(রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব)
ছোটবেলা থেকেই দত্ত পরিবারের সঙ্গে আমার মধুর সম্পর্ক ছিল। জর্জ টেলিগ্রাফ ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন হরিপদ দত্ত। তাঁরই দুই সুযোগ্য সন্তান বিশ্বনাথ দত্ত এবং প্রদ্যুত দত্ত। বাংলা তথা ভারতবর্ষে খেলাধুলা প্রসারের ক্ষেত্রে বিশুদা এবং প্রদ্যুতদার অবদান সর্বজনবিদিত।
বিশুদা দীর্ঘদিন ধরে আই.এফ.এ থেকে সি.এ.বি এমনকী সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে সদর্পে বিচরণ করেছেন। সেদিক থেকে প্রদ্যুৎদা অবশ্য বেশিদিন সুযোগ পাননি, অকালেই তিনি ইহলোক ত্যাগ করেছেন।
প্রদ্যুতদার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের পল্টু দাসের মাধ্যমে। সালটা সম্ভবত ১৯৭৫ বা ৭৬। প্রথম দিন থেকেই তাঁর স্নেহভাজন হবে ভেবেছিলাম। বিশুদাও আমাকে স্নেহ করতেন। এরকম দু-জন কিংবদন্তি ক্রীড়াব্যক্তিত্বের স্নেহভাজন হতে পেরে আমি নিজেকে ধন্য মনে করি।
কলকাতা তথা বাংলার ফুটবল প্রসারে একটা বড় ভূমিকা ছিল বিশুদার। প্রদ্যুতদা ছিলেন তাঁর মেজদার যোগ্য উত্তরসূরি। বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি প্রশাসনিক দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। কোনওরকম চাপের কাছে মাথা নত করেননি। আই.এফ.এ একটা স্বশাসিত নিরাপদ সংস্থা। এই ব্যাপারে তিনি কারো সঙ্গে আপস করেননি। এমনকী তৎকালীন রাজ্য সরকারের সঙ্গে সংঘাতে যেতেও পিছপা হননি।
তাঁর চরিত্রের একটা বৈশিষ্ট্য ছিল ক্রীড়া সংগঠন পরিচালনার পাশাপাশি তিনি ছিলেন যথার্থই একজন সমাজসেবী। সরাসরি রাজনীতি না করলেও তিনি ছিলেন জাতীয়তাবাদী। সেক্ষেত্রে কোনও রকম গোপনীয়তা অর্থাৎ নিজেকে প্রকাশ্যে না এনে শুধু দূর থেকে সমর্থন করেননি। প্রকাশ্যেই মুখ খুলেছেন। যেমন নয়ের দশকে মমতা ব্যানার্জির ডাকে ‘সবুজ বাঁচাও’ আন্দোলনে প্রকাশ্যে জনসভায় বক্তব্য রেখেছেন সিধু-কানু-ডহর এবং বি.বা.দী বাগে।
তিনি ছিলেন প্রখর বুদ্ধিমান। উচ্চশিক্ষিত এবং দূরদৃষ্টিসম্পন্ন। অত্যন্ত স্নেহ করতেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। মমতার লড়াকু মানসিকতা তাঁর মন জয় করেছিল। আজ থেকে প্রায় ৩০ বছর আগে মমতার মধ্যে রাজ্যের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রিত্বের ইঙ্গিত পেয়েছিলেন। তাঁর অনুমান যে ভুল ছিল না সেটা পরবর্তীতে আমরা প্রমাণ পেয়েছি। বলতে দ্বিধা নেই মমতা ব্যানার্জীর অগাধ শ্রদ্ধা ছিল তাঁর প্রতি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা হল তিনি মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে মমতাকে দেখে যেতে পারলেন না।
তিনি ছিলেন বাংলাপ্রেমী। তাঁর দেশাত্মবোধ আমাদের কাছে শিক্ষণীয়। প্রশাসক হিসাবে তাঁর তেজস্বী ভূমিকার কথা আগেই বলেছি। পাশাপাশি তিনি ছিলেন অসম্ভব জেদি ও সাহসী।
তাঁর চরিত্রের আর একটা বৈশিষ্ট্য ছিল কোনও বিশেষ দলের প্রতি দুর্বলতা না থাকা। আমরা রাজনীতি করলেও অনেকের মধ্যেই মোহনবাগান বা ইস্টবেঙ্গলের প্রতি একটু হলেও দুর্বলতা থাকে। সেদিক থেকে প্রদ্যুতদা ছিলেন ব্যতিক্রম। পল্টুদার সঙ্গে তাঁর অনেকদিনের অন্তরঙ্গতা। অন্তরঙ্গতা ছিল মোহনবাগানের টুটু বসু, বলরাম চৌধুরির সঙ্গেও। কিন্তু তাঁরা কেউই প্রদ্যুতদার সঙ্গে বাড়তি সুবিধা আদায় করতে পারেননি। এ ব্যাপারেও তিনি ছিলেন বিশুদার যোগ্য উত্তরসূরি।
বিশ্বনাথ দত্ত যেমন সামলেছেন জ্যোতিষচন্দ্র গুহ এবং ধীরেন দে-র মতো দুই প্রবাদপ্রতিম সচিবকে। সেরকম প্রদ্যুতদাও সামলাতেন প্রবল পরাক্রমশালী কর্মকর্তাদের। বলতে দ্বিধা নেই এই ব্যাপারে আমরা অর্থাৎ রাজনীতির লোকেরাও সব সময় কঠোর হতে পারি না। অনেক ক্ষেত্রেই মেপে পা ফেলতে হয়।
জনপ্রতিনিধি হিসাবে অনেক কিছু ভেবেচিন্তে পা ফেলতে হয়। অথচ একটা ক্রীড়াসংস্থার কর্ণধার হিসাবে তিনি সব সাবলীলভাবে পরিস্থিতি সামলেছেন। এ ব্যাপারে তিনি ছিলেন একশো শতাংশ নিরপেক্ষ।
এই মানুষটিকে ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের কর্ণধার হিসাবে খুবই প্রয়োজন ছিল। বাংলার ফুটবলের বর্তমান করুণ অবস্থা দেখে যন্ত্রণা হয়। তখনই মনে পড়ে প্রদ্যুতদার কথা। তিনি বেঁচে থাকলে বাংলার ফুটবলের অবস্থা এরকম অসহায় হত না। সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে তাঁকে সত্যিই খুব প্রয়োজন ছিল। একবার চেষ্টাও করেছিলেন। কিন্তু পারলেন না। কেন পারলেন না? থাক সে কথা।