একবারই প্রদ্যুতদার কথা শুনিনি

শিশির ঘোষ

(আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রাক্তন ফুটবলার)

বাংলা ফুটবলের সফল ক্রীড়া প্রশাসকের নামগুলি বলতে হলে প্রথমেই প্রদ্যুত দত্তর নামটাই আগে আসবে। লম্বা, রাশভারী মানুষ। বাজখাই গলা। বাইরে থেকে প্রথম যখন দেখেছিলাম সেদিন মনে হয়েছিল, মানুষটা গম্ভীর, কঠিন। পরে বুঝেছিলাম তাঁর মনটা ভীষণ ভাল। ফুটবলারদের কাছের মানুষ আর ফুটবলের কাজের মানুষ ছিলেন। তাঁর নামের পাশে দক্ষ প্রশাসক, ভাল ফুটবল সংগঠক - এই শব্দগুলি অতি পরিচিত। এক কথায় প্রদ্যুতদাকে মূল্যায়ন করা যাবে না।

বাংলা ফুটবলের সফল ক্রীড়া প্রশাসকের নামগুলি বলতে হলে প্রথমেই প্রদ্যুত দত্তর নামটাই আগে আসবে। লম্বা, রাশভারী মানুষ। বাজখাই গলা। বাইরে থেকে প্রথম যখন দেখেছিলাম সেদিন মনে হয়েছিল, মানুষটা গম্ভীর, কঠিন। পরে বুঝেছিলাম তাঁর মনটা ভীষণ ভাল। ফুটবলারদের কাছের মানুষ আর ফুটবলের কাজের মানুষ ছিলেন। তাঁর নামের পাশে দক্ষ প্রশাসক, ভাল ফুটবল সংগঠক - এই শব্দগুলি অতি পরিচিত। এক কথায় প্রদ্যুতদাকে মূল্যায়ন করা যাবে না।

আমার কালীঘাটে যাতায়াত ছিল। অনুপদার কাছে গিয়ে মাঝে মধ্যে ক্যারম খেলতে যেতাম। যাইহোক, আমাকে যখন মমতাদির সঙ্গে দেখা করতে বললেন তখন তিনি কেন্দ্রীয় ক্রীড়ামন্ত্রী। আমি তাঁর বাড়িতে যেতেই মমতাদি বলে উঠলেন, ‘‘ও তুমি এসেছ। বসো।’’ তাঁর কথা শুনেই বুঝে গেলাম তাঁকে আমার আসার ব্যাপারে প্রদ্যুতদা বলে রেখেছিলেন। মমতাদি প্রদ্যুতদাকে বড়দার মতো শ্রদ্ধা করতেন, এটা আমি জানতাম। মমতাদি এবার জিজ্ঞাসা করলেন, ‘‘তুমি চিমাকে মেরেছ?’’ আমি ভাবলাম, মিথ্যে বললে অনেক মিথ্যে বলতে হবে। তার থেকে সত্যি কথাটা বলেই দিই। আমি স্বীকার করে বললাম, হ্যাঁ, মেরেছি। শুনে মমতাদি বললেন, ‘‘কতবার মেরেছ? আমি বললাম, ‘‘একবার।’’ শুনেই হাসতে হাসতে মমতাদি বললেন, ‘‘মাত্র একবার মেরেছ? ঠিক আছে বাড়ি যাও। মন দিয়ে প্র্যাকটিস করো।’’

প্রদ্যুতদা কেন মমতাদির কাছে দেখা করতে বললেন সেটাই প্রথমে বুঝতে পারছিলাম না। মারামারি করেছি লিগের খেলায়। সিদ্ধান্ত নেবে তো আইএফএ। তাহলে মমতাদির কাছে কেন? এই প্রশ্ন করার সাহস প্রদ্যুতদাকে দেখাতে পারিনি। তবে আমার পরে মনে হয়েছিল, আমি তখন টপ ফর্মে। এই চিমার সঙ্গে মারামারির ঘটনার ফলে যাতে আমি ভারতীয় দল থেকে বাদ না যাই তার জন্য হয়তো কেন্দ্রীয় ক্রীড়ামন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিকে ছুঁয়ে রাখা। এটাই হয়তো প্রদ্যুতদা চেয়েছিলেন।

যাইহোক, মমতাদির সঙ্গে সাক্ষাতের কয়েকদিন পর গোলপার্কের কাছে ‘হাওড়া মোটরসে’র অন্যতম কর্তা এবং হাওড়া ইউনিয়নের বর্তমান সচিব ইন্দ্রনাথ দের বাড়িতে আরবিট্রেশন বসল। আমি, চিমা গেলাম। দুজনের বক্তব্য শোনার পর পরের দিন আইএফএতে আমাদের উপস্থিত থাকতে বলা হল। নির্দিষ্ট সময়ে আমরা পৌঁছে গেলাম। প্রদ্যুতদা সহ আইএফএ-র পদাধিকারীরা বসে আছেন। সামনে দুটি চেয়ার আমাদের জন্য। চেয়ারে বসার পর ফিসফ্রাই, সন্দেশ খেতে দেওয়া হল। আমরা ভুল স্বীকার করে ভবিষ্যতে আর এমনটা করব না তা জানিয়ে দিলাম। প্রদ্যুতদার নির্দেশ মেনে একজন গোলাপি রংয়ের একটি ভাউচার আমাদের ধরানো হল। তাতে দেখলাম আমাদের দুজনকে ৭৮৬ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। কাগজটি আমাদের হাতে ধরিয়ে দেওয়ার পর প্রদ্যুতদা হাসতে হাসতে মজা করে বলেছিলেন ‘‘শোন, তোদের এই জরিমানার টাকা আইএফএ নেবে না। আজকের মিটিংয়ে যে ফিস ফ্রাই, সন্দেশ খেলাম তার দামটা এই টাকায় মেটানো হবে। যা, আর মারামারি করিস না। মন দিয়ে এবার ফুটবলটা খেল।’’ মাঠে ফেরার অনুমতি পেয়ে সেদিন খুব খুশি হয়েছিলাম। প্রদ্যুতদাকে প্রণাম করে বেরিয়ে এলাম। কদিন পরেই ডিসিএম ট্রফি। শাস্তি কাটিয়ে ডিসিএমের প্রথম ম্যাচ জেসিটির বিরুদ্ধে আমার করা একমাত্র গোলে সেই দিন মোহনবাগান জিতেছিল।

১৯৮৮ সাল। আমি তখন টপ ফর্মে। সন্তোষ ট্রফির জন্য বাংলা দল বাছা হবে। সেই বছর বাংলা দলের কোচ হয়েছিলেন প্রসূন ব্যানার্জি। চূড়ান্ত দলে আমার জায়গা হল না। মনটা খারাপ হয়ে গেল। ফর্মে থাকা সত্বেও বাংলা দলে আমাকে নেওয়া হল না। সেইবার বাংলা কোনও রকমে সেমিফাইনালে উঠেছিল। তখন সবাই নাকি বলেছিল দলে আমাকে প্রয়োজন। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে কোচ প্রসূনদা আমাকে তাড়াতাড়ি দলের সঙ্গে যোগ দিতে বললেন। আমি সঙ্গে সঙ্গে বলে দিয়েছিলাম, ‘‘আমি যাব না।’’ আমার সিদ্ধান্তের খবর পৌঁছে যায় প্রদ্যুতদার কাছে। তখন মোবাইল ছিল না। বাড়িতে ফোন করে বলেছিলেন, ‘‘বাংলা চ্যাম্পিয়ন হোক তুই চাস না? কেন এমন করছিস। যা খেলে চ্যাম্পিয়ন হয়ে ফিরে আয়।’’ আমি সেদিন বলেছিলাম, ‘‘বাংলা চ্যাম্পিয়ন হোক আমি চাই। কিন্তু আমি খেলতে যাব না। প্রত্যেকের আত্মসম্মান আছে। কোচ দল গড়ার সময় সেই সম্মান দেননি। এখন তো আমি যাব না।’’ আমার উত্তর শোনার পর প্রদ্যুতদা আর কোনও কথা বলেননি। সেই বছর বাংলা হেরেই ফিরেছিল। আমার ফুটবল জীবনে এই একবারই শুধু প্রদ্যুতদার কথা শুনিনি।

পরের বছর গৌহাটিতে সন্তোষ ট্রফির আসর বসেছিল। দল রওনা হওয়ার আগে বেঙ্গল ক্লাবে বাংলার ফুটবলারদের একটা পার্টি দিয়েছিলেন প্রদ্যুতদা। আমাকে ডেকে সেদিন জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘‘কি রে চ্যাম্পিয়ন হতে পারবি?’’ প্রদ্যুতদাকে বলেছিলাম, ‘‘চিন্তা করবেন না। চ্যাম্পিয়ন হয়েই ফিরব।’’ আমরা চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম।

এই প্রদ্যুতদার জন্যই আমি সন্তোষ ট্রফির অধিনায়কও হয়েছিলাম। সম্ভবত ১৯৯৩ সাল। আইএফএ-এর শতবর্ষ। আমি তখন সিনিয়র। ধারাবাহিক পারফরমেন্সের ফলে সেই বছর আমারই অধিনায়ক হওয়ার কথা। হঠাৎ শুনলাম, আইএফএ-এর সভাপতি জাস্টিস অজিত সেনগুপ্ত বাংলার অধিনায়ক হিসেবে কৃশানুর (দে) নাম প্রস্তাব করে রেখেছেন। কৃশানু না হলে তনুময় বসু হবে অধিনায়ক। সেই বছর বাংলা দলের কোচ ছিলেন নঈমদা। মনটা খারাপ হয়ে গেল। সতীর্থদের জানিয়ে রেখেছিলাম, অধিনায়ক না হলে দলের সঙ্গে যাবই না। ওই সময় আমার বোনের বিয়েও। সতীর্থদের যাব না বললেও আমি ব্যাগ কিন্তু গুছিয়ে রেখেছিলাম। প্রদ্যুতদার ফোন আসবেই তা ধরেই নিয়েছিলাম। ঠিক তাই হল। বাড়িতে ফোন করে প্রদ্যুতদা আমাকে বলে দিলেন, ‘‘শুনলাম তুই নাকি খেলতে যাবি না। শোন, নির্দিষ্ট সময়ে হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে যাবি। আমি কোনও কথা শুনতে চাই না।’’ স্টেশনে পৌঁছে গেলাম। শুনলাম তখনও টিম লিস্ট তৈরি হয়নি। কিন্তু আমি মনে মনে ঠিক করে নিয়েছিলাম, যদি আমাকে ক্যাপ্টেন না করা হয় তাহলে ট্রেনেই উঠব না। বাড়ি ফিরে আসব। তাতে যা হয় হবে। অজিত সেনগুপ্ত জাস্টিস হতে পারেন। কিন্তু আমার প্রাপ্য সম্মান আটকে রাখার অধিকার অজিতবাবুর নেই। সবাই ট্রেনে উঠে পড়েছে। আমি উঠছি না। ট্রেন ছাড়ার ৩০ মিনিট আগে আইএইফএ-র এক কর্তার হাত দিয়ে প্রদ্যুতদা সন্তোষ ট্রফির জন্য চূড়ান্ত বাংলা দলের লিস্ট পাঠালেন। লিস্ট দেখলাম আমার নামের পাশে ক্যাপ্টেন লেখা। আর দেরি করিনি। ট্রেনে উঠে পড়েছিলাম। ফিরে এসেছিলাম চ্যাম্পিয়ন হয়েই।

আজ সত্যিই প্রদ্যুতদাকে মিস করি। উনি চলে যাওয়ার পর ফুটবলারদের কাছের করে নেওয়ার মানসিকতার সচিব আমি দেখিনি। প্রদ্যুত দত্ত কেমন মানুষ ছিলেন? সচিব কেমন ছিলেন? এই প্রজন্ম জানেই না। আমাদের দেশে মানুষের মৃত্যুর পর তাঁর কাজের মূল্যায়ন করা হয়। আমরা যারা প্রদ্যুতদার সংস্পর্শে এসেছি তারা জানি তিনি ফুটবলের, ফুটবলারদের কাছে কী ছিলেন। তাঁকে নিয়ে যে বইটি প্রকাশ হচ্ছে তা আরও অনেক আগে প্রকাশ করা উচিত ছিল। তবু, দেরিতে হলেও প্রদ্যুতদাকে নিয়ে বই হচ্ছে এটাই ভাল লাগছে।

Copyright Ⓒ Prodyutdutta.com