দুঃসাহসী এক প্রশাসক

সৌগত রায়

(রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব)

বাংলার ক্রীড়াজগতে জর্জ টেলিগ্রাফ স্পোর্টস ক্লাবের দত্ত পরিবারের নাম নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। এই প্রতিষ্ঠানের প্রাণপুরুষ ছিলেন হরিপদ দত্ত। পরবর্তীতে তাঁর দুই সুযোগ্য পুত্র বিশ্বনাথ দত্ত এবং প্রদ্যুতকুমার দত্ত বাংলা তথা ভারতীয় ক্রীড়া জগতের প্রশাসনে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন, ক্রীড়ামোদী মহলে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। ভারতীয় ক্রীড়া জগতে তিন জন পঙ্কজ গুপ্ত এবং এম দত্ত রায়ের মতো প্রশাসক হিসাবে বিশ্বনাথ দত্তও ছিলেন কিংবদন্তি। বিশ্বনাথ দত্তর কনিষ্ঠতম ভ্রাতা প্রদ্যুতকুমার দত্ত ছিলেন দক্ষ একজন সংগঠক এবং প্রশাসক। দূর্ভাগ্য প্রদ্যুত দত্ত সময়ের অনেক আগেই হারিয়ে গেলেন। বলতে দ্বিধা নেই তাঁর অকাল প্রয়াণে বাংলার ফুটবলে বিরাট ক্ষতি হয়ে গেল। ব্যক্তিগতভাবে আমার ধারণা সেই ক্ষতি বা শূন্যতা আজও পূরণ হয়নি।

প্রদ্যুতবাবুর সঙ্গে আমার সে অর্থে খুব একটা ঘনিষ্ঠতা ছিল না। মাঝেমধ্যে তাঁর কাছে আমি গিয়েছি কিন্তু সেই যাতায়াতের জন্য অন্তরঙ্গতা হয়ে ওঠেনি। বড় কোনও খেলার টিকিট পাওয়া বা অন্য কোনওরকম সুবিধা আদায়ের ব্যাপার ছিল না। খুব কাছে থাকার ব্যাপার ছিল না। স্বভাবতই তাঁর কর্মকান্ড সম্পর্কে আমি খুব একটা ওয়াকিবহাল ছিলাম না।

তবু একজন দক্ষ প্রশাসকের যেসব গুণ থাকা দরকার সেই দিকগুলো বুঝেছিলাম সংবাদপত্রের মাধ্যমে। খবরের কাগজ পড়েই বিভিন্ন সময়ে তাঁর বিচক্ষণতার পরিচয় পেয়েছি। বিভিন্ন সময়ে তাঁর সিদ্ধান্ত আমার সঠিক বলে মনে হয়েছে। মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল বা মহমেডান ক্লাবের মতো বড় তিন ক্লাবকে তিনি দক্ষতার সঙ্গে সামলেছেন। বাংলার ফুটবলে নিয়ামক সংস্থা হল ইন্ডিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন, অর্থাৎ আইএফএ। সেক্ষেত্রে তিনি যেমন কখনও পক্ষপাতিত্ব করেননি, আবার কখনও কোনও প্রভাবশালী ক্লাবকে নিয়ামক সংস্থার মাথার উপরে উঠতে দেননি। তিনি সচিব থাকাকালীন বাংলার ফুটবলকে ঘিরে প্রবল উত্তেজনা ছিল। মাঠে মাঝেমধ্যে ঝামেলা, অশান্তি হত। প্রতিটি ক্ষেত্রে কঠোর হস্তে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন। যতদূর জেনেছি ছোট-বড় সব ক্লাবই তাঁকে একদিকে যেমন সমীহ করত পাশাপাশি শ্রদ্ধাও করত।

আগেই বলেছি তাঁর কর্মধারা প্রসঙ্গে সবই জেনেছি সংবাদপত্রের মাধ্যমে। শুনেছি শারীরিক দিক থেকে তাঁর প্রতিবন্ধকতা ছিল। পথ দুর্ঘটনার একটা পা হরিয়ে ছিলেন। কৃত্রিম পায়ের সাহায্যে হাঁটতেন। ভাবতে অবাক লাগে এরকম একটা শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাঁর চলার পথে বাধা হতে পারেনি। দাপটের সঙ্গে একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে ছুটে গেছেন। সে তার প্রাণপ্রিয় ক্লাব জর্জ টেলিগ্রাফ স্পোর্টসই হোক যা নিয়ামক সংস্থা আইএফএ, তাঁর গতি থেমে থাকেনি।

প্রথমে তাঁর পরিচয় ছিল একজন দক্ষ সংগঠক হিসাবে। জর্জ টেলিগ্রাফ স্পোর্টস ক্লাবের সচিব হিসাবে। পরবর্তীতে সঙ্গে আইএফএ সচিব। অর্থাৎ ফাঁকতালে তিনি আইএফএ সচিব হননি। বা কেউ তাঁকে ওই পদে বসিয়ে দেননি। যতদূর শুনেছি ক্লাবগুলোই তাঁকে আইএফএ-র শীর্ষপদে বসিয়েছে।

আইএফএ সচিব হিসাবে তাঁর উল্লেখযোগ্য সাফল্য ১৯৮৮ সালে শিলিগুড়িতে আয়োজিত জওহরলাল নেহরু গোল্ড কাপ। তাঁর দাদা বিশ্বনাথ দত্ত গড়ের মাঠের খেলাকে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন জেলার মাঠে। প্রদ্যুতবাবু এ ব্যাপারে আরও একধাপ এগিয়ে গেলেন। তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবল আয়োজন করেছিলেন শহর থেকে অনেক দূরে শিলিগুড়িতে। কেরালার মতো তিনিও চেয়েছিলেন রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ফুটবলকে ছড়িয়ে দিতে। অনেকেই তাঁর সিদ্ধান্ত অবাস্তব বলে মনে করেছিলেন। কারণ, নেহরু গোল্ড কাপের মতো আন্তর্জাতিক ফুটবল আয়োজন করার জন্য জরুরি আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম। শিলিগুড়ির তিলক ময়দানে মাঠের পশ্চিমদিকে একটা ছোট স্টেডিয়াম ছিল। সেখানে পাঁচ হাজার দর্শকও মনে হয় বসতে পারতেন না। প্রদ্যুত দত্ত-র একটা সিদ্ধান্ত সরকারকে বাধ্য করেছিল রাতারাতি আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম তৈরি করতে। পাশাপাশি গোটা শহরের খোলনলচে বদলে গেল। এটাই স্বাভাবিক। যেমন ১৯৮২ সালে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমস। ওই বৃহৎ আসরকে সাফল্যমন্ডিত করতে যেমন সেজেছিল দিল্লি সেরকমই পরিবর্তন হল শিলিগুড়ির। হ্যাঁ, শিলিগুড়িতে নিশ্চয়ই পরবর্তীতে স্টেডিয়াম হত। শহরটাও সেজে উঠত তবু মানতেই হবে আজ থেকে ৩৫ বছর আগে কখনোই হত না যদি না প্রদ্যুত দত্ত ওরকম একটা সাহসী সিদ্ধান্ত নিতেন। এককথায় শিলিগুড়িকে উন্নত করার জন্য তিনিই পথ দেখিয়েছেন।

এবারে আসছি তাঁর শিক্ষা ও রুচিবোধ সম্পর্কে। স্বাধীনতার ৪০ বছর পূর্তি হিসাবে এক বছরের মধ্যে দু-দুটি ফুটবল আসর বাংলায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৮৭ এবং ১৯৮৮ সালে। ১৯৮৭ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল সন্তোষ ট্রফি। সেই আসরে প্রধান অতিথি হিসাবে পাঞ্জাব থেকে উড়িয়ে এনেছিলেন ভারতকেশরী ডিফেন্ডার জার্নেল সিং-কে। জাতীয়তাবাদের পরিচয় রেখেছিলেন সেখানে। পাশাপাশি শিলিগুড়িতে নেহরু কাপ পরিচালনার সময় সকাল থেকে সন্ধ্যায় বাজত দেশাত্মবোধক গান। জাতীয় পতাকায় ছেয়ে গিয়েছিল গোটা শহর। এসবই তাঁর দেশাত্মবোধ, জাতীয়বোধের সাক্ষ্য বহন করে।

আবার বলছি একজন মানুষকে ভালভাবে জানতে হলে সব সময় তাঁর কাছে থাকতে হয় না। তাঁর কর্মকান্ডই একজন মানুষকে চিনিয়ে দেয়। প্রদ্যুতবাবুকে আমিও সেভাবেই জানি। যতটুকুই জানি সেই ঘটনাগুলোই এই লেখায় তুলে ধরলাম।

Copyright Ⓒ Prodyutdutta.com