কালজয়ী

অনির্বাণ দত্ত

(জেষ্ঠ্য পুত্র)

ছোটবেলার দিনগুলোর কথা মনে পড়লে বাবার মুখটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। দিনগুলো আমার জীবনে চিরদিন মধুর স্মৃতি হয়ে থাকবে। কর্মজীবনে তিনি দক্ষ প্রশাসক হলেও বাড়িতে সব সামলাতেন আমাদের মা। তবে বাবা প্রতিনিয়ত নজর রাখতেন। বাবা ছিলেন আমার কাছে বন্ধুর মতো।

লেখাপড়ার দিকটা মা-ই সামলাতেন। বাবা আবার সবসময় বই খাতা নিয়ে বসে থাকা পছন্দ করতেন না। বাবা ছিলেন বন্ধুর মতো। সেই সুযোগে মাঝেমধ্যে ঢিলেমি দিতাম। মা-প্রায়ই নালিশ করতেন। শাস্তিস্বরূপ বাবা একদিন কোলে বসিয়ে আমার সেন্টিমেন্টে সুড়সুড়ি দিয়ে বলেছিলেন, ‘না, তোর তো লেখাপড়া হবে না। ভাবছি একটা মুদি দোকানের ব্যবস্থা করে দেব।’ ব্যস, ঐ একটা কথাতেই আমার জেদ চেপে গিয়েছিল।

আর একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল। বাজারে তখন প্রথম ৫০০ টাকার নোট চালু হয়েছে। বন্ধুদের কাছ থেকে শোনার পরে নোটটা দেখতে কেমন কৌতূহল হয়েছিল। কারণ ১০০/২০০ টাকার নোট দেখেছি, ৫০০ টাকার নোট আগে কখনও দেখিনি। বাবাকে বলতেই কোনও দ্বিধা না করে ৫০০ টাকার একটা নোট দিয়েছিলেন। কিন্তু ৫০০ টাকা কীভাবে খরচ করব! গল্পের বই, ড্রইং বই, খাতা, পেন, পেন্সিল মিলিয়ে ৫০ টাকার মতো খরচ হয়েছিল। বাকিটা মা-কে ফেরত দিয়েছিলাম। বাবা বাড়ি ফিরে শোনার পরে যেন স্বস্তি পেয়েছিলেন। মা-কে বলেছিলেন, ‘ভালো খবর, ভুল সঙ্গে পড়েনি।’

খুবই শৌখিন ছিলেন। পোশাক-আশাকের ব্যাপারে ছিলেন পরিপাটি। বিশেষ ঝোঁক ছিল ঘুড়ি ওড়ানোর। বিশ্বকর্মা পূজোর সময়ে বাড়ির ছাদে উঠে ঘুড়ি ওড়াতেন। আমিও বাবার সাথে ছাদে উঠে তাঁর সঙ্গে ঘুড়ি ওড়াতাম। বিশ্বকর্মা পূজোর বেশ কয়েকদিন আগে থেকে ঘুড়ি ওড়ানোর প্রস্তুতি শুরু হত। ঘুড়ির সঙ্গে লাটাই, সূতো কেনার পাশাপাশি থাকত ঘুড়িতে মাঞ্জা দেওয়ার ব্যাপারটা। ধারালো সুতোর সামনের দিকে মোম দিয়ে মাঞ্জা দিতেন। তাতে হাত কাটার ভয় থাকত না। ঘুড়ির খেলায় বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। হাতের টানে অন্যের ঘুড়ি কেটে ‘ভো কাট্টা’ বলে তৃপ্তি পেতেন। আসলে তিনি এখানেও হারতে চাইতেন না।

এতটাই খোলামেলা ছিলেন। তবু কখনো যদি অন্যায় করতাম ধমক দিয়ে বলতেন ‘তুই করেছিস?’ তাতেই চোখে জল এসে যেত। আবার কখনও কোনও দুষ্টুমি তাঁর কানে যদি যেত তখন নীচ থেকে যদি একটা হাঁক দিতেন ‘জ...য়’ -- ব্যস। আমার হাত-পা কাঁপতে শুরু করত। বিকালে খেলতে যাওয়ার অভ্যাস ছিল। ব্যাপারটা বাবার ভালোই লাগত।

বাবার কাছেই শুনেছি মাত্র ১২ বছর বয়সে মোটর বাইক চালাতে পারতেন। আমিও তাঁকে অনুস্বরণ করে ১৩/১৪ বয়সেই গাড়ি চালানো প্র্যাকটিস করতাম। সিটে হেলান দিয়ে নিচে পা রাখতাম। পাশে অবশ্য বাবার বিশ্বস্ত ‘সারথি’ সিপুজান থাকতেন। খবরটা বাবা জানার পরেও রাগ করেননি। আসলে তিনি ছিলেন পুরোদস্তুর আধুনিক।

আর একটা ঘটনা বলছি। কানে ‘হেডফোন’ লাগিয়ে মাঝে মধ্যে গান শুনতাম। একদিন আমার এক দাদা বললেন, এতে কানের ক্ষতি হতে পারে। ব্যাপারটা পরখ করার জন্য আমার কান থেকে হেডফোনটা খুলে একটু দেখে বললেন, ‘কিসসু হবে না, শোন।’

বাইরে থেকে বাবাকে কঠিন মনে হত। কিন্তু আসলে ভিতরটা ছিল কোমল, শিশুর মতো সরল। সবাই তাঁকে জানতেন একজন তেজি, রাগী, সাহসী ব্যক্তি হিসাবে। প্রবল চাপের মুখেও তিনি ছিলেন অনমনীয়। আবার এই মানুষটিই প্রাণখুলে হাসতেন। কীর্তন গাইতেন, ঢোল, সিন্থেসাইজার বাজাতেন। মজার ছড়া লিখতেন। এই দিকটা ছিল তাঁর বিশেষত্ব। এক কথায় তিনি ছিলেন অলরাউন্ডার।

বাবার প্রশাসনিক দিকটা নিয়ে বলার মতো ধৃষ্টতা আমার নেই। কারণ বোঝার মতো বয়স তখনও হয়নি। তবে এ ব্যাপারে একটা কথা বলতে দ্বিধা নেই যে, প্রশাসনিক দিকটা ছিল বংশগত। বাবার প্রশাসনিক দক্ষতা সম্পর্কে জেনেছি নিজে ফুটবল জগতে আসার পরে। অনেকের কাছ থেকে দক্ষ প্রশাসক প্রদ্যুত দত্ত সম্পর্কে জেনেছি। অনেকেই একবাক্যে স্বীকার করেছেন, বিভিন্ন সময়ে বাবা তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁদের কাছ থেকে জেনেছি অনেক চাপেও তিনি পিছু হটতেন না। মাসতুতো দাদা দীপুদা-র কাছ থেকে শুনেছি বাবার অনুধাবন শক্তি ছিল প্রখর। কঠিন কাজে নামার আগে কী হতে পারে মেপে নিতেন। কোনও স্বার্থ থাকত না বলে সাফল্য পেয়েছেন।

ব্যক্তিগতভাবে প্রশাসনে সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধান্বিত হলে ভাবি, এক্ষেত্রে বাবা থাকলে কী করতেন? তারপরই সিদ্ধান্ত নিতাম। যদি মনে হত বাবা পিছিয়ে যেতেন তাহলে আমিও এগোবার চেষ্টা করি না। সবাই যে তাঁকে কতটা শ্রদ্ধা করতেন সেটা বুঝেছিলাম তাঁর মৃত্যুর পরদিন। ক্রীড়াজগৎ তো বটেই, ক্রীড়া জগতের বাইরেও সহস্রাধিক মানুষ তাঁর শেষ যাত্রায় সামিল হয়েছিলেন। আসলে তিনি ছিলেন অন্য জগতের নক্ষত্র। এক কথায় কালজয়ী।

ইনস্টিটিউটের মূল কেন্দ্র শিয়ালদহ- বৌবাজার অঞ্চলে জনপ্রিয় ছিলেন। এলাকায় গভীর জনসংযোগ ছিল। অনেকেই দাঁড় করিয়ে নানা ঘটনা আজও বলেন।

Copyright Ⓒ Prodyutdutta.com