বিশ্বাস অর্জন করেছিলাম

দেবব্রত সরকার (নীতু)

(দক্ষ ক্রীড়া সংগঠক)

প্রদ্যুতদা সম্পর্কে কিছু বলতে গেলে অনিবার্য ভাবে যাঁর নামটি বলতে হয় তিনি হলেন আমাদের প্রয়াত দাদা পল্টু দাস। সত্যি বলতে কি জীবনে যতটুকু পরিচিতি, ভালবাসা পেয়েছি সবই পল্টুদার জন্যে। ইস্টবেঙ্গল ক্লাবে এখন যে সব দায়িত্ব পালন করছি সবই পল্টুদা-র সান্নিধ্যে থেকে শিখেছি। সেরকমই প্রদ্যুতদার সঙ্গে পরিচয় এবং তাঁর সান্নিধ্যে আসার পিছনেও বড় ভূমিকা ছিল পল্টুদা-র।

১৯৭৮ সাল। ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের নির্বাচনে ডাক্তার নৃপেন দাস হেরে যান। ডাঃ দাসের অনুগামী ছিলেন পল্টুদা। এদিকে জর্জ টেলিগ্রাফে তখন দায়িত্বে প্রদ্যুতদা। ময়দানের বেশ কয়েকজন উদ্যোগী কর্মীকে নিয়ে ঘর সাজাচ্ছেন তিনি। সেই দলে ছিলেন বাচ্চু গুপ্ত। বাচ্চু গুপ্তকে অবশ্য আগেই জর্জে এনেছিলেন প্রদ্যুতদার মেজদাদা বিশ্বনাথ দত্ত। বাচ্চু গুপ্তকে বিশ্বাস করতেন বিশ্বনাথ দত্ত।

এদিকে ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর পল্টুদার গ্রুপের অনেকেরই ডেরা ছিল তালতলা ক্লাবে। সেক্ষেত্রে আমরা বেছে নিয়েছিলাম জর্জ টেলিগ্রাফ তাঁবু। সেই সময় একদিন পল্টুদা আমাকে নিয়ে যান প্রদ্যুতদার কাছে। আমার নাম সুপারিশ করেছিলেন তাঁর কাছে। বলেছিলেন, ‘নীতু খুব ভাল ছেলে, আপনার প্রয়োজনে জর্জ টেলিগ্রাফে নিতে পারেন।’ সেই সময় আমার কিন্তু খুব অভিমান হয়েছিল পল্টুদার ওপরে। সরাসরি জানতে চেয়েছিলাম, আপনি কি আমাকে জর্জ টেলিগ্রাফে দান করতে চাইছেন? না, না আমি শুধু আপনার সঙ্গেই থাকব। আসলে ময়দানে আমি পল্টুদাকে ছাড়া নিজেকে ভাবতেই পারতাম না। তবে এটাও ঘটনা পল্টুদার সঙ্গে থেকেও আমি প্রদ্যুতদারও বিশ্বাস অর্জন করেছিলাম। তাঁর ক্লাব পরিচালনায় জড়িত না হলেও অনেক ব্যাপারেই যখনই ডেকেছেন হাজির থাকতে ভুল করিনি।

ময়দানি রাজনীতিতে প্রদ্যুতদার খুব কাছের ছিলেন পল্টুদা। যে কোনও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পল্টুদার পরামর্শ নিতেন প্রদ্যুতদা। আইএফএ-তে তখন একটা টালমাটাল অবস্থা চলছিল। দূরদৃষ্টিসম্পন্ন পল্টুদা বুঝেছিলেন ওই অবস্থায় প্রদ্যুতদার মতো একজন ব্যক্তিই হাল ধরতে পারেন। আইএফএ-র হাল ধরার জন্য পরামর্শ দিয়েছিলেন পল্টুদা। তবে প্রথমদিকে প্রদ্যুতদা রাজি হননি। তখন তিনি জর্জ টেলিগ্রাফকে একটা শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে ব্যস্ত ছিলেন। পরবর্তীতে অবশ্য তিনি রাজি হয়েছিলেন। ১৯৮৫ সালে তিনি সচিব পদে নির্বাচিত হন। যাঁরা ময়দানি রাজনীতিতে জড়িত তাঁরা নিশ্চয়ই জানেন প্রদ্যুতদার সচিব হওয়ার পিছনে অন্তরালে বড় ভূমিকা ছিল পল্টুদার।

তার আগে ১৯৮৪ সালে আইএফএতে ভোটাভুটি না করে কোষাধ্যক্ষ পদ নিয়ে আদৌ আগ্রহী ছিলেন না প্রদ্যুতদা। সেই সময়ও তাঁকে বুঝিয়ে রাজি করিয়েছিলেন পল্টুদা। আগেই বলেছি প্রদ্যুতদার বিভিন্ন গঠনমূলক কাজে আমিও অনেক সময় জড়িত থেকেছি। যখনই ডেকেছেন হাজির হতে ভুল করিনি।

যেমন মমতা ব্যানার্জির ডাকে ‘সবুজ বাঁচাও’ আন্দোলনে, ভ্রাতৃ সংঘ ক্লাবের কর্ণধার চন্দ্রনাথ চ্যাটার্জি (গগনদা) ছিলেন কংগ্রেসের সক্রিয় সদস্য। আন্দোলনে লোক জড়ো করার দায়িত্বে ছিলেন তিনি। এ ব্যাপারে প্রদ্যুতদাকে সঙ্গে পেয়েছিলেন তিনি। আমাকে সকাল সাতটার মধ্যে ম্যাটাডোর ভাড়া করে লোক নিয়ে যেতে বলেছিলেন। কিন্তু প্রত্যাশামতো জনসমাগম হচ্ছে না দেখে হতাশ হয়েছিলেন চন্দ্রনাথবাবু। তখন তাঁকে আস্বস্ত করেছিলেন প্রদ্যুতদা। বলেছিলেন, ‘আর কেউ না আসুক নীতু ঠিক আসবেই।’ হ্যাঁ এই বিশ্বাসটুকু অর্জন করেছিলাম। চার ম্যাটাডোর ভর্তি লোক নিয়ে যখন হাজির হলাম তখন দেখলাম প্রদ্যুতদা হাসছেন। চন্দ্রনাথবাবুকে বলেছিলেন, ‘কী? এবারে খুশি তো।’ কথা রাখতে পেরে আমিও তখন খুব গর্ববোধ করছিলাম। স্বভাবতই উৎসাহিত হয়ে ম্যাটাডোর ভাড়ার টাকা চেয়েছিলাম। কিন্তু সেই মুহূর্তে আমাকে ধমক দিয়ে প্রদ্যুতদা বলেছিলেন, ‘আদর্শ সংগঠক হতে গেলে যেমন জনসংযোগ রাখতে হবে পাশাপাশি অর্থ সংগ্রহ করতে হবে। দুটো ব্যাপারেই পারদর্শী হতে হবে।’ প্রদ্যুতদার ওই কথাগুলো যে সর্বদা সঠিক পরবর্তীতে প্রতিটি ক্ষেত্রেই উপলব্ধি করেছি।

Copyright Ⓒ Prodyutdutta.com