(কনিষ্ঠা ভগ্নী)
ছোড়দা (প্রদ্যুত দত্ত) আমাদের সবাইকে কাঁদিয়ে চলে গেছেন ২৯ বছর আগে। আজও কিছুতেই ছোড়দাকে ভুলতে পারছি না, ভোলার কথাও নয়। ছোড়দার বর্ণময় জীবনের অনেক ঘটনা মাঝে মধ্যেই মনে পড়ে। তাই যখন শুনলাম তাঁর দুই পুত্র জয় (অনির্বাণ) এবং জিৎ (অনিন্দ্য) ছোড়দাকে নিয়ে একটা বই প্রকাশ করতে চলেছে তখন অবশ্যই খুব ভাল লেগেছে। সেই বইয়ে আমাকেও ছোড়দা সম্পর্কে কিছু লিখতে হবে জেনে মনে হয় কিছুটা হালকা হওয়ার সুযোগ পেয়েছি। হালকা হওয়ার কারণ, আমরা অনেকেই তো তাঁর সম্পর্কে জানি। কিন্তু সেই সব টুকরো ঘটনা মাঝে মধ্যে মনে পড়লেও সবাইকে বলার সুযোগ হয় না। জয়-জিৎ সুযোগটা করে দেওয়ার জন্য ওদের প্রাণভরে আশীর্বাদ করছি।
আমাদের পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে সবার কাছে প্রিয় ছিল ছোড়দা। কারণ যে কোনও সমস্যাতেই ছোড়দা ছিলেন ত্রাণকর্তা।
নানাবিধ গুনের সমন্বয় ছিল ছোড়দার মধ্যে। খেলা এবং সঙ্গীতের অনুরাগী ছিলেন ছোড়দা। খেলার ব্যাপারে আপনারা সবাই জানেন। আমি তাঁর সঙ্গীতে অনুরাগের কিছু কথা বলছি। তিনি যেমন নিজে সঙ্গীত অনুরাগী ছিলেন, পাশাপাশি নিজেও এই ব্যাপারে পারদর্শী ছিলেন। মাউথ অর্গানে গানের সুর তুলে সবার মন জয় করেছেন। পাশাপাশি তবলা বাজাতে পারতেন, গিটার বাজাতেন এমনকি ভাড়া করে এনে পিয়ানো বাজাতেন।
আমাদের শিয়ালদা সার্পেনটান লেনের বাড়িতে ছিল খেলাধূলার পরিবেশ। বাড়িতে ব্যাডমিন্টন কোর্ট ছিল। ছোড়দা এই খেলাতে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। খেলাতে তিনি হারতে চাইতেন না। বাড়িতে টেবল টেনিস বোর্ড ছিল। এই খেলাতেও ছোড়দার হাত ছিল চমৎকার।
সবাইকে নিয়ে আনন্দ করতে ভালবাসতেন। বেশ কয়েকবার তাঁর সঙ্গে বেড়াতে গেছি। সব সময়ই তিনি আমাদের মাতিয়ে রাখতেন। দেওঘরে গিয়ে নিজেই টাঙ্গা গাড়ি চালিয়েছেন। টাঙ্গাওয়ালা তখন ছোড়দার পাশে বসতেন। এইভাবে আমাদের মাতিয়ে রাখতেন। কালীপূজার সময়ে আমাদের গোটা বাড়ি আনন্দে গমগম করত। সেই সময়ে বাজি পোড়ানো, তুবড়ি প্রতিযোগিতাতে সব কিছুতেই অগ্রণী ভূমিকায় থাকতেন ছোড়দা।
সবসময়ই আনন্দের মধ্যে থাকতে ভালবাসতেন। ছোড়দা অবসর সময়ে সিনেমা দেখতেন। কিন্তু দুঃখের ছবি দেখতেন না। বলতেন দৈনন্দিন জীবনে দুঃখ আমাদের তো সবসময়ই লেগে থাকে। সেক্ষেত্রে সিনেমাতেও দুঃখ বেদনার ছবি দেখতে যাব কেন?
জীবনে কোনও কাজেই তিনি হারতে চাইতেন না। ব্যাডমিন্টন, টেবিল টেনিস খেলাতে যদি কখনও হারতে থাকতেন তখন গোলমাল পাকিয়ে দিতেন। খেলা ছেড়ে চলে যেতেন।
ভীষণ অভিমানী ছিলেন। কোনও কারণে যদি মন মতো না হত তাহলে লেবুতলা পার্কে গিয়ে বসে থাকতেন। কিন্তু এই অভিমানই ছোড়দার জীবনে একটা বিরাট বিপদ ডেকে এনেছিল। সেদিন বড় কোনও এক দলের সঙ্গে জর্জ টেলিগ্রাফের খেলা ছিল। গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচ দেখার জন্য মানসিক দিক থেকে এতটাই উৎসাহী ছিলেন যে সেদিন দুই বন্ধু ভোলাদা এবং টুনুদাকে সঙ্গে নিয়ে গাড়ীতে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু গাড়িতে জায়গা না পাওয়ায় তখন বন্ধুদের নিয়ে ট্রামে যাবেন ঠিক করলেন। ফুটবলারদের মাঠে নামিয়ে গাড়ি আবার আসবে জেনেও দেরি হবে ভেবে অভিমানী ছোড়দা অপেক্ষা করতে চাননি। আসলে বিপদ যখন ঘটে তখন মানুষ এরকমই ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে বসেন।
ছোড়দাও সেদিন এরকমই একটা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে বিপদ ডেকে এনেছিলেন। সেদিন আবার ধুতি পাঞ্জাবী পরিহিত ছিলেন। এই পোশাকও তাঁর বিপদ ডেকে এনেছিল। সেদিন শিয়ালদা থেকে প্রচুর দর্শক খেলা দেখার জন্য ট্রামে উঠছিলেন। ভিড় হয়েছিল বলে তাড়হুড়ো করে ছোড়দা ট্রামে ওঠার সময় ধূতির খোট ট্রামের চাকায় বেধে যাওয়ায় ট্রাম থেকে পড়ে গেলেন। নীলরতন সরকার হাসপাতালের সামনের রাস্তায় পড়ে গেলেন। ট্রামের চাকা একটা পায়ের উপর দিয়ে চলে যাওয়ার ফলে একটা পা মারাত্মক জখম হয়েছিল। ডাঃ এস আর চন্দ্রের চিকিৎসাধীন ছিলেন। জখম পায়ের নিচের দিক থেকে কাটতে কাটতে প্রায় হাঁটুর কাছাকাছি বাদ দিতে হয়েছিল। ভয়াবহ দুর্ঘটনার পরে বন্ধুরা তখন বিধ্বস্ত হলেও তাঁদের আশ্বস্ত করে বলেছিলেন দুর্ঘটনার খবর যেন বাড়িতে জানতে না পারে। পরবর্তীতে পুনেতে চিকিৎসা হয়েছিল। সেখানে কৃত্রিম পা লাগানো হয়েছিল। তারপর থেকে বলতে গেলে এক পায়েই ছোড়দা দাপটের সঙ্গে বিচরণ করেছেন এবং সর্বক্ষেত্রেই সাফল্য অর্জন করেছেন।
সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর মা সবসময়ই কাঁদতেন। দু-চোখের নিচে কালো দাগ পড়ে গিয়েছিল। বাবা মানসিক দিক থেকে বিধ্বস্ত হলেও তাঁর আরাধ্য গুরুদেব কৈবল্যনাথ শ্রী রামঠাকুরের উপর ভরসা রেখে মাকে বলেছিলেন, ‘ঠাকুর যা করে মঙ্গলের জন্যই। দেখবে তোমার দুই ছেলে বিশ্বনাথ এবং প্রদ্যুত জীবনে অনেক সাফল্য পাবে, নাম যশ হবে।’
দুর্ঘটনার পরে পরিজনদের মধ্যে অনেকেই ছোড়দাকে দেখতে এসেছেন। ভালমন্দ খাবার হাতখরচ বাবদ টাকা পয়সা দিয়েছিলেন। ভাইদের মধ্যে দাদামনি চতুর্থ দাদা প্রশান্ত দত্ত-র সঙ্গে অন্তরঙ্গতা ছিল ছোড়দার। তবে ছোড়দাকে দেখভালের দায়িত্ব সামলাতেন মেজদাদা বিশ্বনাথ দত্ত। যেমন কোনও ব্যাপারে মতের অমিল হলেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে চলে যেত লেবুতলা পার্কে। সেই সময় ছোড়দাকে খুঁজে আনতেন মেজদাদা (বিশ্বনাথ দত্ত)। মেজদার কথা খুবই মানতেন ছোড়দা।
ঘরে তাঁর মন টিকত না বলে বাবা বরাহনগর রামকৃষ্ণ মিশনে ভর্তি করেছিলেন। ভেবেছিলেন রামকৃষ্ণ মিশনের ধরাবাধা নিয়মে ছোড়দা বাড়ির বাইরে বেরবার সুযোগ পাবেন না। কিন্তু মিশনের ধরাবাধা নিয়মে থাকা ছোড়দার পক্ষে তাড়াতাড়ি মানিয়ে নিতে পারবেন না, সেটা আন্দাজ করে বাবা প্রতি সপ্তাহে মেজাদাকে পাঠাতেন। মেজদার কাছে ছোড়দা সবসময়ই বলতেন। মিশনে সব কাজই নিজেদের করতে হত। খাবার পরে নিজের বাসন মাজতে হত। বিচক্ষণ মেজদাদা তখন অনিচ্ছা সত্ত্বেও মিশন থেকে ছাড়িয়ে আনলেন। তাই বলে ছোড়দার শিক্ষাজীবন ব্যর্থ হয়নি।
এম কম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। শেখার আগ্রহ প্রবল ছিল। ইংরেজি ভাষায় বিশেষ দখল ছিল। ইংরেজি অভিধান (ডিকশনারী) থেকে প্রতিটি শব্দ মুখস্থ করেছিলেন।
ভাইদের মধ্যে সবার ছোট হলেও তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ছিল বড় ভাইয়ের মতো। মানসিক দৃঢ়তার জন্য জেষ্ঠ্য চার দাদা ছোড়দাকে ভরসা করতেন। মনের জোর ছিল প্রবল। কঠিন বিপদের মুখেও শক্ত হাতে মোকাবিলা করতে পারতেন। তাঁর মানসিক দৃঢ়তার জন্য জর্জ টেলিগ্রাফ ট্রেনিং ইনস্টিটিউট আজ গোটা দেশে মাথা উঁচু করে এগিয়ে চলেছে। ১৯৭৯ সালে আমাদের পারিবারিক এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কয়েকজন কর্মচারীর অসহযোগিতায় উঠে যেতেই বসেছিল। কর্মচারীরা এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি করেছিল যে কারণে ইনস্টিটিউটে যেতে ভয় পেতেন। বেশ কিছুদিন জর্জ টেলিগ্রাফ বন্ধ রাখতে হয়েছিল। সেই কঠিন সময়ে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন ছোড়দা।
সেই সময় আমার স্বামী বিজিত গুহ ছোড়দার পাশে থেকেছেন। ইনস্টিটিউটের সরঞ্জাম যাতে কেউ চুরি করতে না পারে সেক্ষেত্রে বিজিত দা-র মামা রাতে পাহারা দিতেন। মামলা হয়েছিল, আমরাই জিতেছিলাম। তবু সেই দুর্বিষহ দিনগুলোর কথা মনে পড়লে আজও গায়ে কাটা দেয়।
ছোড়দাকে তারপর থেকেই বলা হয় ‘সেকেন্ড ফাউন্ডার’। জর্জ টেলিগ্রাফের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন আমাদের বাবা হরিপদ। ১৯২০ সালে তিনি এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। বলতে দ্বিধা নেই ১৯৭৯ সালে ছোড়দা রুখে না দাঁড়ালে বাবার স্বপ্নের এই প্রতিষ্ঠান উঠেই যেত। ছোড়দা জর্জ টেলিগ্রাফকে ঘোর বিপদ থেকে রক্ষা করেছেন। পাশাপাশি উত্তরোত্তর উন্নতি করেছেন। স্বভাবতই ছোড়দাকে ‘সেকেন্ড ফাউন্ডার’ বললে ভুল হবে না।
ভীষণ ভোজন-রসিক ছিলেন। তেল-ঝালের সুস্বাদু রান্না খেতে ভালবাসতেন। কেউ যদি নিষেধ করতেন তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বলতেন, ‘কতদিন বা বাঁচা, এত বাছ-বিচার করে খাওয়া যায় নাকি?’
এবারে আমার জীবনের একটা ঘটনার কথা বলছি। ১৯৯০ সালের ঘটনা। একদিন থিয়েটার রোডের ক্রসিংয়ে একটা প্রাইভেট গাড়ি পিছন থেকে আমার পায়ে আঘাত করেছিল। খবরটা শোনার পরে আমাদের বাড়ি থেকে বিজিতদা এবং আরও সবাই ছুটে এসেছিলেন। ছোড়দাও হাজির হলেন। ঘটনাস্থলে পৌছেই আমার পা থেকে মোজা খুললেন। জর্জ স্পোর্টস ক্লাবের অর্থোপেডিক ডাক্তার সুনীল ঠাকুরকে খবর দিলেন। পায়ে তখন প্রচন্ড যন্ত্রণা হচ্ছিল। ডাক্তারবাবু জানালেন ‘পায়ে চিড় ধরে গেছে’। বিজিতদার কাছে তখন টাকা ছিল না।
ছোড়দা জানতে পেরে বললেন, ‘অফিসে যাও, এদিকটা আমি দেখছি।’ মজা করে ডাক্তারবাবুকে বলেছিলেন, ‘দেখলেন তো, টাকাটা এখন আমাকেই দিতে হবে।’ ছোড়দা মজা করছেন ডাক্তারবাবু বুঝতে পেরেছিলেন। না, তিনি কোনও টাকা নেননি।
১৯৯২ সালে আমার স্বামী বিজিত গুহ প্রয়াত হন। দূরারোগ্য ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। সুস্থ করে তোলার জন্য ছোড়দা আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। বোম্বাইতে (এখন মুম্বই) নিয়ে গিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলেন। সেই সময়ে ছোড়দা ভীষণ আঘাত পেয়েছিলেন। তিনি সবসময়ই ছোড়দার পাশে থাকতেন। ভাগ্য বিপর্যয়ের পর আমি ছোড়দার সামনে দাঁড়াতে পারতাম না। আমাকে দেখলেই অঝোরে কাঁতদেন। অভয় দিয়ে বলেছিলেন ‘যত অসুবিধাই হোক গহনায় হাত দিবি না।’
বিজিতদা প্রয়াণের পরে আমি তাঁর অফিসে চাকরি পেয়েছিলাম। এজন্য অবশ্য অন্য কোথাও যোগাযোগ করতে হয়নি। কারণ অফিসে বিজিতদা খুব গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। দিল্লিতে অফিসের সব গুরুত্বপূর্ণ কাজ তিনিই করতেন। স্বভাবতই স্ত্রী হিসাবে চাকরিটা আমার প্রাপ্য ছিল। আমাকে চাকরি করতে হবে শুনে মেজদা একটু অবাক হয়েছিলেন। কিন্তু ছোড়দা বলেছিলেন, চাকরি করতেই হবে। এতটাই বাস্তববাদী ছিলেন তিনি। সেই অর্থ ছোড়দা নিজের জন্য খুব একটা ব্যয় করেন নি। অনেকটাই আমাদের বোনদের পোশাক, সাজগোজের জন্য দিয়েছিলেন। মনটা ছিল শিশুর মতো সরল। সবসময় আনন্দের মধ্যে থাকতে ভালবাসতেন।