বদলে গেল শিলিগুড়ি

বিশ্বজিৎ দাস

(ক্রীড়া সংগঠক, শিলিগুড়ি)

শিলিগুড়িতে ৩৪ বছর আগে যাঁরা এসেছেন তাঁদের মধ্যে এখন যদি কেউ আসেন তাহলে দেখবেন ঝকঝকে একটা শহর। শহর জুড়ে বিশাল বিশাল সব অট্টালিকা। এককথায় এখনকার শিলিগুড়ি দেখলে চমকে যাবেন। পাশাপাশি মুগ্ধ হবেন কাঞ্চনজঙ্ঘা স্টেডিয়াম দেখে। নিঃসন্দেহে রাজ্যের এখন দ্বিতীয় বৃহত্তম স্টেডিয়াম। আগেও একটা ছোট স্টেডিয়াম ছিল। মাঠের পশ্চিম দিকে ছোট কংক্রিট গ্যালারি। তখন এই ক্রীড়াঙ্গনের নাম ছিল তিলক ময়দান। পশ্চিম দিকে একফালি জায়গায় গ্যালারি। বাকি তিন দিকে ছিল টিনের ব্যারিকেড।

১৯৮৮ সালে রাতারাতি তিলক ময়দানের খোলনলচে বদলে গেল। তিলক ময়দানে আন্তর্জাতিক মানের একটা স্টেডিয়াম, সঙ্গে ঝকঝকে ড্রেসিংরুম সব কিছুই তৈরি হয়ে গেল। এর নেপথ্যে যে মানুষটির নাম সবার আগে বলতে হবে তিনি হলেন আইএফএ-র তৎকালীন সচিব প্রদ্যুত কুমার দত্ত। কারণ তিনিই এমন একটা উদ্যোগ নিয়েছিলেন সেক্ষেত্রে একটা আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম করতেই হত রাজ্য সরকারকে। তবে হ্যাঁ, একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে রাজ্য সরকার সেই সময় যুদ্ধকালীন প্রস্তুতিতে এই মাঠ এবং স্টেডিয়াম নির্মাণ সম্পন্ন করেছে। রাজ্য সরকার পরে নিশ্চয়ই শিলিগুড়িতে স্টেডিয়াম নির্মাণ করত। তবে মানতেই হবে প্রদ্যুতদা যদি নেহরু আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজনের জন্য শিলিগুড়িকে নির্বাচন না করতেন তাহলে এত তাড়াতাড়ি তিলক ময়দান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা স্টেডিয়ামে পরিণত হত না।

শিলিগুড়িতে নেহরু কাপ আয়োজনের স্থান হিসাবে নির্বাচনের পর থেকেই তিনি ছুটে এসেছেন এই শহরে। কাজের তদারকির পাশাপাশি কীভাবে প্রতিযোগিতা সুষ্ঠুভাবে আয়োজন করা যায় সে ব্যাপারে আলোচনা করতেন।

এরকম বৃহৎ একটা কর্মযজ্ঞকে সফল করতে গেলে সবার আগে জরুরি অর্থ। এই দিকটা মাথায় রেখে তিনি এখানকার সব ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের সংস্থা FOCIN-এর সঙ্গে আলোচনা করেন। সেইসময় শিলিগুড়ির চেম্বার অফ কমার্স অর্থাৎ FOCIN-এর তরফ থেকে আমরা ২৫ লক্ষ টাকা দিয়েছিলাম সঙ্গে ৮ লাখ টাকার টিকিটও কিনেছিলাম। ঘটনা হল চেম্বার অফ কমার্স অর্থাৎ FOCIN-এর সচিব হিসাবে তখন থেকেই তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়। আমাদের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নন্দদা (নন্দভূষণ দাঁ) বরাবরই বলতেন ব্যবসায়ীরা অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করতে পারে। কিন্তু খেলাকে সফল করার দায়িত্ব ক্রীড়া সংগঠকদের। কথাটা ঠিক। তবু এতবড় একটা মহাযজ্ঞ সফল করার জন্য অর্থদাতাদেরও একটা ভূমিকা পালন করতেই হয়। সফল না হলে আর্থিক দিক থেকে সহযোগিতার ব্যাপারটাও যে মূল্যহীন হয়ে যাবে। তাই FOCIN-এর সচিব হিসাবে আমারও একটা দায়িত্ব পালন করতে হত। সেজন্য নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হত। প্রদ্যুতদাও প্রতিদিন ডেকে পাঠাতেন। সেই সূত্রে মানুষটিকে খুব কাছে থেকে বোঝার সুযোগ পেয়েছি। তিনি ছিলেন প্রবল ব্যক্তিত্ববান। খেলা আয়োজন করতে গিযে অনেকরকম বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হয়েও লক্ষ্যে তিনি ছিলেন অবিচল। অসম্ভব জেদি, কর্মঠ। কোনোরকম অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেননি। সেই সুবাদে সাফল্যও পেয়েছেন। শিলিগুড়ি তথা উত্তরবঙ্গের মানুষ নিশ্চয়ই ১৯৮৮ সালের নেহরু গোল্ড কাপের কথা ভুলতে পারবেন না। শুধু কাঞ্চনজঙ্ঘা স্টেডিয়াম নির্মাণই নয়, পাশাপাশি গোটা শহরের চেহারাটাই বদলে গেল জওহরলাল নেহরু গোল্ড কাপকে কেন্দ্র করে। আলোয় ঝলমল হয়ে উঠল গোটা শহর। বাস টার্মিনাল তৈরি হল, শহরের সদর রাস্তা হিলকার্ট রোডের পাশাপাশি তৈরি হল তথ্য কেন্দ্র। সবচেয়ে বড় একটা সমস্যা ছিল শিলিগুড়ি স্টেশন সংলগ্ন রেল গেট। প্রায় সবসময়ই যানজটের জন্য সমস্যা হত। সেখানে রাস্তাও চওড়া হওয়াতে সমস্যা মিটে গিয়েছিল। সবমিলিয়ে স্টেডিয়াম তথা গোটা শহরের উন্নয়নের নেপথ্যে বিশাল অবদান ছিল প্রদ্যুতদার।

তিনি আজ আর আমাদের কাছে নেই। প্রায় ২৯ বছর আগে তিনি ইহলোক ত্যাগ করেছেন। তবু মানুষটিকে যেন সবসময়ই দেখতে পাই। আজও চোখে ভাসে যেদিন প্রথম ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট স্পোর্টস ফেডারেশনের শীর্ষ কর্তা ক্ষীরোদ করকে সঙ্গে নিয়ে এই শহরে পা রেখেছিলেন। ভুলতে পারি না নেহরু গোল্ড কাপ টুর্নামেন্টের সেই দিনগুলি।

Copyright Ⓒ Prodyutdutta.com