(প্রাক্তন ফুটবলার, জর্জ টেলিগ্রাফ)
১৯৭৫ সালে খিদিরপুর ক্লাবের হয়ে আমরা বেশ কয়েকজন ধারাবাহিকভাবে ভাল খেলেছিলাম। ১৯৭৩ থেকে একটানা তিন বছর খিদিরপুরেই খেলেছি। স্বভাবতই ক্লাবে আমার একটা আলাদা প্রভাবও ছিল। তবু ১৯৭৬ সালে জার্সি বদলে যোগ দিয়েছিলাম জর্জ টেলিগ্রাফে ক্লাবে। সে বছর এরিয়ান ক্লাবও আমার ব্যাপারে আগ্রহী ছিল। আমার মামা কোল ইন্ডিয়াতে চাকরি করতেন। সেখানে মামার সহকর্মী ছিলেন এরিয়ান ক্লাবের সচিব অশোক মিত্র (নন্টুদা)। সেই সূত্রে আমাকে এরিয়ানে সই করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। আমার মামারও সেরকমই ইচ্ছা ছিল। কিন্তু নন্টুদা আমার সঙ্গে টাকাপয়সার ব্যাপারে কোনও কথা বলেননি।
অ্যাডভ্যান্সও দেননি। তাই আমিও কোনও পাকা কথা দিইনি। সেই সময় (ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে) একদিন দুপুরে আমার কর্মস্থল জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়াতে একটা সাদা রঙের অ্যাম্বাসাডার গাড়ি এসে থামল। গাড়ি থেকে নামলেন ময়দানের একজন পরিচিত রিক্রুটার আদিত্য চৌধুরি। আমাকে বললেন, গাড়িতে ওঠো। তোমার সঙ্গে কথা আছে। তিনিই আমাকে নিয়ে গেলেন জর্জ টেলিগ্রাফ তাঁবুতে। সেখানে অপেক্ষা করছিলেন জর্জ টেলিগ্রাফ ক্লাবের তৎকালীন সচিব প্রদ্যুত দত্ত। দু-একটা কথা বলার পরই বললেন, আমাদের ক্লাবে খেলতে হবে। শুরুতেই এরকম একটা প্রস্তাব শুনে আমি একটু দ্বিধাগ্রস্ত ছিলাম। কারণ আমার মামার সঙ্গে এরিয়ানের অশোক মিত্র-র অন্তরঙ্গতা ছিল। বলেছিলাম আমি তো এরিয়ানকে কথা দিয়েছি। কিন্তু একথা জানিয়েও তাঁর হাত থেকে ছাড়া পেলাম না। কারণ ময়দানের সব খবর তাঁর নখদর্পণে থাকত। তিনি জানতেন এরিয়ানের সঙ্গে কথা হলেও তারা আমাকে তখনও অ্যাডভান্স করেনি। তাই প্রদ্যুতদা জানতে চাইলেন অ্যাডভান্সের ব্যাপারটাও। পরক্ষণেই বললেন, ‘অ্যাডভান্সই যখন দেয়নি তখন আবার কথা কীসের?’ আমাকে আর একটা কথা বলারও সুযোগ দিলেন না। তাঁর গাড়িতে তুলে নিয়ে সোজা চলে এলেন ভবানীপুরে ৩১এ, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি রোডের বাড়িতে। সেদিনই আমার হাতে অ্যাডভান্স ধরিয়ে দিয়েছিলেন।
জর্জ টেলিগ্রাফে সে বছর কোচ ছিলেন ল্যাংচা মিত্র। কিন্তু লিগের দু-তিনটে ম্যাচ পরেই দায়িত্বে এসেছিলেন শান্ত মিত্র। শান্তদার কোচিং এবং প্রদ্যুতদার অভিভাবকত্ব শুরু থেকেই জর্জ হয়ে উঠেছিল সংঘবদ্ধ একটা দল। প্রদ্যুতদার ক্যাডারবাহিনীও খুব সক্রিয় ছিল। পুঁটেদা, বাচ্চুদা, আদিত্য চৌধুরি, বাবলু বসু - এঁরা সবাই প্রদ্যুতদার নির্দেশমতো চলতেন। ফুটবলারদের যাতে কোনওরকম অসুবিধা না হয় সেদিকে নজর রাখতেন। এককথায় নিখুঁত টিমওয়ার্ক ছিল প্রদ্যুতদার।
সে বছর আমাদের অনুশীলন হত জর্জ টেন্টের পাশে সিটি অ্যাথলেটিক ক্লাবের মাঠে। সিটি মাঠের অবস্থা তখনও যথেষ্ট ভালই ছিল। একদিন প্রচন্ড গরমে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। ওষুধপথ্য কেনার জন্য প্রদ্যুতদা ডেকে ৫০০টাকা দিয়েছিলেন। এজন্য কারও কাছে তদ্বির করতে হয়নি। আমার যে টাকা দরকার তিনি নিজেই উপলব্ধি করেছিলেন।
সে বছর কলকাতা লিগে দূরন্ত ফুটবল খেলেছিল জর্জ। লিগের শুরুতে পূর্ণ সময়ে মোহনবাগানকে প্রায় রুখেই দিয়েছিলাম। খেলার মধ্যেই হাবিবদা কানের সামনে বেশ কয়েকবার বলেছেন ‘ছোড়দে বাবু’। সুভাষ ভৌমিকের সঙ্গে মরণপন লড়াই করেছিল মনোরঞ্জন। কিন্তু সারাক্ষণ লড়াই করেও হার বাঁচাতে পারিনি। শেষদিকে কর্নার থেকে উড়ে আসা বল যখন তালুবন্দি করার জন্য উঠতে যাচ্ছি তখন সুভাষদা আমাকে ধরে রেখেছিলেন। সেই সুযোগে আকবর গোল করেছিল। অর্থাৎ ‘অবৈধ’ গোল।
আমার কাছে সেদিনের ম্যাচ ছিল জীবন-মরণ লড়াই। ম্যাচের আগে শহর জুড়ে প্রচার ছিল জগদীশকে ‘ম্যানেজ’ করেছে মোহনবাগান। আইএফএ শিল্ডেও আমরা মোহনবাগানের সঙ্গে সমানে টক্কর দিয়েছিলাম। মোহনবাগানের বিপক্ষে সেমিফাইনালে খেলার আগে কাশ্মীরে জুনিয়র ন্যাশনালে জর্জ টেলিগ্রাফ থেকে আমি, মনোরঞ্জন, বিপ্লব মজুমদার বাংলা দলে সুযোগ পেয়েছিলাম। ফাইনালের পরদিনই ছিল শিল্ডের সেমিফাইনাল। আমাদের তিনজনকেই বিমানে কলকাতায় আনার ব্যবস্থা করেছিলেন প্রদ্যুতদা।
লিগে মোহনবাগান অনৈতিকভাবে হারিয়েছিল। তার একটা যোগ্য জবাব দেওয়ার জন্য তৈরি হয়েছিলাম আমরা। কিন্তু দুঃখজনক ঘটনা হল, কলকাতায় গিয়ে শুনলাম শহর জুড়ে আমাকে নিয়ে অপপ্রচার যে, ‘জগদীশ ঘোষ ম্যানেজ’। রাগে, অভিমানে ক্লাবে গিয়ে আমাকে দলে না রাখার জন্য কোচ শান্ত মিত্রকে ক্ষোভের কথা জানিয়েছিলাম। কিন্তু আমার অনুরোধকে পাত্তাই দিলেন না ওঁরা দু-জন। জামা ধরে শান্তদা বলেছিলেন, ‘ওসব আজেবাজে কথায় কান দিতে নেই।’ এমনই কথা বলেছিলেন প্রদ্যুতদাও। ‘গুজবে কান না দিয়ে, মাঠে নেমে সব মিথ্যে প্রমাণ করে দাও।’ আমার ফুটবলজীবনে অন্যতম সেরা ম্যাচ ছিল সেদিন। শেষ পর্যন্ত আমরা হারলেও আমাদের গোটা দলটাই সেদিন উজ্জীবিত ছিল।
১৯৭৭ সালে ইস্টবেঙ্গল ক্লাব থেকে ডাক পেয়েছিলাম। খবরটা আন্দাজ করেছিলেন প্রদ্যুতদা। কালীঘাটে পূজো দিয়ে চিন্ময় চ্যাটার্জিকে সঙ্গে নিয়ে আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন জীবনদা। বাবার সঙ্গে কথাও বলেছিলেন। জর্জের হয়ে উইথড্র করাতে নিয়ে যাওয়া হল তখন আইএফএ অফিসে হাজির ছিলেন জীবন চক্রবর্তী ও পল্টু দাস। আইএফএ অফিসের দোতলায় ওঠার সিড়িতে রেলিং ধরে দাঁড়িয়েছিলেন জীবনদা-পল্টুদা। দু-জনই আমাকে উইথড্র করতে নিষেধ করেছিলেন। বলেছিলেন ইস্টবেঙ্গলে অনেক বেশি টাকা পাবে। কিন্তু ওদের অনুরোধ রাখা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। আমাকে সেবার প্রদ্যুতদা সাত হাজার টাকা দিয়েছিলেন।
১৯৭৭ সালেও দারুণ ছন্দে ছিল জর্জ টেলিগ্রাফ। দার্জিলিং গোন্ড কাপে একটাও গোল হজম না করে আমরা চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম। জর্জ টেলিগ্রাফে থাকাকালীন কাঠমান্ডুতে অনুষ্ঠিত চতুর্দলীয় আন্তর্জাতিক ফুটবলে জাতীয় দলে খেলার সুযোগ পেয়েছিলাম। ১৯৭৭ সালে এশীয় যুব ফুটবলে ভারতীয় দলে খেলেছি।
ফুটবলারদের প্রাণ দিয়ে ভালবাসতেন। সেখানে কোনও কৃত্রিমতা বা লোকদেখানো ব্যাপার ছিল না। যাঁরা তাঁর ক্লাব জর্জ টেলিগ্রাফে খেলেছেন প্রতেকেই তাঁর স্নেহধন্য। পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন দক্ষ প্রশাসক। তাঁর অনেক প্রমাণ আমরা আইএফএ সচিব থাকাকালীন সময়ে দেখেছি।
সম্ভ্রান্তশালী পরিবারের মানুষ হিসাবে তাঁর চলনে আচরণে ছিল আভিজাত্যের ছাপ। বাংলার ক্রীড়াজগতে একটা বিরাট অবদান রয়েছে দত্ত পরিবারের। আমরা এরকম একটা পরিবারের সান্নিধ্য পেয়ে নিজেদের ধন্য মনে করি। প্রদ্যুতদা-র অকাল প্রয়াণের পর সুব্রত (বাপি) এবং অনির্বাণ (জয়) সেই ধারাটা বজায় রেখেছেন। এখনও পুত্র জয় খোঁজখবর নেয়। তখন মনে হয় আমিও যেন দত্ত পরিবারের একজন।