এক পায়ের খেলোয়াড়

অরূপ বসু

(বিশিষ্ট ক্রীড়া সাংবাদিক)

তখন নেহরু গোল্ড কাপ গর্ব করার মতো একটা আন্তর্জাতিক ফুটবল প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতায় বিশ্বের বহু নামকরা ফুটবল দেশ তাদের সম্ভাব্য ফুটবল তারকাদের নিয়ে খেলতে এসেছে। বিলার্ডো বিশ্ব কাপের সম্ভাব্য আর্জেন্টিনার ফুটবল দলকে নিয়ে খেলতে এসেছেন। তখন নেহরু গোল্ড কাপ মানে শুধু এশিয়ার প্রথম সারির জাতীয় দলের কাছে একটা আকর্ষণ নয়, আকর্ষণ ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর কাছে। নেহরু গোল্ড কাপে আয়োজনের জন্য ভারতে রাজ্য ফুটবল সংস্থাগুলো ‘অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশন-এর কাছে আবেদন জানাত। সেইভাবে সেবার নেহরু গোল্ড কাপ আয়োজন করার পালা বাংলার ইন্ডিয়ান ফুটবল অ্যাসোশিয়েশনের (আইএফএ)। টুর্নামেন্টের বেশ কয়েক মাস বাকি। পশ্চিমবঙ্গের খেলাধুলার পরিকাঠামো যা তাতে কলকাতা ছাড়া আর কোথাও নেহরু গোল্ড কাপের মতো আন্তর্জাতিক

খ্যাতিসম্পন্ন ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজন করার কথা ভাবাই যায় না।

নেহরু গোল্ড কাপ শুরু হয়েছিল কলকাতার ইডেন উদ্যানে। তখনো যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন তৈরি হয়নি। ইডেনে তাই ফুটবল এবং ক্রিকেট দুটোরই আন্তর্জাতিক আসর বসত। এরপর যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন তৈরি হয়ে যাওয়ার পর ফুটবলের আন্তর্জাতিক আসর সল্টলেক স্টেডিয়ামেই বসতে শুরু করে। এমনকি ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান, মহামেডান-এর পারস্পরিক ম্যাচগুলো, লিগ কিংবা শিল্ডের খেলা যুবভারতী স্টডিয়ামেই হতে শুরু করে। আর তা নিয়েই ক্লাব কর্তা থেকে শুরু করে সংবাদ মাধ্যমের একটা বড় অংশের সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি হয় তৎকালীন আই এফ এ সচিব প্রদ্যুত দত্তের। যুক্তি ছিল - দর্শক ও সমর্থকদের দুর্ভোগ বাড়বে যাতায়াতের অসুবিধা। প্রথম দিকে রাজ্য পরিবহন দপ্তর এজন্য বাড়তি সরকারী বাসও দিতে চায়নি। কারণ ফুটবল মাঠের দর্শকরা বাসে উঠে সাধারণত টিকিট কাটে না। এই অভিযোগ কিংবা অজুহাতে সরকার যখন দর্শকদের জন্য বিশেষ বাসের ব্যবস্থা করছে না। এগিয়ে এলেন আইএফএ সচিব প্রদ্যুত দত্ত। সরকার বাস চালাল। দর্শকদের জন্য যাবতীয় খরচ বহন করল আইএফএ। সল্টলেক স্টেডিয়ামে ফুটবলের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আয়োজন নিয়ে শুরু থেকেই একটা অশান্তি ছিল। স্টেডিয়ামটা গড়ে উঠেছিল যতটা সরকারি খরচে তার চেয়ে অনেক বেশি সাধারণ মানুষের আর্থিক সাহায্যে। এশিয়ার বৃহত্তম স্টেডিয়ামের গড়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব তৎকালীন ক্রীড়ামন্ত্রী সুভাষ চক্রবর্তীর। স্টেডিয়াম তৈরি হওয়ার পর তা নিয়ে নানারকম অভিযোগ উঠেছে বার বার। এমনকী অমল দত্তের মতো জ্ঞানী ফুটবল কোচ মাঠের ঢাল নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন। এআইএফএফ সচিব প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সি নানা কারণে সল্টলেক স্টেডিয়ামে আন্তর্জাতিক মানের ফুটবল ম্যাচ দেওয়ার বিরোধী ছিলেন। তাঁর মতে ফুটবল ম্যাচ হবে ইডেনে কিংবা ময়দানের কোনো মাঠে। সুভাষ চক্রবর্তী একবার রেগে গিয়ে বলে ফেলেছিলেন - সাধারণ মানুষের আর্থিক সাহায্যে এশিয়ার বৃহত্তম স্টেডিয়াম গড়ে উঠেছে। রাজনৈতিক স্বার্থে মানুষের এই আবেগকে আহত করলে ময়দানে ধান চাষ করিয়ে দেব।

ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান বা মহমেডানের ম্যাচ ঘিরে মাঝে মাঝেই উত্তেজিত দর্শক সমর্থকদের মধ্যে মারামারির জেরে ধর্মতলা, বিবাদী বাগ অঞ্চলে জনজীবন বিপর্যস্ত হতো। সরকারও চাইছিল উত্তেজনার বারুদ আছে এমন ফুটবল ম্যাচ ময়দান থেকে সরিয়ে স্টেডিয়ামে নিয়ে যেতে। রাজনৈতিক বিশ্বাসের দিক থেকে প্রদ্যুত দত্ত কংগ্রেসী হলেও রাজ্য সরকারের এই ভাবনাকে যুক্তিযুক্ত মনে করতেন। তাই তিনিও ময়দান থেকে সল্টলেক স্টেডিয়ামে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ করার পক্ষপাতী ছিলেন। প্রদ্যুত দত্ত ধীরে ধীরে খেলার জগতে সব বয়সের মানুষের কাছেই প্রদ্যুতদা হয়ে উঠেছিলেন।

প্রদ্যুত দত্তর বাবা হরিপদ দত্ত-র কলকাতা শহরে বেশ কয়েকটি বাড়ি ছিল বলে শুনেছি। এখন গোটা ভারতে কারিগরি শিক্ষার খুব কদর। অথচ সদ্য স্বাধীন ভারতে জর্জ টেলিগ্রাফের মতো কারিগরি শিক্ষার পথিকৃৎ সংগঠনের কর্ণধার ছিলেন এই হরিপদ দত্ত। শিক্ষার একটা অংশ খেলাধূলো। সেটা মনে করতেন বলেই হরিপদ দত্ত জর্জ টেলিগ্রাফের মতো খেলার ক্লাব গড়ে তুলেছিলেন। শুধু তাই নয়। ময়দানে তিন বড় ক্লাবকে খেলার মাঠে কঠিন চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন। তিন বড় ক্লাবকে যে কোনও সময় রুখে দেওয়ার ক্ষমতা রাখত এই জর্জ টেলিগ্রাফ। তারা কিন্তু বাংলার গ্রাম থেকে ময়দানে খেলোয়াড় তুলে আনত। খেলার মাঠের নিয়ন্ত্রণ তিন বড় ক্লাবের হাত থেকে কেড়ে নেওয়ার যে আন্দোলন হরিপদ দত্ত শুরু করেছিলেন সার্থক উত্তরসূরি হিসেবে সেই কাজ পরবর্তীকালে করেছেন তার দুই পুত্র বিশ্বনাথ দত্ত ও প্রদ্যুত দত্ত।

অথচ প্রদ্যুতদা ছিলেন এক পায়ের খেলোয়াড়। জগতে যে কোনও ধরনের কর্মকান্ডে সাফল্য পেতে গেলে দরকার সুস্থ সবল শরীর। সুস্থ সুগভীর মন ও দৃঢ় মানসিকতা। দীর্ঘদেহী প্রদ্যুতদার সবই ছিল - একটা পা ছাড়া। সেটা ট্রাম লাইনে কাটা পড়েছিল। নিবিড় ঘনিষ্ঠতার জন্য তাঁর কাছে সেই দুর্ঘটনার গল্প শুনেছি। ছেলেবেলায় প্রচন্ড ডানপিটে ও ডাকাবুকো ছিলেন। সব ধরনের খেলাধূলোয় দারুণ আগ্রহ। ভাইবোন মিলে বড় সংসার। দুরন্ত বলেই প্রদ্যুতকে মা চোখে চোখে রাখতেন। দুপুরে শোওয়ার সময় কাছে নিয়ে ঘুমোতেন। মা ঘুমোলে প্রদ্যুত মাঝে মধ্যেই চুপি চুপি পালিয়ে যেতেন। পরে ধরা পড়ায় বাবার কাছে কঠোর শাসনের হাত থেকে বাঁচাতেন সেই মা-ই। সেদিন দুপুরেও মাকে ফাঁকি দিয়ে চুপি চুপি পালিয়ে গিয়েছিলেন। দুর্ঘটনার শাসন থেকে মা বাঁচাতে পারেননি। ঘুড়ি ধরতে গিয়ে ট্রাম লাইনে পড়ে যান। একটি পা চলে যায় ট্রামের তলায়। খেলোয়াড় হওয়া হল না। কিন্তু খেলার জগৎকে আরো বেশি করে আঁকড়ে ধরতে চাইলেন। পরবর্তী জীবনে তাতে সফলও হলেন।

এই আখ্যানের শুরু করেছিলাম নেহরু গোল্ড কাপ প্রসঙ্গ দিয়ে। আগে সেই প্রসঙ্গটা শেষ করি। কঠিন চ্যালেঞ্জ নিতে ভালবাসতেন। যা কেউ ভাবত না। সেইরকম একটি ভাবনার হাত ধরে অনেকটা পথ যেতে ভালবাসতেন। তখন দার্জিলিং পাহাড়ে গোর্খাল্যান্ড আন্দোলন ঘিরে এমন অশান্ত পরিবেশ যে সাধারণ পর্যটক তো দূরের কথা জরুরি কাজ না থাকলে কেউ উত্তরবঙ্গের দিকে পা বাড়াতেন না।

এই আখ্যানের শুরু করেছিলাম নেহরু গোল্ড কাপ প্রসঙ্গ দিয়ে। আগে সেই প্রসঙ্গটা শেষ করি। কঠিন চ্যালেঞ্জ নিতে ভালবাসতেন। যা কেউ ভাবত না। সেইরকম একটি ভাবনার হাত ধরে অনেকটা পথ যেতে ভালবাসতেন। তখন দার্জিলিং পাহাড়ে গোর্খাল্যান্ড আন্দোলন ঘিরে এমন অশান্ত পরিবেশ যে সাধারণ পর্যটক তো দূরের কথা জরুরি কাজ না থাকলে কেউ উত্তরবঙ্গের দিকে পা বাড়াতেন না।

আজকালে সিনিয়ারদের মধ্যে সরোজ চক্রবর্তী ও রতন ভট্টাচার্য শুনেই হাসতে লাগল। বলল বোকা পেয়ে একটা বড় সড় গুল মেরেছে। এসব করে রাজ্য সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করতে মাঝখান থেকে আমাদের ব্যবহার করছে। ধীমান দত্ত সব শুনে বলল না খবরটা বেশ ভাল। শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তার প্রশ্নে নেহরু গোল্ড কাপ শিলিগুড়িতে হবে কিনা সেটা পরের প্রশ্ন। ধীমানের চেষ্টায় খবরটা বেরোল। ধীমান বার বার বলল অরূপকে প্রদ্যুতদা বাজে খবর দেবেন না। তা সত্ত্বেও প্রথম পাতার এক্সক্লুসিভ খবরটা খেলার পাতায় ছোট করে ধরানো হল। এমনকী সাংবাদিকের নামও দেওয়া হল না। খবরের কাগজের পরিভাষায় যাকে বলে ‘বাইলাইন’। সেজন্য পরদিন প্রদ্যুতদাও সাধুবাদ জানিয়ে ছিলেন। সেই সোমবার থেকেই মহাকরণে ঘন ঘন মিটিং। দার্জিলিং জেলা প্রশাসনের দুই কর্তা দেবীপ্রসাদ মহাপাত্র এবং আর কে হান্ডার সঙ্গে প্রদ্যুতদার ঘন ঘন বৈঠক। তৎকালীন ক্রীড়ামন্ত্রী সুভাষ চক্রবর্তী প্রদ্যুত দত্তকে যতটা সহযোগিতা করলেন ততটাই অসহযোগিতা এসেছিল পুরমন্ত্রী অশোক ভট্টাচার্যের কাছ থেকে। শিলিগুড়িতে নেহরু গোল্ড কাপ হল। পাহাড়ে শান্তির পরিবেশ ফেরাতে রাজ্য সরকারের সুবিধা হল। কিন্তু প্রদ্যুতদার বদনাম হল আইএফএ-কে আর্থিক দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য।

যেটা বলছিলাম বাংলার খেলাধুলা মানেই কলকাতা কেন্দ্রিক কিছু উদ্যোগ। এই চিরাচরিত ভাবনাকে ভেঙে প্রদ্যুতদাই নতুন দিগন্ত খুলেছিলেন। এমনকী কলকাতার বাইরে বিশেষ করে উত্তর চব্বিশ পরগণায় শিল্ড কিংবা লিগের খেলার উদ্যোগও তিনিই প্রথম নিয়েছিলেন।

যেটা বলছিলাম বাংলার খেলাধুলা মানেই কলকাতা কেন্দ্রিক কিছু উদ্যোগ। এই চিরাচরিত ভাবনাকে ভেঙে প্রদ্যুতদাই নতুন দিগন্ত খুলেছিলেন। এমনকী কলকাতার বাইরে বিশেষ করে উত্তর চব্বিশ পরগণায় শিল্ড কিংবা লিগের খেলার উদ্যোগও তিনিই প্রথম নিয়েছিলেন।

বাংলার ফুটবলে তখন একচেটিয়া দুই কোচের দাপট - অমল দত্ত ও পি কে ব্যানার্জি। আইএফএ সচিব প্রদ্যুত দত্ত ঘরোয়া আড্ডায় নতুন কোচের কথা বলতেন। তাঁর মতে, ক্লাব ফুটবলে এই দুই কোচ থাকতে থাকতে এদের মত সাহসী, বেপরোয়া, জ্ঞানী কোনও ফুটবল কোচকে তুলে আনা দরকার। ক্লাবগুলো সমর্থকদের চাপে সেরকম নতুন কাউকে জায়গা করে দেওয়ার সাহস দেখাচ্ছে না। এক্ষেত্রে আইএফএ-র এগিয়ে আসা উচিত।

সুভাষ ভৌমিক তখন ফুটবল নিয়ে আজকালের পাতায় দারুণ লিখছেন। এমনকী বহুবারই ইষ্টবেঙ্গল, মোহনবাগান ম্যাচের আগে সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে যা লিখছেন সেটাই মিলে যাচ্ছে। কালীঘাট মন্দিরের কাছে খাঁচায় টিয়াপাখি নিয়ে একটা লোক বসে থাকত। খাঁচার সামনে অনেকগুলো খাম সাজানো। কেউ পয়সা দিয়ে তার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কিছু জানতে চাইলে খাঁচায় মালিকের ধাক্কা অনুসারে পাখিটা বেরিয়ে আসত। ঠোঁটে একটা খাম তুলে নিয়ে মালিকের হাতে তুলে দিত। খামের ভিতরে কাগজে লেখা কথাগুলো শুনে ভাগ্যান্বেষী মন্তব্য করত অনেক কিছুই মিলে যাচ্ছে। প্রদ্যুৎ দত্ত বলতেন - ভৌমিক অনেকটা ঐ টিয়া পাখির মতো। কতদিন দেখেছি অপূর্ব মিত্র রোডের ফ্ল্যাটে সুভাষ ভৌমিককে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে জানতে চাইছেন পিকে আর অমল দত্তের মধ্যে কার কী গুণ কী দোষ। এক্ষেত্রে সুভাষ ভৌমিক নিজে কোচ হলে কী করতেন? আসলে প্রদ্যুতদা সুভাষ ভৌমিককে বাংলার কোচ করার জন্য বাজিয়ে নিচ্ছেন।

অনেক দিন পর সেবার বাংলায়, কলকাতায় সন্তোষ ট্রফির আসর বসল। সুভাষ ভৌমিককে কোচ করতে গিয়ে সমস্যায় পড়লেন প্রদ্যুত দত্ত। তখন নিয়ম হয়ে গিয়েছে কোচ হতে গেলে এন আই এস ডিগ্রি বা ডিপ্লোমা থাকতে হবে। সুভাষ ভৌমিক-এর সেটা নেই। সেই ডিগ্রির অধিকারী হতে সুভাষ ভৌমিকের যথেষ্ট অনীহা আছে। সমস্যার সমাধানে প্রদ্যুতদা একটা পথ বের করলেন। কোচ নিমাই গোস্বামী, টেকনিক্যাল ডিরেক্টর করলেন অরুণ সিনহাকে। ম্যানেজার সুভাষ ভৌমিক। বাস্তবে দেখা গেল মাঠের ধারে চেয়ার নিয়ে বসে আছেন অরুণ সিনহা। কোচের যাবতীয় দায়িত্ব পালন করছেন সুভাষ ভৌমিক। বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য সেবার বাংলার অধিনায়ক। তাঁর খেলা কোচের পছন্দ হচ্ছিল না। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে বিশ্বজিৎকে বসিয়ে দিয়ে অশান্তিতে জড়িয়ে ছিলেন। সেটা সম্ভব হয়েছিল সুভাষ ভৌমিকের যাবতীয় কাজে প্রদ্যুত দত্তের পূর্ণ সমর্থন ছিল। কেরলের পালাকাড়ে সন্তোষ ট্রফির আসর। জাতীয় ফুটবলে তখন বাইশ বছরের কম বয়সি ফুটবলারদের খেলানোর নিয়ম চালু হয়েছে। বাংলা দলে বয়স লুকিয়ে কুলজিৎ সিংকে খেলানো হয়েছিল। কলকাতা থেকে প্রদ্যুতদার নির্দেশ গিয়েছিল -- কুলজিতের বয়সের নথিতে গোলমাল থাকলে খেলাবেন না। কেরল দলে সেবারই আই এম বিজয়নের উত্থান। কেরলে দেখেছি সুভাষ ভৌমিকের খুব ভক্ত আছে। অনেক পুরানো খেলোয়াড় তাঁর সঙ্গে কুশল বিনিময় করছিল। কর্মজীবনে সুভাষ ভৌমিক তখন জর্জ টেলিগ্রাফের অতি উচ্চপদস্থ কর্মী। ক্লাব ফুটবলে সুভাষ ভৌমিকের সাফল্য দেখে খুবই আনন্দ পেতেন প্রদ্যুত দত্ত।

ক্যানসারে আক্রান্ত শিশুপুত্রের মৃত্যুর পর সুভাষ ভৌমিক তখন সব দিক থেকেই বিপর্যস্ত। প্রদ্যুতদা সুভাষ ভৌমিককে জর্জের কোচ করলেন। জর্জ ইনস্টিটিউটের উচ্চপদে নিয়োগ করলেন। সুভাষ ভৌমিককে নতুন জীবন পেতে সাহায্য করেছিলেন। বাংলার কোচ হিসেবে সাফল্যের পর কলকাতার ফুটবল মরশুম এমন একটা সময়ে যে প্রখর গ্রীষ্ম কিংবা অতি বর্ষণকে এড়িয়ে চলা যায় না। খবরের কাগজে প্রখর দাবদাহে ময়দানি ফুটবলকে সমালোচনা করে নানারকম লেখা বের হত। প্রদ্যুতদা নিজে ব্যাপারটা উপলব্ধি করার জন্য মাঠে যেতেন। বেশিরভাগ সময় কিছুদিনের জন্য খেলা বন্ধ রেখেছিলেন। সাংবাদিকদের শুধু বলতেন প্রচন্ড গরমে ক্রিকেট ম্যাচ যখন হয় তখন কি তোমাদের কলমের ধার পড়ে যায়? আবার অতি বর্ষণে মাঠ যখন থকথকে কাদায় খাটালের চেহারা নিয়েছে কৃত্রিম পায়েই ভর দিয়েই ছাতা মাথায় কিছুটা দূর থেকেই মাঠের অবস্থা দেখে প্রতিযোগিতায় সাময়িক বিরতি দিতেন।

কলকাতায় তিনপ্রধান ক্লাব মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল, মহমেডান চিরকালই আই এফ এ-র যাবতীয় নিয়মকানুনের বাইরে নানারকম সুযোগ সুবিধা ভোগ করে আসছিল। ম্যাচের ফলাফল তাদের অনুকূলে না গেলেই নানা অছিলায় তিন বড় দলের খেলোয়াড়রা মাঠের মধ্যে এমন আচরণ করতেন যে উত্তেজিত দলীয় সমর্থকেরা উদ্দাম উল্লাসে মাঠে ঢুকে পড়ত। রেফারিকে মারত। মাঠের গন্ডগোল শহরে ছড়িয়ে দিত। পুলিশ প্রশাসনও তখন এই তিন দলের খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতেন না। কারণ ইস্টবেঙ্গল ও মোহনবাগানের পেছনে আছে সমাজের কেষ্টবিষ্টুরা, মন্ত্রীসান্ত্রীরা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। মহমেডানের পেছনে আছে মাইনোরিটির লাল চোখ।

কলকাতায় তিনপ্রধান ক্লাব মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল, মহমেডান চিরকালই আই এফ এ-র যাবতীয় নিয়মকানুনের বাইরে নানারকম সুযোগ সুবিধা ভোগ করে আসছিল। ম্যাচের ফলাফল তাদের অনুকূলে না গেলেই নানা অছিলায় তিন বড় দলের খেলোয়াড়রা মাঠের মধ্যে এমন আচরণ করতেন যে উত্তেজিত দলীয় সমর্থকেরা উদ্দাম উল্লাসে মাঠে ঢুকে পড়ত। রেফারিকে মারত। মাঠের গন্ডগোল শহরে ছড়িয়ে দিত। পুলিশ প্রশাসনও তখন এই তিন দলের খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতেন না। কারণ ইস্টবেঙ্গল ও মোহনবাগানের পেছনে আছে সমাজের কেষ্টবিষ্টুরা, মন্ত্রীসান্ত্রীরা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। মহমেডানের পেছনে আছে মাইনোরিটির লাল চোখ।

কলকাতায় তিনপ্রধান ক্লাব মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল, মহমেডান চিরকালই আই এফ এ-র যাবতীয় নিয়মকানুনের বাইরে নানারকম সুযোগ সুবিধা ভোগ করে আসছিল। ম্যাচের ফলাফল তাদের অনুকূলে না গেলেই নানা অছিলায় তিন বড় দলের খেলোয়াড়রা মাঠের মধ্যে এমন আচরণ করতেন যে উত্তেজিত দলীয় সমর্থকেরা উদ্দাম উল্লাসে মাঠে ঢুকে পড়ত। রেফারিকে মারত। মাঠের গন্ডগোল শহরে ছড়িয়ে দিত। পুলিশ প্রশাসনও তখন এই তিন দলের খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতেন না। কারণ ইস্টবেঙ্গল ও মোহনবাগানের পেছনে আছে সমাজের কেষ্টবিষ্টুরা, মন্ত্রীসান্ত্রীরা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। মহমেডানের পেছনে আছে মাইনোরিটির লাল চোখ।

কলকাতা ময়দানের একটা প্রচলিত মিথ - ইস্টবেঙ্গল কিংবা মোহনবাগানের খেলোয়াড়দের কখনোই আইএফএ কিংবা প্রশাসন কোনও কারণেই স্পর্শ করবে না। ইস্টবেঙ্গল ও মোহনবাগানের খেলোয়াড়দের মারমুখী আচরণ পরস্পরকে আঘাত, প্রত্যাঘাত ঘিরে গ্যালারি বারবার তপ্ত হয়েছে। মানুষ মারা গেছে কিন্তু তাদের আচরণের বিশেষ তারতম্য ঘটেনি। একবার তো ইডেন গার্ডেনে ইস্টবেঙ্গল - মোহনবাগানের ম্যাচে বিদেশ বসু ও দিলীপ পালিত পরস্পরকে এমন আঘাত করলেন যে গ্যালারিতে আগুন ধরে গেল। আঘাতে কিংবা ভিড়ের চাপে বেশ কয়েকজন মারাও গেলেন। প্রদ্যুত দত্ত ঠিকই ধরেছিলেন দু-দলের তারকা খেলোয়াড়রাই আগুন ধরায়। সুযোগ পেলে এদের কয়েকবার শাস্তি দিলে মাঠের আবহাওয়া বদলে যাবে। হয়েও ছিল তাই। সুব্রত ভট্টাচার্য্, শিশির ঘোষ, আবদুল মজিদ, চিমা ওকেরির মতো খেলোয়াড়দের আর্থিক জরিমানা ও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্বাসন দিতেই বড় দলের আচরণও মাঠে বদলে গিয়েছিল।

খেলার মাঠের আরেক গভীর ক্ষত গটআপ ম্যাচ। এই গট-আপ ম্যাচ নানাভাবে হয়ে আসছিল। মূলত তিন ভাগে (১) রেফারিকে টাকা দিয়ে ম্যানেজ করা (২) একটি দলের কর্তারা বিপক্ষের কয়েকজন খেলোয়াড়কে টাকা দিয়ে ম্যানেজ করত (৩) একটি দল আরেকটি দলকে ম্যাচ ছেড়ে দিত। নানাভাবে প্রদ্যুত দত্ত এই ক্ষত সারাতে শুরু করেন। রেফারিদের মান বাড়িয়ে প্রথম ধাপের কাজটা সারেন। ফলে অপেক্ষাকৃত তরুণ রেফারিরা বড় ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব পান। রেফারিদের রিপোর্টের ভিত্তিতে বড় দলের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেন। সংবাদ মাধ্যম ও অন্যান্য সূত্রে কোন দল কীভাবে ম্যাচ গটআপ করবে তার আগাম খবর রাখতেন এবং সেই বুঝে ব্যবস্থা নিতেন। একবার তাঁর নিজের ক্লাব জর্জ টেলিগ্রাফ বিএনআর-কে পয়েন্ট ছেড়ে দেয়। ম্যাচ রিপোর্ট করতে গিয়ে অন্তত এই প্রতিবেদকের সেটাই মনে হয়েছিল। পরদিন সাতসকালে ম্যাচ রিপোর্ট পড়ে আমার বাড়ীতে ফোন করেন - সরাসরি জানতে চান মাঠে আমি নিজে ছিলাম কিনা? সেদিনই বিকেলে জর্জের অন্যতম কর্তা বাচ্চুবাবুর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। বলতেন - ফুটবল মাঠের নোংরা দূর করতে করতেই আমার সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে। ভাল খেলার আয়োজন হয়তো এ জীবনে করতে পারব না। শেষ দিকে তিনি ক্রিকেট মাঠের দিকে ঝুঁকে ছিলেন। জগমোহন ডালমিয়াকে সরিয়ে নির্বাচনে তিনি সিএবি দখল করার পরিকল্পনা নিচ্ছিলেন। ঘুটি সাজাতে দিল্লি গেছিলেন। রাজনৈতিক ক্ষমতা ছাড়া খেলার মাঠের দখলও যে নেওয়া যায় না ততদিনে তিনি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন। সন্তোষমোহন দেবকে সভাপতি ও নিজেকে সচিব পদে প্রার্থী করে এআইএফএফ দখল করতে গেছিলেন। রাজীব গান্ধীর হস্তক্ষেপে প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সির বিরুদ্ধে শেষ মুহূর্তে সরে দাঁড়ান সন্তোষমোহন দেব। একা কুম্ভের মতো লড়াই করে নির্বাচনে হেরে গিয়েছিলেন। অসুস্থ শরীরে দিল্লি থেকে টেলিফোনে এই প্রতিবেদককে বলেছিলেন, এই নির্বাচনে ধরেই নে সিএবি-তে ডালমিয়াকে সরিয়ে আমরাই ক্ষমতায় আসছি। ততদিনে মমতা ব্যানার্জি ভারতীয় রাজনীতিতে একটি গুরত্বপূর্ণ নাম। যখন তখন প্রদ্যুতদার সঙ্গে আলোচনায় বসেন। একবার তো প্রদ্যুতদার বাড়িতে বসে থাকার সময়েই খবর এল তিনি আসছেন। মমতা একবার যাদবপুর কেন্দ্রে প্রদ্যুত দত্তকে দাঁড় করানোর জন্য খুব চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু প্রণব মুখার্জি ও প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সির বিরোধিতার জন্য তিনি টিকিট পাননি। তিনি বেঁচে থাকলে আজ মমতা ব্যানার্জি অত্যন্ত সম্মানজনক জায়গায় তুলে ধরতেন। একদিন সকালে মোহনবাগান মাঠ থেকে অমিয় ঘোষের ফোন পেলাম, প্রদ্যুতদা নেই। কলকাতায় তাঁর মরদেহের উপর অনেক মালার ভিড়ে এক আশ্চর্য শ্রদ্ধাকে উঁকি মারতে দেখেছিলাম। একদা নামী খেলোয়াড় ও কোচ জহর দাস একটা সাদা-কালো ফুটবল তাঁর বুকের ওপর রেখে প্রণাম করলেন।

Copyright Ⓒ Prodyutdutta.com