(‘অর্জুন’ পুরস্কারপ্রাপ্ত আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রাক্তন ফুটবলার)
প্রদ্যুতদা যখন আমাকে জরিমানা সহ সাত ম্যাচ সাসপেন্ড করলেন, তখন উনার উপর প্রচন্ড রাগ হয়েছিল। তখন আমি জনপ্রিয়তার মধ্য গগণে। রেফারি প্রদীপ নাগের সঙ্গে আমার গন্ডগোল নিয়ে খবরের কাগজে শিরোনাম। বিতর্ক তুঙ্গে। আইএফএ সচিব তখন প্রদ্যুত দত্ত। সব কিছু খতিয়ে দেখে আইএফএ আমাকে সাত ম্যাচ সাসপেন্ড করল। পাশাপাশি ৫০ হাজার টাকা জরিমানা। এত বড় শাস্তি হবে ভাবিনি। পরে একদিন প্রদ্যুতদার কাছে দেখা করলাম। উনি বলেছিলেন, ‘তোমরাই তো ফুটবলের সম্পদ। তোমাদের শাস্তি দিতে আমাদের ভাল লাগে না। জানি মাথা গরম করে ভুল করে ফেলেছো। কিন্তু অন্যায় তো অন্যায়। এই সচিবের চেয়ারে বসে আমার আর অন্য কোনও পথ খোলা ছিল না। শাস্তি অনিবার্য। নাহলে সিস্টেমটাই নষ্ট হয়ে যাবে। আজ তোমাকে ছেড়ে দিলে কাল অন্যদেরও ছাড়তে হবে। এটা বুঝতে হবে বাবলু।’ প্রদ্যুতদা সেদিন কথাগুলো বলার পর, আমাকে বললেন,শাস্তি কমানোর জন্য একটা আবেদন করতে। আবেদন করার ফলে সাত ম্যাচের পরিবর্তে তিন ম্যাচ সাসপেন্ড করলেন। কিন্তু জরিমানার টাকা কমাননি।
এই ঘটনার পর থেকে যত প্রদ্যুতদাকে দেখেছি, কাছ থেকে মিশেছি, আমার ধারণা ততই বদলে গিয়েছে। উনি আসলে সত্যিকারের ফুটবলারদের অভিভাবক ছিলেন। সন্তান খারাপ কাজ করলে পরিবারের বাবা, জ্যাঠারা যেমন শাসন করতেন,শাস্তি দিতেন। আবার ভাল কাজ করলে কাছে ডেকে আদর করতেন। ফুটবল ময়দানে প্রদ্যুতদা যেন সেই বাবা, জ্যাঠার মতোই ছিলেন। উনি ফুটবলারদের খুব সম্মানও করতেন।
মানুষটাকে কখনও পক্ষপাতিত্ব করতে দেখিনি। আপস করতে দেখিনি। তিন প্রধান কর্তাদের ভয় করতেও দেখিনি। অন্যায় হলে কড়া পদক্ষেপ করেছেন। এতটুকু ভয় পেতেন না। তার বড় প্রমাণ আমাকে শাস্তি দেওয়া এবং মহমেডান স্পোর্টিং ক্লাবকে সাসপেন্ড করা। তাঁদের জর্জ টেলিগ্রাফ স্পোর্টস ক্লাব আছে।
আইএফএ’র সচিবের চেয়ারে বসে প্রদ্যুতদা কখনও জর্জটেলিগ্রাফকে বাড়তি সুবিধা পাইয়ে দেননি। তিনি ছিলেন নিরপেক্ষ। রাজ্য ফুটবলের নিয়ামক সংস্থার চেয়ারে বসে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে গিয়েছেন। আমার চোখে প্রদ্যুতদাই হলেন আইএফএ’র সেরা সচিব। তারপরেই থাকবেন অশোক ঘোষ।
উনার আর একটা গুন ছিল তা হল, কোনও সুপারিশে অযোগ্যদের বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দিতেন না। আমার সঙ্গে প্রদ্যুতদার খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। একদিন তাঁকে বলেছিলাম, আমার পরিচিত তিনজন ফুটবলার আছে। জর্জটেলিগ্রাফে যদি সুযোগ করে দেওয়া যায়। প্রদ্যুতদা সঙ্গে সঙ্গে আমার তিন তরুণ পরিচিত ফুটবলারদের জর্জের অনুশীলনে সুযোগ করে দিলেন। আমি ভাবলাম তাহলে সইও হয়ে যাবে। কিন্তু কিছুদিন পর বললেন, আমার সেই তিন ফুটবলার কোচের নজর কাড়তে পারেনি। কাজেই সই করানো যাবে না। কোচই শেষ কথা। এই ঘটনার পর প্রদ্যুতদার উপর আমার শ্রদ্ধা বহুগুন বেড়ে গিয়েছিল। সেই ঘটনার পর দুটি ব্যাপার আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল, এক, যোগ্য না হলে সুপারিশে কাজ হবে না। অন্তত প্রদ্যুতদার কাছে তো নই। দুই, কোচের স্বাধীনতায় তিনি কখনও হস্তক্ষেপ করতে চাননি। এই প্রদ্যুতদা যখন আমাকে বাংলা দলের কোচ করেছিলেন,তখন দল গড়ার ব্যাপারে আমিই শেষ কথা ছিলাম। কোচ হিসেবে আমাকে যথেষ্ট গুরুত্ব ও স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। সেই বছর মাদ্রাজে গিয়ে সন্তোষ ট্রফিতে বাংলাকে চ্যাম্পিয়ন করিয়ে নিয়ে এসেছিলাম।
তিনি বাংলার ফুটবলকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য জেলাকে ভীষণভাবে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তিনিই শুরু করেছিলেন জেলায় জেলায় মহকুমা স্কুল ফুটবল টুর্নামেন্ট। এটা দারুণ ব্যাপার ছিল। আসলে প্রদ্যুতদা তৃণমূল স্তর থেকে ফুটবল প্রতিভা তুলে আনতে চেয়েছিলেন। তার ফলও পেয়েছিলেন। জেলা থেকে বহু ফুটবল প্রতিভা তুলে এনেছিলেন। পাশাপাশি কর্পোরেট জগতে বাংলার ফুটবলকে যে বিক্রি করা যায় সেই পথ তিনিই দেখিয়েছিলেন। তিনিই তো প্রথম বাংলার ফুটবলে স্পনসর এনেছিলেন। তাঁর দূরদৃষ্টি ছিল। নতুন কিছু করতে চাইতেন। আমি যতদুর জানি, ভারতীয় ফুটবলে তিনিই প্রথম ৩ পয়েন্ট ও ১ পয়েন্ট সিস্টেম চালু করেছিলেন। সালটা ঠিক মনে নেই, তবে আটের দশকের শেষ দিকে ময়দানে সেই কুখ্যাত ১১৪ গোলের ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর চারটি দলকে সাসপেন্ড করলেন। তার পরের বছরই কলকাতা লিগে ৩ ও ১ পয়েন্ট (ম্যাচ জিতলে ৩ পয়েন্ট আর ড্র করলে ১ পয়েন্ট) সিস্টেম চালু করলেন প্রদ্যুতদা। এখানে বলে রাখা উচিৎ, প্রদ্যুতদার তিন পয়েন্ট সিস্টেম চালু করার পরে ফিফায় ৩ পয়েন্ট সিস্টেম চালু হয়। যদিও ১৯৮১ সাল থেকে ইংল্যান্ডে ৩ পয়েন্ট সিস্টেম চালু ছিল।
’অর্জুন’খেতাব পাওয়ার ক্ষেত্রেও প্রদ্যুতদার একটা ভূমিকা ছিল। ১৯৮৪ সালের নেহেরু কাপের সময় খবর আসে, ‘অর্জুন’ খেতাবের জন্য ফেডারেশন আমার নাম প্রস্তাব করতে চলেছে। সেবার ধরেই নিয়েছিলাম ‘অর্জুন’ পাচ্ছি। কিন্তু পাইনি। সাত বছর পর ১৯৯২ সালে ‘অর্জুন’ পেয়েছিলাম। তখন কেন্দ্রীয় ক্রীড়ামন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। সেই সময় অন্য কেউ ক্রীড়ামন্ত্রী থাকলে আটকে যেত কি না জানি না। তবে ‘অর্জুন’-এর জন্য আইএফএ-র তৎকালীন সচিব প্রদ্যুত দত্ত আমার জন্যও বেসরকারি ভাবে প্রস্তাব রেখেছিলেন।
১৯৯৪ সালে প্রদ্যুতদার মৃত্যুর পর থেকে বাংলার ফুটবল জগতে বিরাট একটা ধাক্কা ছিল। বড় ক্ষতি হয়ে গিয়েছে। আমার আজ বলতে দ্বিধা নেই, প্রদ্যুতদার মৃত্যুর পর আইএফএ সেই ভাবে এগোতে পারেনি। এখনকার আইএফএ কাজকর্ম নিয়ে বিশেষ খোঁজখবর রাখি না। ফুটবলের মূল স্রোত থেকে অনেকটাই আমি দুরে। তবে শুনেছি প্রদ্যুতদার বড় ছেলে অনির্বান দত্ত আইএফএ’র সচিব হয়ে এসেছেন। বাবার রক্ত ছেলের শরীরে আছে। আশাকরি ভাল কাজ করার চেষ্টা অনির্বান করবেই। তবে পরিবেশ তো আর আগের মতো নেই। সব কিছুই এখন বদলে গেছে। গড়ের মাঠের পরিবেশ কি আর আগের মতো আছে? অনির্বাণ যদি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে তাহলে ভাল কাজ করবে।