প্রদ্যুতদার জন্যই আইএফএ আসা শুরু করেছিলাম

অজিত বন্দ্যোপাধ্যায়

(সভাপতি, আইএফএ)

আমার যৌবন কাল থেকেই গড়ের মাঠ করা শুরু। আমি তখন আমাদের কালীঘাট এমএস ক্লাব নিয়ে মাঠে পড়ে থাকতাম। কিন্তু আইএফএ অফিসে খুব একটা যেতাম না। প্রয়োজন হলে তবেই যেতাম। না হলে যেতাম না। আটের দশকের শুরুর কথা।

ময়দানের বিভিন্ন মাঠে তখন প্রদ্যুতদাকে দেখতাম। তাঁদের জর্জ টেলিগ্রাফ স্পোর্টস ক্লাবের ফুটবলটা মুলত তখন প্রদ্যুতদাই দেখতেন। ওই সময় আবার বিশুদা (বিশ্বনাথ দত্ত) সিএবি-র সভাপতি হয়েছেন। একদিন বিকেলে প্রদ্যুতদার সঙ্গে আমার মাঠে দেখা হল। দেখা হতেই আমার দিকে এগিয়ে এসে বললেন,‘ষষ্ঠী তুমি তো ভালই ক্লাবটাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছো। আমি খোঁজ রাখি। শুধু নিজের ক্লাব করলে হবে? আইএফএ-তে আসো না কেন? মাঠে যেমন আসছো তেমনি আইএফএ-তেও এসো। তোমাদের মতো মানুষদের আইএফএ-র দরকার।’ সেদিন প্রদ্যুতদার কথাগুলোর মধ্যে অদ্ভুত আন্তরিকতা ছিল। আমিও তাঁর সম্পর্কে জানতাম। খুব সৎ মানুষ। সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলার মানুষ। রাশভারী, কঠিন ব্যক্তিত্ব হলেও প্রদ্যুতদার মনে কোথাও একটা শিশুর সারল্য ছিল। মানুষটাকে আমিও খুব পছন্দ করতাম। প্রদ্যুতদার সেই কথা শুনে আইএফএ যাওয়া শুরু করলাম। আস্তে আস্তে প্রদ্যুতদাকে আরও কাছ থেকে দেখার ও মেশার সুযোগ হল।

কলকাতা লিগে দল গড়তে ক্লাব কর্তাদের যে কী আর্থিক চাপ থাকে তা তারাই বোঝে যারা ক্লাব চালায়। তখন ওই সময় এখনকার মতো স্পনসর, ইনভেস্টর বলে কিছু ছিল না। এর, ওর কাছে সাহায্য নিয়ে দল গড়তে হত। একদিন হঠাৎ প্রদ্যুতদা আমাকে ডেকে পাঠালেন বাবুঘাটের কাছে একটি হোটেলে। সম্ভবত হোটেলটার নাম ‘গে’। মাঠ, ময়দানের সঙ্গে আমার দল গঠন নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। কিছুদিন পরে আমার বাড়িতে আলো (আলোকেশ কুন্ডু) হাজির। আলো এসে আমার হাতে একটা খাম দিয়ে বলল, ‘এই খামটা প্রদ্যুতদা পাঠিয়েছেন। পারলে পরে দেখা করে নেবেন।’ আলো যাওয়ার পর খাম খুলে দেখলাম টাকা। পরের দিন প্রদ্যুতদার সঙ্গে দেখা করতে তিনি বলেন, ‘টাকাটা ক্লাবের জন্য। ভাল করে দল তৈরি করো।’ পরবর্তীকালে লিগের আগে অনেক বার আমার ক্লাবের জন্য আর্থিক সাহায্য করেছিলেন প্রদ্যুতদা। পরে জেনেছিলাম ময়দানের অনেক ক্লাব আছে যারা টাকার অভাবে ফুটবল দল করতে পারছে না, প্রদ্যুতদা তাদের মাঝে মধ্যেই পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। ওই সব দিন কখনও ভুলতে পারব না।

তিনি অন্যায়কে কখনও প্রশ্রয় দিতেন না। আর সমস্যা সামনে এলে পালিয়ে যেতেন না। সমস্যাকে সামনে থেকে মোকাবিলা করতেন। ভয়ডর কিছু ছিল না তাঁর। একবার লিগের একটি ম্যাচ থেকে দল তুলে নিয়েছিল মহামেডান স্পোর্টিং। তখন মহামেডানের সচিব ছিলেন দোর্দন্ডপ্রতাপ মীর মহম্মদ ওমর। সেই সময় মহামেডান জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। সেই সময় দল তুলে নেওয়ার জন্য মহামেডানকে সাসপেন্ড করে দিয়েছিলন।

মহামেডানকে সাসপেন্ড করার দুই দিন আগে তৎকালীন ক্রীড়ামন্ত্রী সুভাষ চক্রবর্তী প্রদ্যুতদাকে ডেকে বলেছিলেন, ‘প্রদ্যুতবাবু, আপনি যে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন তাতে কিন্তু ল অন অর্ডার প্রবলেম হতে পারে। ভাল করে ভেবে নিয়ে মহামেডান স্পোর্টিং নিয়ে সিদ্ধান্ত নিন।’ ওই কথা শুনে সুভাষ চক্রবর্তীকে মুখের উপর প্রদ্যুতদা বলে এসেছিলেন, ‘ল অ্যান্ড অর্ডার প্রবলেম হলে আপনি কী জন্য আছেন। ওই সব তো আপনারা দেখবেন। ওটা আমার দেখার কাজ নয়। মাঠে অন্যায় করেছে, তাদের শাস্তি পেতেই হবে।’ এই ধরনের কথা প্রদ্যুতদাই বলতে পারেন।

আর একটা ঘটনার কথা মনে পড়ছে। ন্যাশনালে যাবে বাংলা দল। ট্রায়াল হল। পরে শিবিরও হল। তখন কোচ ছিল অমৃতলাল চক্রবর্তী। শিবিরে ভাল খেলার পর অলোক দাস বলে এক ফুটবলারকে বাদ দিয়ে দল শিলিগুড়ি চলে গেল। আমি প্রদ্যুতদাকে অলোকের কথা বললাম। নির্ধারিত হওয়ার পরও কী করে অলোক বাদ যায়? প্রদ্যুতদা সব শুনলেন। ওই টুর্নামেন্টের ফাইনাল ছিল চুচুঁড়ায়। প্রদ্যুতদার জন্য অলোক দলে ফিরল। আর সেই অলোকের গোলেই বাংলা চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল।

মমতার সঙ্গে আমিই প্রথম আলাপ করিয়ে দিয়েছিলাম। পরবর্তীকালে প্রদ্যুতদা ও মমতা দাদা-বোনের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। কোনও সমস্যা হলে প্রদ্যুতদার কাছে যেতেন। রীতিমতো আবদার করতেন। আর প্রদ্যুতদাও মমতাকে ছোট বোন ভেবেই খুব স্নেহ করতেন। ‘সবুজ বাঁচাও আন্দোলন’ করে এই দাদা-বোন তো রবীন্দ্র সরোবরকে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন। সে সব ইতিহাস। এআইএফএফ সচিব নির্বাচন নিয়ে প্রদ্যুতদার সঙ্গে কিছু কর্তা পিছন থেকে ছুড়ি মেরেছিলেন। অন্তর্ঘাতটা যখন জানতে পারা গেল তখন বড্ড দেরি হয়ে গিয়েছিল। আমি জানি মমতাও তখন খুব চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তখন খুব দেরি হয়ে গিয়েছিল। ওই সময় প্রদ্যুতদাকে যদি এআইএফএফ-এর সচিব হতে না আটকাতো তাহলে ভারতীয় ফুটবল অন্য খাতে বইতো।

তবে তিনি আইএফএ-তে থেকে যে সব কাজ করে গিয়েছেন তা বাংলা তথা ভারতীয় ফুটবল ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তিনি অন্যদের থেকে আলাদা। তাঁর মৃত্যু যেন আমাদের পরিবারের নিকট আত্মীয় বিয়োগের সমান।

আমি প্রদ্যুতদাকে খুব কাছ থেকে দেখেছি, মিশেছি। পরবর্তীকালে তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র জয় (অনির্বাণ দত্ত)-কে একই ভাবে দেখছি। জয়ের মধ্যে প্রদ্যুতদার গুণ আছে। বাবার মতোই জয়ও সৎ ছেলে। ভয়ডরহীন। ব্যক্তিত্ব আছে। বাংলার ফুটবল নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখে জয়। অনেক পরিকল্পনা আছে। নিঃশব্দে কাজ করে যাচ্ছে জয়।

Copyright Ⓒ Prodyutdutta.com