(আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রাক্তন ফুটবলার)
১৯৯০ সালের মার্চ-এপ্রিল মাসের ঘটনা। অফিস থেকে বাড়ি ফিরে দেখছি সাংবাদিকের ভিড় কী ব্যাপার! জানতে চাই স্ত্রী রাই মুচকি হেসে বলেছিল একটা ভাল খবর আছে। খবরটা অবশ্য বলেনি। সাংবাদিকের মুখোমুখি হওয়ার পরে তাঁদের কয়েকজনের প্রশ্ন ছিল কবে থেকে প্র্যাকটিসে নামছেন?
কাদের প্র্যাকটিস বুঝতেই পারছিলাম না। সাংবাদিকের কাছ থেকেই জানতে পারলাম আই এফ এ থেকে সন্তোষ ট্রফিতে বাংলা দলের কোচ হিসাবে আমার নাম নির্বাচিত হয়েছে। খবরটা নিশ্চয়ই গর্বের কিন্তু আমি কি পারব এরকম একটা গুরু দায়িত্ব পালন করতে? বিশেষ করে সে বছর থেকেই চালু হয়েছিল সন্তোষ ট্রফি অর্থাৎ জাতীয় ফুটবলে ভূমি পুত্ররাই (অর্থাৎ নিজ রাজ্যে) সেই রাজ্য দলের হয়ে খেলতে পারবে? স্বভাবতই কাজটা আমার কঠিন মনে হচ্ছিল। এরকম যখন ভাবছি তখন ফোন এল প্রদ্যুতদা-র কাছ থেকে। তাঁকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেছিলাম, এই কাজ আমার দ্বারা সম্ভব হবেনা। কারণ, আমি তখনও কলকাতার কোনও ক্লাবে কোচিং করাইনি। সেখানে সরাসরি একটা রাজ্য দলে! আমার প্রতিক্রিয়া শেষ না হতেই প্রদ্যুতদা বেশ জোরের সঙ্গেই বলেছিলেন, ‘আমি এই গৌতম সরকারকে চিনি না। আমি যে গৌতম সরকারকে চিনি সে সব সময়ই চ্যালেঞ্জ নিতে ভালোবাসে। যে কোনও কঠিন কাজে ভয় পেয়ে পালিয়ে যায় না।’ তাঁর কাছ থেকে এরকম একটা বিশেষণ পাওয়ার পরে আমার আর ‘না’ বলার প্রশ্নই ছিলনা।
তিনি পালিয়ে যাওয়ার পাত্র ছিলেন না। সত্যি এই ব্যাপারে আমি তাঁর মতোই। কোনও কঠিন ম্যাচ, প্রতিপক্ষে যতবড় তারকাই থাকুন আমি কখনও খেলার আগে হার স্বীকার আমার অভিধানে লেখা ছিলনা। আর ঠিক এই কারণেই প্রদ্যুতদাকে আমার ভাল লাগত।
তিনি সব সময়ই চ্যালেঞ্জ নিতে ভালবাসতেন। যে কাজ করবে অন্যরা সাহস পেতেন না, সেখানে প্রদ্যুতদা ছিলেন সবসময়ই ব্যতিক্রম।
প্রবল পরাক্রমশালী মহামেডান ক্লাবকে সাসপেনসন, তারকা ফুটবলারদের কাছ থেকে জরিমানা আমার এই ধরনের কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে সাহস দেখিয়েছেন।
সর্বোপরি শিলিগুড়িতে নেহরু কাপের মতো আন্তর্জাতিক ফুটবল আয়োজনের দুঃসাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণ। টেবিল টেনিসের শহর শিলিগুড়ি রাতারাতি হয়ে উঠল ফুটবলের শহর। গোটা শহরের খোলনলচে বদলে গেল প্রদ্যুত দা-র একটা বৈপ্লবিক সিদ্ধান্তে।
ফুটবলকে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে প্রথমে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তাঁর মেজদাদা বিশ্বনাথ দত্ত ১৯৭৩ সাল থেকে। প্রথমে আইএফএ শিল্ড, সঙ্গে জুনিয়র ন্যাশনাল ফুটবল। কৃষ্ণনগর থেকে বার্ণপুর, পুরুলিয়া, শিলিগুড়ি এরকম বেশ কয়েকটি জেলা শহরে। এই ব্যাপারে তিনিই পথ প্রদর্শন। সেক্ষেত্রে প্রদ্যুতদার একেবারে আন্তর্জাতিক আসর করেছিলেন শিলিগুড়িতে। তাঁর সিদ্ধান্ত প্রথমে অনেকেই মেনে নিতে পারেন নি। অনেকে অসম্ভব মনে করেছিলেন। কিন্তু প্রদ্যুতদার অভিধানে অসম্ভব বলে কিছু ছিল না। তিনি যে কোনও কঠিন কাজকে চ্যালেঞ্জ হিসাবে গ্রহণ করতেন এবং সফলও হয়েছিলেন। এই জন্য তাঁর প্রতি সবসময়ই একটা আলাদা শ্রদ্ধা থাকবে।
বাংলার ফুটবলের সাফল্যের পিছনে দত্ত পরিবারের অবদান কেউ অস্বীকার করতে পারবেন না। সত্তর দশকে বাংলা সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে যে একচেটিয়া সাফল্য পেয়েছিল তাঁর পিছনে একটা বড় ভূমিকা ছিল প্রদ্যুতদার মেজদাদা, তৎকালীন আই এফ এ সচিব বিশ্বনাথ দত্ত-র। ১৯৬৮ সালে জুনিয়র ন্যাশনাল ফুটবল অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই সময় আই এফ এ-র সচিব ছিলেন বিশ্বনাথ দত্ত। যে কোনও কারণে জব্বলপুরে খেলা পিছিয়ে গিয়েছিল। তৎসত্বেও বিচক্ষণ বিশুদা (বিশ্বনাথ দত্ত) বাংলা দলের অনুশীলন বন্ধ করেননি। বাংলা দলে সে বছর ছোটদল থেকে গোলরক্ষক তরুণ বসু, সুধীর কর্মকার, সমরেশ চৌধুরী। সুভাষ ভৌমিক, সুকল্যাণ ঘোষ দস্তিদার, স্বপন সেনগুপ্ত, এবং আমি, নির্বাচিত হয়েছিলাম। আমাদের কোচ ছিলেন অচ্যুৎ ব্যানার্জী। একটানা প্রায় তিন মাস স্যার অচ্যুৎ ব্যানার্জীর তত্ত্ববধানে আমরা রবীন্দ্রসরোবর স্টেডিয়ামে নিয়মিত অনুশীলন করেছিলাম। সেই দিনগুলোতে বিশুদা প্রতিদিন সকালে আমাদের টিফিন নিয়ে হাজির হতেন। কোচ, ফুটবলার এবং কর্মকর্তার সঙ্গে একাত্মতা তৈরি হয়েছিল রবীন্দ্রসরোবর মাঠ থেকেই। ফলস্বরূপ আমরা দাপটের সঙ্গে খেলেই চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম। ফাইনালে অন্ধ্রপ্রদেশের বিপক্ষে ২-০ গোলে জিতেছিলাম। দুটি গোলই করেছিল অধিনায়ক স্বপন সেনগুপ্ত।
পরবর্তীতে দেখা গেছে ১৯৬৮ সালের তিন মাসের শিবিরের সুফল আমরা পেয়েছিলাম। তরুণ, সুধীর, সমরেশ, সুভাষ, সুকল্যান, স্বপন, এবং আমি বড় দলের পাশাপাশি জাতীয় দলে জায়গা করে নিয়েছিলাম।
বিশ্বনাথ দত্ত-র উত্তরসূরী হিসাবে প্রদ্যুত দত্ত-র নামও বলতে হবে। তিনি একই সঙ্গে জর্জ টেলিগ্রাফ ক্লাব এবং আই এফ এ দক্ষতার সঙ্গে সামলেছেন।
তিনি বেশ কয়েকজন প্রাক্তন ফুটবলারকে বাংলা দলের কোচ বা ম্যানেজারের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। সুভাষ ভৌমিক, প্রসূন ব্যানার্জী, শ্যাম থাপার নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
বাংলা দলের দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষেত্রে আমি যখন একটু দ্বিধাগ্রস্ত ছিলাম তখন একটা কথা আমাকে আবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন, life is a challenge, accept it. বাংলার ফুটবলের উন্নয়নের জন্য আরও অনেক পরিকল্পনা তাঁর ছিল। কিন্তু....।