন মানুষকে শ্রদ্ধা না করে থাকা যায় না।
কাকার ক্রিয়েটিভিটিই আমাকে বেশি করে আকর্ষণ করত। তিনি বাঁধাধরা চিন্তা ভাবনা নিয়ে কখনও কাজ করেননি। প্রকৃত অর্থেই কাকা ছিলেন খুব ভাল সংগঠক। যে ভাল সংগঠক তাঁকে যে কাজই দেওয়া হোক না কেন, সফল হবেই।
কাকার সঙ্গে আমার কৈশোর সময়টা বেশি কাটলেও আমাকে কখনও গড়ের মাঠ টানেনি। আমি বরাবর পড়াশোনা নিয়েই থাকতাম। জর্জ টেলিগ্রাফ ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে এখন একটা পদে থাকলেও একটা সময় অন্য কোম্পানিতে চাকরি করেছি। কিন্তু কাকা যখন গড়ের মাঠের লোকজনদের নিয়ে আড্ডা মারতেন, খেলাধূলার বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন তখন কিন্তু আমি সেই আড্ডায় থাকতাম। কাজেই সেই সময়কার কিছু ক্লাব কর্তাদের চিনতাম, জানতাম। পরবর্তীকালে কাকা আইএফএ-র সচিব হলেন। যথারীতি তিনি বিরাট সাফল্যও পেলেন। এই সাফল্য পেতেও ছোট কাকাকে অনেক লড়াই করতে হয়েছে। আসলে তাঁর হার না মানা ইচ্ছেটাই ছিল বড় শক্তি। সততার সঙ্গে কাজ করতেন। আজ আমার ভাবতে ভাল লাগে প্রদ্যুত দত্ত আমার ছোট কাকা। তাঁকে নিয়ে গর্ব হয়।
কাকাকে নিয়ে আমার কত স্মৃতি। লিখতে গেলে লেখার শেষ হবে না। আমরা যখন শিয়ালদার সার্পেন্টাইন লেনে থাকতাম তখন ছোট কাকার সঙ্গেই আমার সময় কেটেছে বেশি। আমাকে খুবই ভালবাসতেন। কাকা গান ভীষণ ভালবাসতেন। প্রায় তিনি গ্রামোফোন রেকর্ড কিনতেন। রেকর্ড কিনতে যাওয়ার আগে আমাকে বলতেন। মাঝে মধ্যে আমিও সঙ্গে যেতাম। একদিন বললাম, এই রেকর্ডটা ভাল হয়নি। গানটা ভাল নয়। তাই শুনে সঙ্গে সঙ্গে রেকর্ডটা ভেঙে দিলেন। এমনই মানুষ ছিলেন। কালীপুজোর সময় বাজি ফাটানোর ব্যাপার ছিল। ছোট কাকা তাঁর বন্ধু মলয়কাকাকে নিয়ে তুবড়ি বানাতেন। শিয়ালদার বাড়ির উঠোনটা বেশ বড়। সেখানে বড় বড় শিল-নোড়া দিয়ে তুবড়ির মশলা তৈরি করতেন কাকা। সে এক অদ্ভুত আয়োজন। উঠোনে খেলাও হত। শিয়ালদা থেকে ভবানীপুর গেলাম। তখনও সব একসঙ্গে থাকতাম। ভবানীপুরের বাড়িটা যখন সংস্করণের জন্য কাজ শুরু হল তখন নিজের নিজের মতো করে আলাদা বাড়ির ব্যবস্থা করে থাকা শুরু হল। তখন থেকেই ছোট কাকার সঙ্গে যোগাযোগটা একটু কমে গেল। কাকাও ক্রীড়া প্রশাসক হিসেবে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। তবুও আমি মাঝে মধ্যে কাকার কাছে চলে যেতাম। ফিরে পেতাম আগের মতোই কাকার স্নেহ, ভালবাসা, পরামর্শ। আজও মিস করি। মিস করি আমার প্রিয় ছোট কাকাকে।