চিৎকার শুনে বৌদি ছুটে এসেছিলেন

আলোকেশ কুন্ডু

(প্রদ্যুত দত্তর ভ্রাতৃসম)

১৯৮৩-৮৪ সালের ঘটনা। আমি তখন গগনদা (চন্দ্রনাথ চ্যাটার্জী)-র ভ্রাতৃ সঙ্ঘ ক্লাবের সঙ্গে জড়িত। কলকাতা লিগে প্রবল বর্ষণে মহামেডান মাঠে আমাদের ম্যাচ পরিত্যক্ত হয়েছিল। সেই সময়ে আমাদের ক্লাব লিগ খেলার দিনে জর্জ টেলিগ্রাফ তাঁবু ব্যবহার করত। সেদিন খেলা থেকে যখন জর্জ তাঁবুতে গেলাম প্রদ্যুতদা অফিস ঘরে বসেছিলেন।

জর্জ ক্লাবের কয়েকজন আমাকে প্রদ্যুতদা ডাকছেন বললেও আমি যাইনি, কারণ প্রদ্যুৎদা-কে ভয় পেতাম। পরে বাচ্চুদা অভয় দিয়ে আমাকে নিয়ে গেলেন। বাচ্চুদাকে আমার নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর নিতে বললেন। আমাকে আই এফ এ অফিসে দেখা করতে বললেন। তবে আমি যেতে পারিনি। এরপর একদিন শুভ বিজয়ার শুভেচ্ছা এবং আমন্ত্রণ জানালেও যাইনি। কারণ একটাই প্রদ্যুৎদার সামনে দাঁড়াবার সাহস আমার ছিল না। তবে শেষ পর্যন্ত পালিয়ে যেতে পারলাম না। সেদিন আই এফ এ অফিসে ভ্রাতৃ সঙ্ঘ ক্লাবের কিছু ব্যাপারে গিয়েছিলাম। কাজ সেরে যখন নেমে আসছি তখন পিছন থেকে বিপিনদা (পাল) আমাকে ডেকে নিয়ে প্রদ্যুত দা-র ঘরে নিয়ে গেলেন। সেখানে আইএফএ-র প্রাক্তন সচিব রঞ্জিত গুপ্ত এবং আরও কয়েকজন ছিলেন। আমি ঘরে ঢোকার পরে রঞ্জিতদা বাদে অন্যরা চলে গেলেন। কিছুক্ষণ বাদে রঞ্জিতদা এবং আমাকে নিয়ে প্রদ্যুতদা-ও উঠে পড়লেন। লেক মার্কেটের সামনে রঞ্জিতদার সঙ্গে আমিও নেমে পড়লাম। পরদিন দুপুর একটার সময়ে আবার দেখা করতে বললেন। প্রসঙ্গত আইএফএ-তে স্বচ্ছতা আনার জন্য প্রদ্যুতদা, গগনদা এবং রঞ্জিতদা লড়াই করছিলেন। এই ব্যাপারে তাঁদের কর্মসূচি আমাকে বুঝিয়েছিলেন।

পরবর্তীতে ১৯৮৫ সালে প্রদ্যুতদা সচিব পদে নির্বাচিত হয়ে এসেছিলেন। চেয়ারে বসার পর থেকেই তাঁর লক্ষ্য ছিল আইএফএ পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনার দিকে। রঞ্জিতদা যে পরিকল্পনাগুলোর কথা বলেছিলেন সেই দিকগুলোতে প্রথমেই নজর দিয়েছিলেন। বরাবরই ক্লাবগুলোর প্রতি সহৃদয় ছিলেন তিনি। নিজে ক্লাব করতেন বলে ক্লাবগুলোর সমস্যাগুলো তিনি জানতেন। যেমন ফুটবলারদের সাজ-সরঞ্জাম। প্রতিটি ক্লাবেই জার্সি ঠিক থাকলেও অনেক ক্লাবে ফুটবলার বিভিন্ন রঙের প্যান্ট ও মোজা পায়ে খেলতেন। এই ব্যাপারে প্রদ্যুতদা আই এফ এ থেকে একই রঙের প্যান্ট ও মোজার ব্যবস্থা করেছিলেন। পুরো অর্থ আই এফ এ-র ফান্ড থেকে ব্যবস্থা করেছিলেন। পাশাপাশি ক্লাবগুলো প্যান্ট এবং মোজা ব্যবহার করছে কিনা এই ব্যাপারেও নজর রাখার জন্য নিতাই এবং আমাকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। পাশাপাশি আমাদের দায়িত্ব ছিল মাঠগুলো সম্পর্কে খবর রাখার। এককথায় চমৎকার টিমওয়ার্ক। খেলার পরে ফুটবলারদের টিফিনের ব্যবস্থা করেছিলেন। ক্লাবগুলোর আর্থিক দুরবস্থার দিকটা তিনি জানতেন। সবমিলিয়ে ক্লাবগুলোর খেলতে যাতে কোনও সমস্যায় পড়তে না হয় সে ব্যাপারে ব্যবস্থা করেছেন।

১৯৮৫ সাল থেকেই তাঁর খুব কাছে থাকার সুযোগ হয়েছিল। আমাদের স্নেহ করতেন, আবার কোনও বে-নিয়ম দেখলে ধমক দিতেন। একবার সালকিয়া বনাম ভ্রাতৃ সঙ্ঘ ম্যাচকে কেন্দ্র করে আমার বিরুদ্ধে গড়াপেটার অভিযোগ শুনে ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। রাগে আমার দিকে পেপারওয়েট ছুঁড়েছিলেন। তাঁর চিৎকার শুনে বৌদি ছুটে এসে ধরে নিয়ে গিয়েছিলেন। আবার প্রদ্যুতদা-ই রাতের খাবারের ব্যবস্থা করেছিলেন।

ম্যাচটা ড্র-অবস্থায় বৃষ্টিতে ভেস্তে গিয়েছিল পরদিনই রি-প্লে দিয়েছিলেন। রাতেই ফুটবলারদের খবর দিতে হয়েছিল। তবে ম্যাচটা আমরা ১-০ গোলে জিতেছিলাম।

নিজে আই এফ এ সচিব হওয়ার আগে দলগঠনের ব্যাপারে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। অন্য ক্লাব থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দক্ষ ফুটবলার তুলে এনে শক্তিশালী দল গড়েছেন। সেই তিনিই আই এফ এ-র সচিব হওয়ার পরে জর্জের দল গঠনের ব্যাপারে সাহায্য করতেন না। মনে আছে একবার ভ্রাতৃ সঙ্ঘ থেকে তিন জন ফুটবলারকে জর্জ সই করিয়েছিলেন। কিন্তু পরে সুযোগ পেয়ে সই প্রত্যাহার করিয়েছিলাম। রিক্রুটাররা প্রদ্যুতদা-র কাছে অভিযোগ করলে তাদের ধমক দিয়ে বলেছিলেন ‘এটা তো তোমাদের ব্যর্থতা। আলোকেশ সুযোগটা কাজে লাগিয়েছে।’

খেলা নিয়ে ‘গড়াপেটা’ অর্থাৎ মাঠে নেমে খেলার অভিনয় করাকে তিনি ঘৃণা করতেন। বলতেন ‘যে কোনও ফুটবলারের কাছে জার্সি হল মা। সেই মায়ের সম্মান রক্ষা করাটাই একজন ফুটবলার নৈতিক কর্তব্য।’

তিনি বিশ্বাস করতেন ক্লাবগুলোই হল ক্রীড়া সংস্থার আসল শক্তি। ক্লাবগুলো যদি নড়বড়ে থাকে তাহলে আইএফএ-র ভিতটাও নড়বড়ে হয়ে যাবে।

Copyright Ⓒ Prodyutdutta.com