(প্রাক্তন খ্যাতনামা ফুটবলার)
১৯৭৫-১৯৭৭ - একটানা তিন বছর ইস্টবেঙ্গল দলে ছিলাম। কিন্তু সেভাবে নিয়মিত সুযোগ পাইনি। তবে ১৯৭৭ সালে সোভিয়েত রাশিয়ার শক্তিশালী পাখতাকোর দলের বিপক্ষে তৃতীয় হাফ ব্যাক হিসাবে নজর কাড়লেও পরবর্তীতে তেমন সুযোগ পাইনি। স্বভাবতই ১৯৭৮ সালে অন্যরকম ভাবতে হয়েছিল। তবে সেভাবে কারও সঙ্গে চূড়ান্ত কোনও কথা হয়নি।
১৯৭৮ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে যাদবপুরে অরুণাচল সঙ্ঘের উদ্যানে অল ইন্ডিয়া ব্যাডমিন্টন টুর্নামেন্ট প্রতিযোগিতা হয়েছিল। সেই টুর্নামেন্ট পরিচালনায় আমিও জড়িত ছিলাম। সেই সময় একদিন সন্ধ্যেবেলা অরুণাচল সঙ্ঘ মাঠে হাজির হলেন জর্জ টেলিগ্রাফ ক্লাবের তৎকালীন সচিব প্রদ্যুত কুমার দত্ত। দীর্ঘকায়, চোখেমুখে প্রবল ব্যক্তিত্বের ছাপ। আমাকে জর্জ টেলিগ্রাফ ক্লাবে খেলার প্রস্তাব দিলেও তখনই তাঁকে চূড়ান্ত কথা দিতে পারিনি। কারণ এরিয়ান ক্লাব থেকে প্রস্তাব এসেছিল। প্রসঙ্গত এরিয়ান ক্লাব থেকেই ১৯৭৪ সালে জাতীয় ফুটবল সন্তোষ ট্রফিতে নিয়মিত সুযোগ পেয়েছিলাম। তাই প্রথম দিনই কথা দিতে পারিনি। পরবর্তীতে প্রদ্যুতদা আবার যখন হাজির হলেন তখন আর তাঁকে ফেরাতে পারিনি।
উচ্চশিক্ষিত, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এই মানুষটির কথার মধ্যে কোনও তঞ্চকতা ছিল না।
১৯৭৮ সালে জর্জ টেলিগ্রাফ দল যথেষ্ঠ শক্তিশালী ছিল। গোলে অমিত গুহ, রক্ষণে রমেন ভট্টাচার্য, বিভু চক্রবর্তী, সঞ্জীব চৌধুরি, অনিরুদ্ধ চ্যাটার্জি। মাঝমাঠে তপন বসু, রবী রায়, আক্রমণে বাদল ভট্টাচার্য, বিভাস সরকার, শিবব্রত নাথ। সবমিলিয়ে জুনিয়র সিনিয়র মিলিয়ে একটা ‘কমপ্যাক্ট’ দল। যাদের মধ্যে রমেন, শিবব্রত, তপন এবং আমার বড় দলে খেলার অভিজ্ঞতা ছিল। এমন সব ফুটবলারদের নিয়ে দল গঠন করেছিলেন যাদের মধ্যে বড় দলে খেলার আগ্রহ প্রবল ছিল। এককথায় দল গঠনের ক্ষেত্রে তিনি বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছিলেন। আর একটা ‘প্লাস পয়েন্ট’ ছিল তাঁর কোচ নির্বাচন। দু-বছর আগে থেকেই জর্জের কোচ ছিলেন প্রাক্তন খ্যাতনামা ফুটবলার শান্ত মিত্র। একটা দলকে কীভাবে সঙ্ঘবদ্ধ করতে হয় তিনি জানতেন। এককথায় ম্যান ম্যানেজমেন্টের ব্যাপারে তিনি পারদর্শী ছিলেন।
সে বছর মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল তো বটেই, মহমেডান ক্লাবও যথেষ্ঠ শক্তিশালী ছিল। লিগে আমরা চতুর্থ স্থান অর্জন করেছিলাম। তবে নিঃসন্দেহে সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল মোহনবাগান। শিবাজী ব্যানার্জি, সুধীর কর্মকার, সুব্রত ভট্টাচার্য, প্রদীপ চৌধুরী, শ্যামল ব্যানার্জি, দিলীপ পালিত, গৌতম সরকার, প্রসূন ব্যানার্জি। সুভাষ ভৌমিক, আকবর, হাবিব, শ্যাম থাপা, মানস ভট্টাচার্য, বিদেশ বসু - তালিকাটা দেখে বুঝতেই পারছেন কতটা শক্তিশালী ছিল সেই দল।
আমাদের কৃতিত্ব ওরকম একটা শক্তিশালী দলের ‘জয়রথ’ থেমে গিয়েছিল জর্জ টেলিগ্রাফের কাছে। সেই ম্যাচটা ছিল লিগে মোহনবাগানের শেষ ম্যাচ। তার আগে ইস্টবেঙ্গল, মহমেডান এবং বাকি সব দলের বিপক্ষে জিতে কোনও পয়েন্ট না হারিয়ে লিগ ছিল মোহনবাগানের দখলে। শেষ ম্যাচে মোহনবাগানের লক্ষ্য একটাই ছিল সর্বপ্রথম সব ম্যাচ জিতে লিগ জয়। যে রেকর্ড ভারতীয় দল হিসাবে একমাত্র ইস্টবেঙ্গলের দখলে ছিল। স্বভাবতই লিগের শেষ ম্যাচ জর্জ টেলিগ্রাফের বিপক্ষে অত্যন্ত জরুরি ছিল মোহনবাগানের কাছে। গোটা মোহনবাগান দলটাই তখন টগবগে অবস্থায়। অন্যদিকে আমাদের কাছে হারানোর কিছু ছিল না, আবার কিছু পাওয়ারও ছিল না। তবু একটা চ্যালেঞ্জ সবার মধ্যেই ছিল, তাহল মোহনবাগানকে রুখে দেওয়া। আর এই ব্যাপারে গোটা দলকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন প্রদ্যুৎদা। আসলে তাঁর মধ্যে সব সময়ই ছিল একটা চ্যালেঞ্জিং মনোভাব। এই চ্যালেঞ্জিং মনোভাব বেশি করে দেখা যেত বড় তিন দলের বিপক্ষে। বরাবরই ‘জায়ান্ট কিলার’ হিসাবে ভারতীয় ফুটবলে সুনাম জর্জ টেলিগ্রাফের। সেই ধারাটা বজায় রাখতে তিনি ফুটবলারদের উদ্ধুদ্ধ করতেন। ম্যাচে মোহনবাগান প্রথমার্ধে ১-০ গোলে এগিয়ে গিয়েছিল। দ্বিতীয়ার্ধে আমি গোলটা শোধ করেছিলাম। প্রায় ৪০ গজ দূর থেকে শটে বল জালে পাঠিয়েছিলাম। নিঃসন্দেহে জর্জ টেলিগ্রাফের জার্সি গায়ে আমার ফুটবল মরশুমের সেরা ম্যাচ। আমার ফুটবলজীবনে একটা আনন্দের দিন। পাশাপাশি গর্বের ব্যাপারও হল সেদিন পুলিশি পাহারায় জর্জের তাঁবুতে ফিরতে হয়েছিল। সব ম্যাচ জিতে লিগ খেতাব না পাওয়ার যন্ত্রণায় মোহনবাগান সমর্থকরা তখন আমাদের টার্গেট করেছিল। সেই অবস্থায় গোটা দলকে কড়া পুলিশি পাহারায় লালবাজারে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি কড়া পুলিশি পাহাড়া ছিল জর্জ টেলিগ্রাফ তাঁবুতে। ‘জায়ান্ট কিলার’ তকমাটা আরও একবার প্রমাণ করতে পারার জন্য সেদিন আলাদা একটা তৃপ্তি পেয়েছিলাম। নিজের হাতে তিনি যেমন দল গড়তেন পাশাপাশি ফুটবলারদের যাতে কোনও অসুবিধা না হয় সেদিকেও যত্নবান ছিলেন। ফুটবলারদের স্নেহ করতেন। প্রবল ব্যক্তিত্বের গুণে ফুটবলারদের সমীহ আদায় করে নিতে পেরেছেন।