আমাকে স্নেহ করতেন, তবু তাঁকে ভয় পেতাম

মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য

(আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফুটবলার)

আমাকে খুবই স্নেহ করতেন। তবু আমি তাঁকে ভয় পেতাম। সামনে গিয়ে অনেক কথাই বলতে পারতাম না। কিন্তু তিনি এতটাই বিচক্ষণ, দূরদর্শী ছিলেন যে, কী বলতে চাইছি সেটা যেন আগে থেকেই বুঝতে পারতেন। খেলতে নেমে এরকম বেশ কয়েকজন ফুটবলারের পাশে খেলেছি বা যাঁদের খেলা দেখেছি তাঁদের মধ্যে এমন কয়েকজনকে দেখেছি যাঁরা তাঁর প্রতিপক্ষ দলের ফুটবলার কী করতে পারেন যেন আগে থেকেই বুঝতে পারতেন। যেমন অরুণ ঘোষ, সুধীর কর্মকার, অশোক ব্যানার্জি। প্রদ্যুতদা ছিলেন এমনই একজন ব্যক্তিত্ব। তবে ব্যতিক্রম হল ফুটবল মাঠে হল লড়াই, আর প্রদ্যুতদার কাছে ব্যাপারটা ছিল ভিন্ন। তাহল একজন ফুটবলার কী জন্য তাঁর কাছে এসেছেন ব্যাপারটা বুঝে নেওয়া। ফুটবলারদের পাশে থাকতেন, স্বভাবতই ফুটবলাররাও তাঁকে শ্রদ্ধা করতেন, তাঁর ওপর ভরসা রাখতে পারতেন। উচ্চশিক্ষিত, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন প্রদ্যুতদা সর্বস্তরে ছিলেন শ্রদ্ধাভাজন। আমার সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয় ১৯৭৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের একদিন। আমি আগের বছর পুলিশ এ.সি ক্লাবে খেলেছিলাম। ১৯৭৬ সালে কালীঘাট ক্লাবের সঙ্গে কথাবার্তা প্রায় চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কালীঘাটে সই করতে পারলাম না কারণটা অবশ্যই প্রদ্যুতদা। হঠাৎই জর্জ টেলিগ্রাফ ক্লাবের একজন কর্মকর্তা, প্রাক্তন ফুটবলার অনিল সাহা একদিন সন্ধ্যায় হাজির হয়েছিলেন আমাদের বাড়িতে। আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করিনি। কারণ আমার দাদা বাদল এবং আমিও তখন কালীঘাটে খেলব বলেই মনস্থির করে ফেলেছি। একদিন বাদে সকালবেলা হাজির হলেন জর্জ টেলিগ্রাফ ক্লাবের তৎকালীন ফুটবল সচিব হৃষীকেশ ভট্টাচার্য। আমি রাজি আন্দাজ করে তিনি বিকালে জর্জ টেলিগ্রাফ তাঁবুতে যাওয়ার জন্য বলে গিয়েছিলেন। আমি কিন্তু তাঁর কথামতো জর্জ তাঁবুতে যাইনি। কিন্তু ঘটনা হল আমি যে যাব না, ব্যাপারটা যেন আন্দাজ করেছিলেন প্রদ্যুতদা। তাই বিকেলে নিজেই তাঁর দলবল নিয়ে হাজির হয়েছিলেন আমাদের বাড়িতে। ঘরে ঢুকে কোনও কথা বলারই সুযোগ দিলেন না। মাত্র এক কাপ চা খেয়েই আমাকে জামা, প্যান্ট গোছাতে বললেন। আমি যেন তখন প্রায় বোবা হয়ে গিয়েছিলাম। সেদিনটা ছিল শনিবার। দু-দিন প্রদ্যুতদাদের ভবানীপুরের বাড়িতে থাকার পরে সই করেছিলাম জর্জ ক্লাবে। টাকা পয়সার ব্যাপারে কোনও কথাই হয়নি। আমার একটাই শর্ত ছিল তাহল দলে সুযোগ পাওয়া। আমাকে প্রথম চারটে ম্যাচ সুযোগ দিতে বলেছিলাম।

জর্জে সই করার পরে খেলতে গিয়েছিলাম ব্যাঙ্ককে এশীয় যুব ফুটবলে। ফিরে এসে ক্লাবের হয়ে লিগে প্রায় নিয়মিত খেলেছিলাম। শিল্ডের খেলা যখন চলছে তখন শ্রীনগরে জুনিয়র ন্যাশনালের খেলা চলছিল। সেমিফাইনালে মোহনবাগানের মুখোমুখি হয়েছিল জর্জ। বাংলা দল ট্রেনে ফিরলেও আমি ফিরেছিলাম প্লেনে। আমাকে ছাড়া সেমিফাইনালে জর্জের দল গড়তে তিনি চাননি। এতটাই আস্থা অর্জন করেছিলাম।

পুজোর পর ডিসিএম-র টুর্নামেন্টে খেলতে গিয়েছিল জর্জ টেলিগ্রাফ। একনাগাড়ে বেশ কয়েকটা দিন ঘরে থাকতে পারিনি বলে আমার মা তখন রাজি ছিলেন না। ক্লাবে খবরটা যেতে প্রদ্যুতদা পাঠিয়ে ছিলেন ক্লাবের সক্রিয় সদস্য আদিত্য চৌধুরিকে। আদিত্যদা আমার মায়ের দুটো পা ধরে বলেছিলেন, ‘মাসিমা, এবার অনুমতি দিন। মনাকে ছাড়া প্রদ্যুতদা দল পাঠাবেন না বলেছেন। ওকে সঙ্গে নিয়ে না গেলে প্রদ্যুতদা ঘরেই ঢুকতে দেবেন না।’

১৯৭৭ সালে ইস্টবেঙ্গল ক্লাবে যোগ দিয়েছিলাম। আমার অনেকদিনের স্বপ্ন সফল হয়েছিল সেবার। ক্লাবে প্রদ্যুতদার সহকর্মীরা অনেকেই তখন আমার জর্জ ছাড়ার ব্যাপারটা মেনে নিতে পারেননি। তাঁদের ধারণা ছিল, ইস্টবেঙ্গলের মতো বড় ক্লাবে আমি মানিয়ে নিতে পারব না। এমনকী আমি ইস্টবেঙ্গলে সই করার দু-একদিন বাদে -- প্রদ্যুতদাকে সঙ্গে নিয়ে বাচ্চুদা এবং পুঁটেদা আমার বাড়িতে এসেছিলেন। আমি তখন বাড়িতে ছিলাম না। তখন সইয়ের পর ১০ দিন প্রত্যাহারের সুযোগ পাওয়া যেত। কিন্তু ঘটনা হল, প্রদ্যুতদা নিজেই চাননি যে আমি সই প্রত্যাহার করি। তিনিও আমার ইস্টবেঙ্গলে সই করার ব্যাপারটা মেনে নিয়েছিলেন। বলা যেতে পারে যে খুশি হয়েছিলেন। জর্জ থেকে একজন ইস্টবেঙ্গলে যোগ দিচ্ছেন ব্যাপারটা তাঁর কাছে ছিল আনন্দের। আমার ঘনিষ্ঠ একজনকে ডেকে বলেছিলেন, ‘মনা যেন সই ‘উইথড্র’ না করে। আমিও মনেপ্রাণে চাই এবছরটা ইস্টবেঙ্গলেই খেলুক। সেদিন পুটে, বাচ্চুদের মন রাখতে ওর বাড়িতে গিয়েছিলাম।’

প্রদ্যুতদা আমার কাছে ছিলেন একজন অভিভাবকের মতো। এক বছর বাদে আর একটি ঘটনার কথা বলছি। পরের বছর ১৯৭৮ সালে ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের প্রশাসনে পালাবদল হল। নতুন কর্মসমিতি আমার জায়গায সুব্রত ভট্টাচার্যকে সই করাবার পরিকল্পনায় ছিল। ময়দানের বাতাসে খবরটা চাউর হতে সময় লাগেনি। মনোরঞ্জনকে ইস্টবেঙ্গল রাখবে না, স্বভাবতই প্রদ্যুতদার কানেও খবর পৌঁছেছিল। দলবদল শুরুর দিন সকালে আমার মেজদাদা বাদলকে নিয়ে যাওয়ার জন্য সদলবলে হাজির হয়েছিলেন প্রদ্যুতদা। দাদা বাদলের সঙ্গে আমাকেও তুলে নিলেন। আমিও তখন মনেপ্রাণে জর্জ টেলিগ্রাফে ফিরে আসার কথা ভাবছি। আমাদের দুই ভাইকে নিয়ে তুললেন তাঁদের সাবেক বাড়ি ভবানীপুরে। সেখানে জর্জের অন্য ফুটবলাররাও ছিলেন। একটু বাদেই প্রদীপ দত্ত, শিবব্রত নাথ, অমিত গুহ, সঞ্জীব চৌধুরি, আমার দাদা বাদলকে নিয়ে প্রদ্যুতদার গাড়ি রওনা দিল আইএফএ অফিসের দিকে। কিন্তু আমাকে সঙ্গে নিলেন না। কেন নিলেন না ব্যাপারটা তখনও বুঝতে পারিনি। আমি তখন আকাশপাতাল ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সই করার পর ফুটবলাররা ফিরে আসার পর আমাকে ডেকে তুললেন। বেশ মনে আছে অমিত, বাদল এবং আমি তাঁর বাড়ির পাশে ইন্দিরা সিনেমা হলে ‘স্বাতী’ ছবি দেখতে গিয়েছিলাম। প্রদ্যুতদা আগেই টিকিট কেটে রেখেছিলেন।

এদিকে আমাকে প্রদ্যুতদার ডেরায় দেখে তাঁর মেজদাদা কিংবদন্তি ক্রীড়া প্রশাসক বিশ্বনাথ দত্ত একটু অবাকই হয়েছিলেন। তিনি এবং প্রদ্যুতদার সেজো দাদা প্রণব কুমার দত্ত নাকি প্রদ্যুতদার কাছে বিস্ময় প্রকাশ করে জানতে চেয়েছিলেন আমাকে কি জর্জ সই করাবে? কাজটা ঠিক হবে না নাকি বলেছিলেন। তখন প্রদ্যুতদা বলেছিলেন, ‘মনাকে জর্জে সই করাবার কোনও পরিকল্পনাই নেই। ওর সঙ্গে ইস্টবেঙ্গল কথা বলছে না। ভুল করে অন্য কোনও দলে যাতে চলে যেতে না পারে সেজন্য এখানে আটকে রাখলাম।’ আমি যখন ঘুমোচ্ছিলাম তখন আমারই ঘনিষ্ঠ একজনকে কথাটা বলেছিলেন। এতটাই নিশ্চিত ছিলেন যে জন্য দাদা বাদলের সঙ্গে আমাকে ছেড়ে দিয়েছিলেন। কারণ, তিনি জানতেন ইস্টবেঙ্গল আমার কাছে আসবেই। ঠিক তার একদিন বাদেই ইস্টবেঙ্গল হাজির হয়েছিল আমাদের বাড়িতে। সেদিনই সই প্রত্যাহার করে ইস্টবেঙ্গলে থেকে গিয়েছিলাম। তারপর আর আমাকে পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ৪১ বছর বাদে আজও সেই দিনটার কথা মনে পড়ে গেল। এখনও ভাবি সেদিন যদি আমাকে ওইভাবে তুলে নিয়ে না যেতেন তাহলে আমি হয়তো অন্য কোনও ক্লাবে সই করে বসতাম।

১৯৮৬-৮৭ সালের একটা ঘটনা বলছি। ১৯৮৩ সালে রোভার্স কাপের সেমিফাইনালের একটা ঘটনা। অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশন মিহির বসু, দেবাশিস রায়, ভাস্কর এবং আমাকে সাসপেন্ড করেছিল। যদিও তারপরেও আমি নেহরু কাপে ভারতীয় দলে খেলেছিলাম। এদিকে ১৯৮৮ সালে শিলিগুড়িতে অনুষ্ঠিত হল নেহরু কাপ। বাংলার মাটিতে খেলা, আমাকে বাদ দিয়ে দল গঠন হতে পারে না। আমার সাসপেনশন তুলে ফেলবেন এরকম পরিকল্পনা ছিল প্রদ্যুতদার। সুভাষ ভৌমিক তখন প্রদ্যুতদার খুব কাছে থাকতেন। তিনিই আমাকে প্রদ্যুতদার বাড়িতে আসার জন্য খবর পাঠালেন। সেখানে আচমকাই ভারতীয় দলে খেলার প্রস্তাব শুনে আমি অবাকই হয়েছিলাম। আমি সেই সময় আন্তর্জাতিক আসরে খেলার চেয়ে বেশি আগ্রহী ছিলাম সন্তোষ ট্রফি নিয়ে। কারণ তার আগে ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৫, একটানা তিন বছর বাংলার ঘরে সন্তোষ ট্রফি আসেনি। ব্যাপারটা আমার কাছে ছিল অপমানজনক। তাই আমি জাতীয় দলে ফেরার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলাম, তিন বছর আমরা সন্তোষ ট্রফি জিততে পারিনি। এবার কলকাতায় খেলা। এবারও জিততে না পারলেও মান, সম্মান থাকবে না। জাতীয় দলে ফেরার কথা পরে ভাবা যাবে। আমার যুক্তি প্রদ্যুতদা মেনে নিয়েছিলেন। সুভাষদা এবং আমার ওপর ভরসা রেখেছিলেন। সেবারে বাংলা দলের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর ছিলেন বিদগ্ধ কোচ অরুণ সিনহা। কোচ ছিলেন আমাদের পূর্বসূরি খ্যাতনামা ফুটবলার নিমাই গোস্বামী, আর সুভাষদা ছিলেন ম্যানেজার। বলতে দ্বিধা নেই ম্যানেজার নির্বাচন যে কতটা সঠিক ছিল সেটা প্রতিযোগিতা শুরুর দিন থেকেই আমরা উপলব্ধি করেছি। আমরা ফাইনালে ভারতীয় রেল দলকে হারিয়ে সন্তোষ ট্রফি জিতেছিলাম। প্রসঙ্গত রেল দলের কোচ ছিলেন প্রদীপদা, (পি কে ব্যানার্জি)। মানতেই হবে বাংলা দলের সাফল্যের পিছনে একটা বড় অবদান ছিল ম্যানেজার হিসাবে সুভাষ ভৌমিকের।

দু’বছর বাদে বাংলা আবার সন্তোষ ট্রফি জিতেছিল অলোক মুখার্জির নেতৃত্বে। সেবার আমাদের কোচ ছিলেন শ্যাম থাপা এবং ম্যানেজার চন্দনদা (ব্যানার্জি)। খেলা হয়েছিল গৌহাটিতে। ট্রফি জিতে কলকাতায় ফেরার সময় হাওড়া ষ্টেশনে হাজির ছিলেন প্রদ্যুতদা। এতটাই উচ্ছ্বসিত ছিলেন যে, ‘থ্রি-চিয়ার্স ফর মনোরঞ্জন’ বলে এমন একটা গর্জন করেছিলেন যা নাকি আজও আমার কানে বাজে। আসলে সেবারে তাঁর বেশি উচ্ছ্বসিত হওয়ার কারণ দলে আমরা এমন চারজন ছিলাম যাঁরা জর্জ টেলিগ্রাফ থেকে সরাসরি বড় দলে যোগ দিয়েছিলাম। ম্যানেজার চন্দনদা ১৯৬৩ সালে, ১৯৭৭ সালে আমি ইষ্টবেঙ্গলে। ১৯৮১ সালে অলোক মুখার্জি সে বছরে কলকাতা লিগ চ্যাম্পিয়ন মহামেডান ক্লাবে এবং ১৯৮৬ সালে সত্যজিৎ চ্যাটার্জি মোহনবাগানে।

Copyright Ⓒ Prodyutdutta.com