ছোট কাকা

সুব্রত দত্ত

(ভাইপো)

আমার ছোট কাকা প্রদ্যুত কুমার দত্ত বাংলার ফুটবল মহলে একটি সুপরিচিত নাম। ফুটবল প্রশাসনে তাঁর যাত্রা শুরু আমাদের পারিবারিক প্রতিষ্ঠান জর্জ টেলিগ্রাফ স্পোর্টস ক্লাব থেকে। ১৯৮৪ সালে বাংলার ফুটবলের নিয়ামক সংস্থা ইন্ডিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনে প্রথমে অর্থসচিব। পরবর্তীকালে সাধারণ সচিব পদে।

আসলে ক্রীড়া সংগঠনে প্রশাসনিক ব্যাপারটা আমাদের অনেকটাই জন্মগত। আমাদের পিতামহ হরিপদ দত্ত ছিলেন জর্জ টেলিগ্রাফ স্পোর্টস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা। আমার পিতা বিশ্বনাথ দত্ত সম্পর্কে নিশ্চয়ই নতুন করে কিছু বলতে হবে না। ফুটবল, ক্রিকেট - দুই সংস্থাতেই সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে তাঁর সাফল্য কেউই অস্বীকার করতে পারবেন না।

ছোটকাকা আমার বাবার মতোই লড়াই করে আই এফ-র সচিব পদে বসেছেন। এই ব্যাপারে তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা প্রমাণ করেছেন। ১৯৮০ সাল থেকে তিনি দল সাজিয়েছেন। প্রসঙ্গত সেই সময়ে আমার বাবা এবং অশোক ঘোষ ময়দান নিয়ন্ত্রণ করছেন। ১৯৮০-৮১ থেকে তিনবার নির্বাচনে লড়াই করেও জিততে পারলেন না। তবু হাল ছাড়েননি। গোটা দলটাকে সংগঠিত করলেন এবং শেষ পর্যন্ত সফলও হলেন। এজন্য তাঁকে কঠিন লড়াইয়ের সামনে পড়তে হয়েছিল। অদম্য জেদ, প্রবল ইচ্ছাশক্তি, জয়ের তাগিদ যে কোনও কঠিন কাজেই সাফল্য এনে দেয়। আমার বাবা এবং ছোটকাকা তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

ছোটকাকা ছিলেন আমার জীবনে ‘ফ্রেন্ড, ফিলজফার এবং গাইড’। বেশ কিছুদিন আমি তাঁর সান্নিধ্য পেয়েছি। ১৯৭৯-৮০ সালে হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য আমি তখন ৪৫-এ, রাজা রামমোহন সরণীতে (আমহার্ষ্ট স্ট্রিটে) থাকতাম। ছোটকাকা তখন তাঁর ‘খেলার কথা’ পত্রিকা অফিসে নিয়মিত আসতেন। সেই সময় অনেক কিছু খুঁটিনাটি বিষয় আমাকে বলতেন।

আমি তখন ক্লাস টেন-এ পড়ি। একবার সপরিবারে আমরা পুরীতে বেড়াতে গিয়েছিলাম। প্রতিদিনই দুপুরে জমজমাট আড্ডা হত। তার মধ্যে একদিন আমার ambition কী জানতে চাইলেন। ডাক্তার হতে চাই শুনে বলেছিলেন কোনও ধরাবাঁধা চাকরি করা ঠিক হবে না। ব্যবসা করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কারণ ব্যবসা করলে স্বাধীনতা থাকবে। সন্তুষ্টি পাওয়া যাবে। সর্বোপরি সাংগঠনিক দক্ষতা প্রদর্শনের সুযোগ পাওয়া যাবে। চাকরির ক্ষেত্রে সেই সুযোগ থাকবে না।

ছোটকাকার পরামর্শ মেনে নিয়ে ব্যবসাতেই মন দিলাম। সময় পেলেই ব্যবসার পাঠ নিতে ছোটকাকার কাছে ছুটে যেতাম। ছোটকাকা ছিলেন একজন ‘ক্ল্যাসিক টেবল টকার’। যখন খুব ভাল মেজাজে থাকতেন তখন জমিয়ে আড্ডা হত তাঁর ঘরে। সেই জমকালো আড্ডায় আমিও যেতাম। তবে শুধু গল্প শুনতে নয়, আমার মূল লক্ষ্য ছিল শেখার।

আই এফ এ-র সচিবের চেয়ারে তিনি সহজে বসতে পারেননি। কেউ যদি মনে করেন মেজদাদা বিশ্বনাথ দত্ত চেয়ারে বসিয়েছেন, তাহলে ভুল করবেন। ১৯৮০ সালের গোড়ার দিক থেকে লড়াই শুরু করেছেন। ভ্রাতৃসঙ্ঘ ক্লাবের চন্দ্রনাথ চ্যাটার্জি, ভিক্টোরিয়া ক্লাবের রঞ্জিত গুপ্ত, মিলন সমিতি ক্লাবের বিকাশ রায়চৌধুরী, ইলিসিয়াম ক্লাবের কৃষ্ণেন্দু ব্যানার্জি - এরকম আরও কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে শক্তিশালী একটা দল গড়েছিলেন।

পরপর তিনবার জিততে না পারলেও হাল ছাড়েননি। অদম্য জেদ, ইচ্ছা শক্তি এবং জয়ের তাগিদ সাফল্য এনে দিয়েছিল। ১৯৮৪ সালে অর্থসচিব এবং ১৯৮৫ সালে সাধারণ সচিব পদে নির্বাচিত হলেন। তাঁদের প্যানেলও জিতেছিল।

নির্বাচনের আগে যেমন সাংগঠনিক দক্ষতা প্রমাণ করেছেন, সেরকম সচিবের চেয়ারে বসার পরেও। ক্লাবগুলোর সঙ্গে সু-সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। সব সময় ক্লাবের মতামতকে গুরুত্ব দিতেন। কারণ তিনি নিজে ক্লাব থেকে উঠে এসেছেন।

আই এফ এ সচিব হিসাবে এমন কয়েকটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যা আই এফ এ-র ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ১৯৯৬ সালে নার্সারি ফুটবল লিগ, মহিলা ফুটবল লিগ চালু করার জন্য বাংলার ফুটবল ছোটকাকার কাছে চিরঋণী হয়ে থাকবে। তাঁর স্বপ্ন ছিল ইউথ ডেভলেপমেন্ট। একদম গোড়া থেকে ফুটবলার তুলে আনা, যাকে বলে ফুটবলের প্রথম পাঠ। এই ব্যাপারে রাজারহাটে জমিও বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর সফল হল না। প্রশাসক হিসাবে দুটি বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ফুটবলে Class 1 এবং Class 11 ডিগ্রি তুলে সব দলকে একই মর্যাদা দিয়েছিলেন। প্রসঙ্গত আমার বাবা বিশ্বনাথ দত্ত ১৯৭৯ সালে সিএবি-তে একই নিয়ম চালু করেছিলেন।

দ্বিতীয়টি অবশ্যই ১৯৮৬ সালে কলকাতা লিগে মহামেডানের সাসপেনশন। এক্ষেত্রে অনেক বিতর্ক হয়েছিল। প্রবল চাপও ছিল বিভিন্ন মহল থেকে। সেক্ষেত্রে তিনি অনড় ছিলেন। আসলে কোনওরকম অন্যায় তিনি বরদাস্ত করতেন না, আপস করতেন না।

আইএফএ এবং জর্জ টেলিগ্রাফ স্পোর্টস ক্লাব পরিচালনার পাশাপাশি জর্জ টেলিগ্রাফ ট্রেনিং ইনস্টিটিউটেও দায়িত্ব সামলেছেন যোগ্যতার সঙ্গে। একবার ১৯৮০ সালে ট্রেনিং ইস্টিটিউটের কয়েকজন কর্মী অনৈতিকভাবে আন্দোলন করে অচলাবস্থা সৃষ্টি করেছিল। সেই সময়ে ছোটকাকা কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। আন্দোলনকারীরা পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিলেন। সেই সময়ে ৪৫-এ, রাজা রামমোহন সরনিতে থাকার সুবাদে সেই অসহনীয় দিনগুলোর সাক্ষী ছিলাম আমি।

আইএফএ প্রশাসনে শুরু থেকেই ঝড় তুলেছিলেন। দুঃসাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে বিতর্ক হয়েছে। প্রবল বাধা এসেছে, তবু তিনি পিছিয়ে যাননি। কারণ, ছোট কাকার কাছে সবার আগে ছিল আইএফএ-র সম্মান ধরে রাখা।

শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, দীর্ঘকায়, ভারী চেহারা - তার ওপর ব্লাড প্রেসার, হাই সুগার, কোলেস্টেরলের জন্য প্রচুর ওষুধ খেতে হত। তার মধ্যেও নিরলস পরিশ্রম করতেন। যখন প্রয়োজন হত উদয়াস্ত কাজের মধ্যে ডুবে থাকতেন।

জর্জ টেলিগ্রাফ স্পোর্টস ক্লাবের সচিব হয়েছেন সাত-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে। সেই সময়ে স্পোর্টস ক্লাবের পারফরম্যান্স ভাল ছিল না। ছোটকাকার হাত ধরেই জর্জ আবার ঘুরে দাঁড়ায়। আবার বড় তিন দলের ঘুম কেড়ে নিতে লাগল। তাঁর সময়েই বেশ কয়েকজন ফুটবলার জর্জ থেকে বড় দলে যোগ দিয়েছিল। জাতীয় ফুটবল সন্তোষ ট্রফিতেও সুযোগ পেয়েছিলেন বেশ কয়েকজন ফুটবলার।

জর্জ টেলিগ্রাফ স্পোর্টস ক্লাব, ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, আইএফএ - সর্বত্রই তিনি ছিলেন ‘মুশকিল আসান’। কিন্তু দুর্ভাগ্য নিজের শরীরটাকে সুস্থ করে ফিরতে পারলেন না। শেষ দিকে বেশিরভাগ সময়েই ব্যবসার জন্য দিল্লিতে থাকতেন। ১৯৯৪ সালে অক্টোবরে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। ২৫ অক্টোবর আমার সঙ্গে শেষবারের মতো কথা হয়েছিল। পরদিন ‘চেক আপ’ করার কথা ছিল। বলেছিলেন ১ নভেম্বর কলকাতায় ফিরবেন। কিন্তু শরীর ক্রমশঃই খারাপ হতে থাকে। ১৬ নভেম্বর হৃদরোগ জনিত কারণে ‘হার না মানা’ ছোটকাকা জীবন যুদ্ধে হেরেই গেলেন।

আমাকে বিশ্বাস করতেন। ৩১-এ, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি রোড-এ ... অ্যাপার্টমেন্টে ছোটকাকার দুটো রেস্তোরাঁ (Step up এবং Zinath-এর পাশে আমার রেস্তোরাঁ Super Snax। নিজেরটা চালাবার পাশাপাশি Step-up, Zinath এর দায়িত্ব আমাকে দিয়েছিলেন। এতটাই বিশ্বাস করতেন।

Copyright Ⓒ Prodyutdutta.com