(বিশিষ্ট ক্রীড়া সাংবাদিক)
আইএফএ-র প্রয়াত সচিব প্রদ্যুত দত্তের কথা মনে হলে প্রথম যে ঘটনাটি আমার মনের পটে ভেসে ওঠে সেটা হল, কলকাতা শহর জুড়ে মহমেডান স্পোর্টিং সমর্থকরা বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন। ধর্মতলার মোড়ে দাউ দাউ করে জ্বলছে কুশপুতল। মীর মহম্মদ ওমরের নেতৃত্বে আইএফএ অফিসের দিকে এগিয়ে আসছে একটি মিছিল। মিছিলের প্রথমে রয়েছেন বোরখা পরিহিত নারীরা। ইসলাম বিপন্ন, এই স্লোগানে মুখরিত হচ্ছে রাজপথ। অটল, নিষ্কম্প প্রদ্যুত দত্ত বসে আছেন প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিটে আইএফএ অফিসে। একদিন আগেই মহমেডান স্পোর্টিং ক্লাবকে দ্বিতীয় ডিভিশনে নামিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তটি গৃহীত হয়েছে আইএফএ-এর গভর্নিংবডির সভায়। সেই নিয়ে উত্তাল কলকাতা। যে কোনও মুহূর্তে আইন শৃঙ্খলা ভেঙে পড়তে পারে। মধ্য কলকাতায় কংগ্রেস নেতা মীর মহম্মদ ওমরের প্রভাব তখন অপরিসীম। ওমর নিজেও পুলিশের খাতায় প্রায়শই ওয়ান্টেড তালিকায় থাকেন। সেই দুপুরে আইএফএ অফিসে বসেছিলাম অনুসন্ধিৎসু রিপোর্টার হিসেবে। বেলা সওয়া তিনটে নাগাদ একটি টেলিফোন এল প্রদ্যুত দত্তের কাছে। সম্ভবত পুলিশের কোনও বড় কর্তার। প্রদ্যুতদা টেলিফোনে সাফ জানালেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব আপনাদের। আমার দায়িত্ব বাংলার ফুটবল চালানো। মাফ করবেন, কোনও আপোষ আমি করতে পারব না। সেদিন এক আপসহীন প্রদ্যুত দত্তকে দেখেছিলাম। সন্ধ্যায় মীর মহম্মদ ওমর তাঁর হুডখোলা জিপে আমাদের কয়েকজন সাংবাদিককে নিয়ে খিদিরপুরের একটি রেস্তোরাঁয় বিরিয়ানি খাওয়াতে খাওয়াতে বলেছিলেন, উনকা হিম্মৎ হ্যায়। ম্যায় উনকো সালাম করতা হুঁ। আসলে, ওমরও ভাবতে পারেননি তাঁর এই জঙ্গি আন্দোলনের পরেও প্রদ্যুত দত্ত অনমনীয় থাকবেন। পরেরবার মহামেডানকে দ্বিতীয় ডিভিশনেই খেলতে হয়েছিল। এমনই ছিলেন প্রদ্যুত দত্ত, আমাদের মত সাংবাদিকদের কাছে প্রদ্যুতদা।
কোন ছোটবেলায় শিয়ালদহের কাছে ট্রাম দুর্ঘটনায় একটি পা হারিয়েছিলেন। আসল পায়ের বদলে ছিল নকল কাঠের পা। তাই, সামান্য টেনে হাঁটতেন তিনি। আর সেই দুর্ঘটনাই সম্ভবত প্রদ্যুত দত্তকে অনমনীয় হতে শিখিয়েছিল। যিনি জীবনের সঙ্গে আপস করেননি, তিনি ফুটবলের জন্য আপস করবেন তা ভাবা যায় না। সেই সময়কার ফুটবল সাংবাদিকদের মধ্যে যে কোনও কারণেই হোক আমাকে একটু পছন্দ করতেন। কত দিন গেছে তাঁর অপূর্ব মিত্র রোডের বাড়িতে ডেকে কত গোপন খবর দিয়েছেন। আসলে প্রদ্যুত দত্তর মতো প্রশাসক বিরল। দাদা বিশ্বনাথ দত্তর আদর্শে নিজেকে প্রাণিত করেছিলেন। কিন্তু চেহারায় এবং চরিত্রে দু’জনেই ছিলেন একদম ভিন্ন গোত্রের। বিশ্বনাথ দত্ত তখন ক্রিকেট প্রশাসন নিয়ে ব্যস্ত। দত্ত পরিবারের সুযোগ্য সন্তান প্রদ্যুত দত্ত ফুটবলের ভার নিলেন। বিশ্বনাথবাবু ছিলেন ছোটখাট চেহারার অনমনীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী। প্রদ্যুতবাবু তাঁর বিপরীত। বড় কাঠামোর চেহারা, গায়ের রং শ্যামলা। কিন্তু একটা বিষয়ে দু’জনের দুর্দান্ত মিল। তা হল দু’জনেই আপসহীন। এই প্রদ্যুত দত্তর সঙ্গে একটা এনকাউন্টার আজও আমার মনে আছে। শিলিগুড়িতে নেহরু কাপ সংগঠন করেছিলেন প্রদ্যুত দত্ত। এই টুর্নামেন্ট করতে গিয়ে বিপুল পরিমাণ দেনা হয় আইএফএ-র। দেনার দায় সামলাতে আইএফএ অফিসটিই মর্টগেজ দিয়ে দেন ইউনাইটেড ব্যাঙ্ককে। খবরের টিপসটি পেয়েছিলাম নেতাজি স্টেডিয়াম সংলগ্ন এআইএফএফ অফিসে বসে। কিন্তু এমন একটা খবর তো কনফারমেশন ছাড়া করা যায় না। তাই, ধর্মতলা চত্বরের ব্যাঙ্কগুলিতে ঢুঁ মারা শুরু হল আমার। খবর পেয়েছিলাম ধর্মতলা চত্বরের কোনও রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাঙ্কের কাছে বন্ধক রাখা হয়েছে আইএফএ-র বাড়িটি। বহু ঘোরার পর, কাউন্সিল হাউস স্ট্রিটে মুম্বইয়ের বিখ্যাত পরিচালক হৃষীকেশ মুখোপাধ্যায়ের জামাতা, যিনি তখন ইউবিআইয়ের অফিসার খবরটি কনফার্ম করলেন। শুধু কনফার্ম করাই নয়, ফাইলটিও আমাকে দেখিয়ে দিলেন। ক’দিনের মধ্যে আইএফএ-এর সাধারণ সভা ছিল প্যারিস হলে। যেদিন সভা সেদিন আইএফএ-র বাড়ির ছবি দিয়ে যুগান্তর সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় খবরটি প্রকাশিত হল। গোটা কলকাতা জুড়ে হইচই শুরু হল। সাধারণ সভায় বিকেলে ঝড় উঠল। সভার এক ঘর লোকের সামনে প্রদ্যুত দত্ত সম্পূর্ণ খবরটি অস্বীকার করলেন। বললেন, কাগজ ভুল খবর লিখেছে।
আইএফএ অফিস বন্ধক দেওয়ার কোনও ঘটনা ঘটেনি। আমার সেদিনের অবস্থা কল্পনাই করতে পারেন। ভাবছি, অফিসে ফিরে কী ধমক খেতে হবে। চাকরি থাকবে কি? যেতেও পারে। বুকের ধুকপুকানি তখনই শুরু হয়ে গেল। তখন রেওয়াজ ছিল আইএফএ সচিব সাধারণ সভার শেষে সাংবাদিক বৈঠক করবেন। সেইমতো প্যারিস হলে সাংবাদিক বৈঠক করলেন প্রদ্যুত দত্ত। কয়েকজন সাংবাদিক, আইএফএ-র অফিস বাড়ি বন্ধক দেওয়ার কথাটি তুললেন। হঠাৎই প্রদ্যুত দত্ত একটা বম্বশেল ছাড়লেন, সাংবাদিক হিসেবে জয়ন্তকে আমি অভিনন্দন জানাচ্ছি। ও যা লিখেছে ১০০ ভাগ সঠিক। আইএফএ অফিস আমি বন্ধক দিয়েছি। কিন্তু সাধারণ সভায় সেটা অস্বীকার না করে আমার উপায় ছিল না। জয়ন্ত যে ব্যাপারটা খুঁজে বের করেছে, তার জন্য কৃতিত্ব ওর প্রাপ্য। তরুণ বয়স ছিল সেইসময়। আবেগে চোখের জল এসে যেত মাঝেমধ্যেই। সেদিন রাতে প্যারিস হলের মাঠে দাঁড়িয়ে কার্যত ঝারঝর করে কেঁদে ফেলেছিলাম। হঠাৎ পিঠে একটা চওড়া হাতের স্পর্শ পেলাম। প্রদ্যুত দত্ত। বললেন, সাংবাদিকের জীবনে ভবিষ্যতেও এইরকম ঘটনার মুখোমুখি হতে হবে। তৈরি থেকো। সেদিন প্রদ্যুত দার উপদেশ অক্ষরে অক্ষরে ফলে গিয়েছিল। আজও তাঁর সেই কথা মনে পড়ে নানা সময়ে, নানা ঘটনায়। সঙ্গে আমার একটা কনফ্রনটেশন হয়ে গেল ১৯৮৮ সালে মুম্বইয়ে অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশনের নির্বাচনে। এই নির্বাচন কভার করতে যুগান্তর থেকে আমি এবং আনন্দবাজার থেকে আমার অন্যতম বন্ধু রূপক সাহা গিয়েছিলাম মুম্বইয়ে। প্রদ্যুত দত্তের ক্যাম্পটি ছিল ইন্ডিয়া গেটের কাছে তাজমহল হোটেলে। আর প্রতিদ্বন্দ্বী অশোক ঘোষের ক্যাম্পটি ছিল স্পোর্টস ক্লাব অফ ইন্ডিয়ায়। প্রদ্যুত দত্তের ক্যান্ডিডেট ছিলেন শিলচরের ফুটবল কর্তা সন্তোষমোহন দেব। অশোক ঘোষের প্রার্থী প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সি। সেবার মুম্বইয়ে এমনই নির্বাচন হয়, যাতে বিমানবন্দর থেকে কিডন্যাপিং, গুম করা, মারপিট সব হল। প্রথম থেকেই আমার মনে হয়েছিল, প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সির দিকে পাল্লা ভারী। সেই মর্মে রিপোর্টও করছিলাম যুগান্তরে। প্রদ্যুতদা-র এটি পছন্দ হয়নি। তিনি দেখা হলেই আমাকে একটু কটাক্ষ করতেন। যদিও সেবার প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সিই বিজয়ী হয়েছিলেন ভোটে। ভোট হয়ে যাওয়ার পর তাজমহল হোটেলের লবিতে দাঁড়িয়ে প্রদ্যুতদা বলেছিলেন, তাহলে জিতে গেলে। মনে রাখবে, ফুটবলে হার-জিৎ দুইই আছে। আজ জিতলে বটে, পরে হারতেও পার। সেইভাবে সাংবাদিক হিসেবে মনটা তৈরি রাখবে।
কেমন প্রশাসক ছিলেন প্রদ্যুত দত্ত? আমাকে যদি প্রশ্ন করা হয়, তাহলে অকপটে বলব, সর্বকালের অন্যতম সেরা ভারতীয় ক্রীড়া সংগঠকের তালিকায় প্রদ্যুত দত্তর নামটি থেকে যাবে। যেমন, প্রোজ্জ্বল থাকবে বিশ্বনাথ দত্তের নামও। আসলে বাংলার ফুটবলে দত্ত পরিবারের অবদানের কথা কে আর কবে ভুলতে পারে। একটা সময় ছিল, যখন বাংলার ফুটবলের শেষ কথা ছিলেন প্রদ্যুত দত্ত। ১৯৯৪ সালের ১৬ নভেম্বর প্রয়াত হন তিনি। সাড়ে ৯ বছর আইএফএ সচিব হিসেবে কাজ করেছেন। সেই সময়টায় তিনি এক মুহূর্তও কোনও কিছুর সঙ্গে আপসে যাননি। এই বৈশিষ্টটিই প্রদ্যুত দত্তকে অনন্য করেছিল।