ভারতীয় ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতেন

সুভাষ ভৌমিক

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রাক্তন ফুটবলার ও বিদগ্ধ প্রশিক্ষক

ফুটবল জীবনে জ্যোতিষ চন্দ্র গুহ, ধীরেন দে-কে খুব কাছে থেকে দেখেছি। দু-জন ছিলেন দুই বড় ক্লাবের কর্ণধার। আই এফ এ-র কর্ণধার হিসাবে দেখেছি বিশ্বনাথ দত্ত এবং অশোক ঘোষকে। এই চারজনের পরেই যাঁর নামটি আসবে তিনি হলেন প্রদ্যুত দত্ত। প্রদ্যুতদা-কে খুব কাছে থেকে দেখেছি, তাঁর সান্নিধ্য পেয়েছি। সমস্যায় পড়লে ছুটে গেছি। তিনি সবসময়ই সমাধানের পথ দেখিয়েছেন। তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গভীর হল ১৯৮৬ সালে, জর্জ টেলিগ্রাফ ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের কর্মচারী হিসাবে। ইনস্টিটিউটের মূল ভবন শিয়ালদহ কেন্দ্রের বাড়ি সংস্কারের প্রয়োজন ছিল। পর্যবেক্ষণের জন্য আমাকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। আমার পর্যবেক্ষণে তাঁর আস্থা অর্জন করেছিলাম।

ইনস্টিটিউটে আমার পদ ছিল ‘পাবলিক রিলেশন ম্যানেজার’ হিসাবে। আমার মূল দায়িত্ব ছিল ছাত্রদের ‘বায়োডাটা’ নিঁখুতভাবে রাখার। কীভাবে সেটা করতে হবে এই ব্যাপারে আমাকে গাইড করেছেন। তাঁর পরিষ্কার নির্দেশ ছিল, ‘যোগ্যতা থাকা সত্বেও কোনও ছাত্রকে বঞ্চিত করা যাবে না।’ সেই হিসাবে প্রাপ্ত নম্বর অনুযায়ী ক্রমতালিকা তৈরি করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। কোনও কোম্পানি থেকে ইন্টারভিউতে ডাকার ক্ষেত্রে মেধা অনুযায়ী তালিকা পাঠাতে অসুবিধা হত না। এই ব্যাপারটা হাতে ধরে শিখিয়েছেন প্রদ্যুত-দা।

জর্জ টেলিগ্রাফ স্পোর্টস ক্লাবের কর্ণধার হিসাবে তাঁকে খুব কাছে থেকে দেখেছি। আমাকে ফুটবল কোচ হিসাবে দায়িত্ব প্রথম দিয়েছিলেন প্রদ্যুতদা। ১৯৮৬ সালে জর্জ টেলিগ্রাফ স্পোর্টস ক্লাবের কোচ হিসাবে নিয়োগ করেছিলেন। সীমিত আর্থিক ক্ষমতায় থেকেও ভাল দল তৈরি করতেন। দল গঠনের ক্ষেত্রে আমার সঙ্গে আলোচনা করতেন। ১৯৮৭ সালে সুরজিৎ সেনগুপ্ত ক্লাব ফুটবলে না খেললেও আমার অনুরোধে তখন দলে নিয়েছিলেন। আমার নির্বাচন যে ভুল ছিল না সেটা বেশ কয়েকটা ম্যাচে সুরজিৎ প্রমান করেছিল। আমাদের দলে বেশিরভাগ ফুটবলারই ছিল অনভিজ্ঞ-তরুণ। ওদের গাইড করার জন্য দরকার ছিল সুরজিতের মতো একজন পোড় খাওয়া নেতার। সেই শুরু দায়িত্ব সুরজিৎ যোগ্যতার সঙ্গে পালন করেছিল। সীমিত শক্তি নিয়েও জর্জ টেলিগ্রাফের হতাশ করেনি। এই ব্যাপারে প্রেরণা দাতা ছিলেন প্রদ্যুত দা।

১৯৮৬-৮৭ সালে সন্তোষ ট্রফিতে বাংলা দলের কোচ ছিলেন নিমাই গোস্বামী, টেকনিক্যাল ডিরেক্টর ছিলেন বিদগ্ধ কোচ অরুণ সিনহা। আমার কোচিং ডিপ্লোমা ছিল না বলে ম্যানেজারের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। এতটাই দূরদর্শী ছিলেন, তাই বুঝেছিলেন সিনিয়র ফুটবলারদের সামলাবার কাজটা আমাকে দিয়ে হবে। ম্যানেজার হিসাবে জুতো সেলাই থেকে চন্ডীপাঠের কাজ করার পাশাপাশি দল নির্বাচনের ক্ষেত্রেও আমার ভূমিকা থাকত। বলতে দ্বিধা নেই এই ব্যাপারে প্রদ্যুতদা এগিয়ে দিয়েছিলেন। সেবারে কলকাতায় অনুষ্ঠিত সন্তোষ ট্রফিতে বাংলা চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। ফাইনালে প্রদীপ দা-র প্রশিক্ষণাধীন ভারতীয় রেলওয়ে দলের বিপক্ষে ২-০ গোলে জিতেছিলাম। ফাইনালে নিয়মিত সাত জনকে বাইরে রেখে দল গড়েছিলাম। এই ব্যাপারে অনেকে প্রশ্ন তুললেও প্রদ্যুতদা আমল দেননি। কোচিং জীবনে একবারই ভারতীয় দলের দায়িত্ব পেয়েছিলাম। ১৯৮৯ সালে এই দায়িত্ব পেয়েছিলাম প্রদ্যুতদা-র জন্যই।

১৯৮৮ সালে শিলিগুড়িতে নেহরু কাপ আয়োজন আইএফএ সচিব হিসাবে প্রদ্যুতদা-র সেরা সাফল্য। সেবারের প্রতিযোগিতা বর্ণময় করেছিলেন। ঘরে, বাইরে নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও লক্ষ্যে অবিচল ছিলেন তিনি। সেই আসরে প্রদীপদা (ব্যানার্জি), শান্ত মিত্র এবং আমাকেও নিয়ে গিয়েছিলেন শিলিগুড়িতে। তবে ঘুরে বেড়াবার জন্য নয়। আমাদেরও কিছু দায়িত্ব দিয়েছিলেন। প্রতিটি ম্যাচে ভারতীয় ফুটবলারদের পারফরমেন্স নিয়ে রিপোর্ট করার জন্য দায়িত্ব দিয়েছিলেন। বুঝতেই পারছেন তাঁর এই চিন্তাধারা কতটা সুদূরপ্রসারী ছিল, ভারতীয় ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি কতটা ভাবতেন।

Copyright Ⓒ Prodyutdutta.com