(রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব)
আমি যখন স্কুল কলেজে পড়ি তখনও খেলাধূলার উদার প্রাঙ্গণ মেয়েদের কাছে অধরাই ছিল। ব্যতিক্রম কিছু ছিল নিশ্চয়ই। ব্যাডমিন্টন আর ভলিই ছিল কলেজ গেম। পাড়ার মাঠে বিশেষ দিনে ফুটবল কবাডি ম্যাচ দেখার সুযোগটাই ছিল অনেক। তারপর বেলা গড়িয়েছে, জীবন বয়েছে অন্য খাতে। ছাত্র রাজনীতির স্থানে খেলার মাঠ পড়ে রইল ভাটায়। কিন্তু ইচ্ছে বুঝি রয়েই গেছে মনের গভীরে। বাঙালির ফুটবল প্রীতি নিয়ে তো নতুন কিছু বলার নেই। তাই আমি আমার পরিবার এর বাইরে ছিলাম না। খাবার টেবিলে হাতাহাতিও হয়ে যেত ভাইতে ভাইতে। আমিও তো কোনও দলে থাকতাম। দাদাদের কাছে মাঠের গল্প শুনতাম-- ফুটবল খেলার মাঠ তখনও মেয়েদের জন্য প্রস্তুত নয় - এমন কি ফুটবল সম্রাট পেলে যখন এলেন, তখন তাঁর আমন্ত্রণ পত্র আমি অনেককে দিয়েছি কিন্তু কি এক সংকোচে নিজে যাইনি। তবে পরে ফুটবল ম্যাচ আমি অনেক দেখেছি কখনও মোহন বাগান, কখনও ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের গ্যালারিতে বসে। আর যুবভারতী তৈরি হবার পর তো নিয়মিত কারণে ফুটবল মাঠের পরিবেশ ততদিনে মেয়েদের দর্শক হিসেবে পেতে শিখে গেছে।
সাতাশ বছর মন্ত্রীর স্ত্রী হিসেবে সাতদিনও আমি রাইটার্স গিয়েছি কিনা সন্দেহ, কিন্তু দীর্ঘ দিন ক্রীড়ামন্ত্রীর সাথী হয়ে ক্রীড়া জগতের বিশিষ্ট, সংগঠক, প্রশাসক, খেলোয়ারদের অনেকের সাথে পরিচয় হয়েছে - অনেকের সাথে শ্রদ্ধা, ভালবাসা, স্নেহের সম্পর্ক হয়েছে, যার কিছু এখনও অবশিষ্ট আছে। ফুটবলের প্রশাসক শ্রদ্ধেয় বিশ্বনাথ দত্তকে দেখলেও সে ভাবে পরিচিত হবার সুযোগ আমার হয়নি। কিন্তু বাংলার ফুটবলকে খেলার দরজার একটা লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে দত্ত পরিবার, জর্জ টেলিগ্রাফের ভূমিকার কথা আমি জানতাম। সেই সময়ে সমাজ জীবনের সবটাই ছিল অগোছালো- তার প্রভাব খেলার মাঠে পড়বে না তা কী হয়। একটা পট পরিবর্তন হয়েছে, নতুন সরকার তখন ভাঙা বুকের পাঁজর দিয়ে নয়া বাংলা গড়ার চেষ্টা করছে। খেলার জগতেও পড়েছে সেই নুতনের ডাক। আই এফ এর দায়িত্বে এলেন শ্রদ্ধেয় প্রদ্যোৎ দত্ত। সেখানেও চলছে গড়ার কাজ। খোল নলচে পাল্টাবার কথা তিনি ভাবেননি বলেই আমার মনে হয় কিন্তু তিনি চেয়েছিলেন ফুটবল মাঠকে দমবন্ধ পরিবেশ থেকে উদার উন্মুক্ত করে নতুন আলো বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করা।
সাতাশ বছর মন্ত্রীর স্ত্রী হিসেবে সাতদিনও আমি রাইটার্স গিয়েছি কিনা সন্দেহ, কিন্তু দীর্ঘ দিন ক্রীড়ামন্ত্রীর সাথী হয়ে ক্রীড়া জগতের বিশিষ্ট, সংগঠক, প্রশাসক, খেলোয়ারদের অনেকের সাথে পরিচয় হয়েছে - অনেকের সাথে শ্রদ্ধা, ভালবাসা, স্নেহের সম্পর্ক হয়েছে, যার কিছু এখনও অবশিষ্ট আছে। ফুটবলের প্রশাসক শ্রদ্ধেয় বিশ্বনাথ দত্তকে দেখলেও সে ভাবে পরিচিত হবার সুযোগ আমার হয়নি। কিন্তু বাংলার ফুটবলকে খেলার দরজার একটা লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে দত্ত পরিবার, জর্জ টেলিগ্রাফের ভূমিকার কথা আমি জানতাম। সেই সময়ে সমাজ জীবনের সবটাই ছিল অগোছালো- তার প্রভাব খেলার মাঠে পড়বে না তা কী হয়। একটা পট পরিবর্তন হয়েছে, নতুন সরকার তখন ভাঙা বুকের পাঁজর দিয়ে নয়া বাংলা গড়ার চেষ্টা করছে। খেলার জগতেও পড়েছে সেই নুতনের ডাক। আই এফ এর দায়িত্বে এলেন শ্রদ্ধেয় প্রদ্যোৎ দত্ত। সেখানেও চলছে গড়ার কাজ। খোল নলচে পাল্টাবার কথা তিনি ভাবেননি বলেই আমার মনে হয় কিন্তু তিনি চেয়েছিলেন ফুটবল মাঠকে দমবন্ধ পরিবেশ থেকে উদার উন্মুক্ত করে নতুন আলো বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করা।
সিদ্ধান্তে পারতেন অটল থাকতে। অনেক কড়া পদক্ষেপ নিতে হয়েছে তাকে বড় ক্লাবগুলির অন্যায় আবদারের বিরুদ্ধে। খেলার মান অথবা খেলোয়াড় দুই এর প্রতিই মনোযোগ থেকে বিচ্যুত হননি কখনও। ময়দান শাসন করতে গিয়ে অনেক বাধার সম্মুখীন হলেও সিদ্ধান্তে অবিচল থাকার মনোবল তাঁর ছিল। সেটা দেখেছে সেই সময়ে রাজ্যের ফুটবল প্রেমীরা। এ আই এফ এর সাথে সম্পর্কের উন্নয়নে শ্রদ্ধেয় অশোক ঘোষ ছিলেন সেই সময়ে এক বিশেষ প্রয়োজনীয় সেতু। প্রদ্যুতদা একটা অনুকূল পরিস্থিতি পেয়েছিলেন। খেলার জগতে রাজনীতির খেলা চিরদিনই ছিল নানা বেশে---- গোষ্ঠপাল, বাঘা সোমদের সময় এক রকম তার পরবর্তী সময় থেকে অন্যরকম। বহু সময়েই খেলার জগতে সরকারি, প্রশাসনিক আধিপত্য বিস্তারের প্রচেষ্টায় ব্যাহত হয়েছে সামগ্রিক ভাবে ক্রীড়া ক্ষেত্রের অগ্রগতি। ব্যক্তি প্রাধান্য হয়ে উঠেছে অস্বস্তিকর। বৃহৎ ক্লাবগুলিকে নিয়ে বসেছে প্রতিযোগিতার আসর। প্রদ্যুতদা বা তার পরেও যাঁরা আই এফ এর কর্ণধার হয়েছেন, রঞ্জিৎ গুপ্ত, উৎপলদা বা সুব্রত দত্ত সকলেই এই প্রশাসনের রাজনৈতিক চাপমুক্ত হয়ে কাজ করতে পেরেছেন। স্বাধীন সংস্থার উপর অহেতুক হস্তক্ষেপ তাদের বিব্রত করেনি। খেলার দুনিয়ার নিজস্ব কূট-কৌশলের যন্ত্রণা তো চিরন্তন!
প্রদ্যুত দত্ত আইএফএর দায়িত্ব নিয়ে কী কী করতে পেরেছিলেন তার হিসেব নিশ্চয়ই আই এফ এর মহাফেজখানায় আছে। কিন্তু জনমানসে তাঁর যে অতুলনীয় কর্মকান্ডের বিষয় একবারে মনে আসবে সেটা নিশ্চয়ই নেহরু গোল্ড কাপের কথা। নেহেরু কাপের মতো মর্য্যাদা সম্পন্ন খেলাটিকে নান্দনিক করে উপস্থিত করতে পেরেছিলেন। নেহরু কাপ দিয়ে উদ্বোধন হল কাঞ্চনজঙ্ঘা স্টেডিয়ামের। কি সাংঘাতিক একটা চ্যালেঞ্জও ছিল সুষ্ঠুভাবে এই খেলাটা করাবার। ঐ সময়টাতে আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি প্রদ্যুতদাকে। মাঠ পুরোপুরি তৈরি হয়নি, অসম্পূর্ণ গ্যালারি। ফিফার নির্দেশ, (কারণ বহু বিদেশি দল আসছে) এ আই এফের খবরদারি। আই এফের কেউ কেউ মজা দেখছেন---- সেই সময় দেখেছি কি এক বোঝা পরা নিয়ে সুভাষ চক্রবর্তী আর প্রদ্যুত দত্ত প্রতিটি বাকে মোড়ের বাধা কাটিয়ে এগিয়েছেন। সাথে শিলিগুড়ি করপোরেশনের মেয়র বিকাশ ঘোষ এবং তার দল, সমগ্র নর্থবেঙ্গল মেতে উঠেছিল এই খেলা নিয়ে। সমস্ত অসুবিধের বাধা জয় করে নেহেরু কাপ শুরু হল নব নির্মিত স্টেডিয়ামে। সেদিন কাঞ্চনজঙ্ঘা ঝলমল করে উঠল রাশিয়া, পোল্যান্ড, চায়না, বুলগেরিয়ার প্লেয়ারদের ঝলকানিতে। এটা প্রদ্যুত দত্তদের কাছে এভারেস্ট জয়ের থেকে কম কঠিন ছিলনা। অসাধ্য সাধন করেছেন সাহস আর জিদের যুগলবন্দিতে। প্রশাসকরা আসেন একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। তার মধ্যেই নিজ নিজ কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে তারা বিশিষ্টতা অর্জন করে থাকেন। শ্রদ্ধেয় প্রদ্যুত দত্ত তাঁর সময় কালের মধ্যে আই এফ এ কে কতটা মজবুত করতে পেরেছিলেন, খেলোয়ারদের প্রশিক্ষণ থেকে উন্নয়ন, তাদের চাহিদা থেকে সুযোগ কি দিয়ে ছিলেন ইতিমধ্যেই তাঁর মূল্যায়ন হয়েছে নিশ্চয়ই। খেলোয়াড়দের অনেকের কাছেই অকুন্ঠ প্রশংসা শুনেছি তাঁর। তিনি যে কঠিন এবং ঋজু ও স্পষ্টবাদী এটা তাঁর সমালোচনা নয় এটা প্লেয়ারদের একটা উপলব্ধি।
খেলার দুনিয়ায় সংগঠকদের থেকে খেলোয়াড় বা অনেক বেশি জনপ্রিয় হয়ে থাকে আর সেটাই স্বাভাবিক। তাই চিরকাল মারাদোনা, পেলেরা অমর হয়ে থাকবে। তাদের পেছনে মেসি নেইমাররা। বাংলার ফুটবলের ইতিহাসে মেওয়ালাল, বলরাম, পিকে, চুনী গোস্বামী থেকে সুরজিৎ, সুভাষ ভৌমিক, শ্যামথাপা, সুব্রত ভট্টাচার্য, ভাস্কর গাঙ্গুলি, গৌতম, অমিত ভদ্র, কৃশানু, নঈম, মইদুল, মজিদ, বাইচুং, চিমা, বিকাশ পাজিদের নাম জ্বলজ্বল করে জ্বলবে। আবার আজকের প্রজন্মের খেলোয়াড়দের মধ্য থেকে এমনি করেই ইতিহাস হবে কতজন। কিন্তু এদেরকে তারকা করতে, জনপ্রিয় করার কারিগর যারা বিখ্যাত কোচের নাম কেউ কেউ জানবে কিন্তু প্রশাসকের নাম নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। তাদের নাম করলে জানতেই বা পারে। তবু তার মধ্যে কিছু কিছু নাম উচ্চারিত হয় ফুটবলের বিকাশের সাথে সাথে আর তারই মধ্যে স্থান করে নিয়েছে সচিব প্রদ্যুত দত্ত।
আজকের সময়টা আরো কঠিন। ক্ষমতা ও দখল দারির আক্রমণ মারাত্মক। তার ছায়া সর্বত্র। ক্রীড়াঙ্গন কাঁপছে। ক্লাবগুলির উপরে যেমন খুশির থাবা। আজও তাই প্রদ্যুত দত্তর মতো একজন কঠোর কোমলে প্রশাসকের প্রয়োজন। আর সেই দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করতেই আসরে নব নির্বাচিত সচিব অনির্বাণ দত্ত।
ভাবতে ভাল লাগছে প্রদ্যোৎদার উত্তারাধিকার পেয়েছে তার সুযোগ্য সন্তান। প্রদ্যুতদা যখন চলে গেলেন তখন ফুটবল জগতের চোখে জল। একজন দক্ষ প্রশাসকের জন্য ছিল হাহাকার। অনেক পথ পেরিয়ে আজ আবার দত্ত পরিবারের ঐতিহ্যের গৌরব নিয়ে নতুন প্রজন্ম। বিজ্ঞান প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে সাথে যেমন নূতন কিছু ভাবনা চিন্তার সুযোগ এসেছে, সাধারণেরও পছন্দ এবং চাহিদা হয়েছে ভিন্নতর। আমি আশাবাদী এই সমাজটা সাথে নিয়েই আই এফ এর নতুন কর্ণধার এগিয়ে যাবেন। কুসংস্কার মুক্ত করবেন ফুটবলের জগত, আজ বিজ্ঞানের এই জয়যাত্রার লগ্নে। তার কর্মযজ্ঞে বাস্তবায়িত হবে প্রদ্যুতদার অপূর্ণ পরিকল্পনাগুলি। আই এফ এর অধিকারের সীমানা প্রসারিত হোক। শুধু ময়দানের বৃহৎ ক্লাবগুলি নয়---- জেলায় জেলায় পৌঁছে যাক সাহায্যের হাত। শুধু পূজা আর মেলা নয় ক্লাবগুলি হোক খেলা। গ্রামে গঞ্জে শহরের মাঠে, পার্কে, বস্তিতে, অলিতে গলিতে পায়ে পায়ে ফুটবল গড়াক। তবেই তো একদিন উঠে আসবে স্বপ্নের রাজ কুমারেরা। কন্যাশ্রীতে লাগুক ফুটবলের দোলা। মুক্তি পাক প্রদ্যুতদার স্বপ্নরা পরম্পরার পথ বেয়ে। বাংলার ফুটবলের ইতিহাসে অনির্বাণ শিখায় প্রজ্জ্বলিত থাকুক প্রদ্যোৎ দত্ত স্মরণ।